ইসরায়েলি হামলায় গাজায় নিহত বেড়ে ৬০২৪৯ জন, ‘দুর্ভিক্ষে’ ১৫৯ জন
গত ২৪ ঘণ্টায় গাজায় ইসরায়েলি হামলায় ৯১ জন ত্রাণপ্রার্থীসহ ১১১ জন ফিলিস্তিনি নিহত এবং কমপক্ষে ৮২০ জন আহত হয়েছেন। ‘দুর্ভিক্ষ ও অপুষ্টির কারণে’ হাসপাতালগুলোতে মারা গেছেন দুই শিশুসহ আরও পাঁচজন।
হামাস নিয়ন্ত্রিত গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বরাতে কাতারভিত্তিক গণমাধ্যম আল জাজিরা জানায়, প্রয়োজনীয় মানবিক সাহায্য পৌঁছে দিতে যুদ্ধে ‘সাময়িক বিরতির’ ঘোষণা দিয়েও অবরুদ্ধ উপত্যকাটি জুড়ে বিমান ও ড্রোন হামলা এবং স্থল অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ)। বৃহস্পতিবার (৩১ জুলাই) ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত এসব হামলায় নিহত হয়েছেন ৩৪ জন ফিলিস্তিনি, যাদের ১৫ জন যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সমর্থিত গাজা হিউম্যানিটারিয়ান ফাউন্ডেশনের (জিএইচএফ) ত্রাণ কেন্দ্রগুলোতে খাবারের জন্য এসেছিলেন। অন্য ৭৭ জন নিহত হন বুধবার (৩০ জুলাই) সন্ধ্যা থেকে রাতভরের হামলায়, যাদের একজন বাদে সবাই ত্রাণপ্রার্থী।
দক্ষিণ গাজার রাফাহে একজন যুবক ও দুজন শিশুসহ ২৪ ঘণ্টায় গাজাজুড়ে অনাহারে আরও পাঁচজনের মৃত্যুর কথাও জানিয়েছে খান ইউনিসের নাসের মেডিকেল কমপ্লেক্স হাসপাতাল।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, এ নিয়ে ইসরায়েলি আগ্রাসনের ৬৬৪তম দিনে এসে নিহত বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬০ হাজার ২৪৯ জনে এবং আরও অন্তত এক লাখ ৪৭ হাজার ৮৯ জন আহত হয়েছেন। অন্যদিকে ‘দুর্ভিক্ষ ও ক্ষুধাজনিত’ মৃত্যু ১৫৯ জনে উন্নীত হয়েছে, যাদের ৯০ জনই শিশু।
এদিকে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী উত্তর গাজায় তাদের ৯৮তম ডিভিশনের অভিযান সম্পন্ন হওয়ার দাবি জানিয়ে বলেছে, এর অংশ হিসেবে গাজা শহরের শুজাইয়া এবং জেইতুন এলাকায় মাটির ওপরে ও নিচে অভিযান চালিয়ে এক হাজার ৫০০টিরও বেশি ‘সন্ত্রাসী অবকাঠামো’ ধ্বংস এবং কয়েক ডজন সশস্ত্র গোষ্ঠীর যোদ্ধাকে হত্যা করেছে।
অন্যদিকে হামাস জানিয়েছে, তাদের সশস্ত্র শাখা কাসাম ব্রিগেড দক্ষিণ গাজার খান ইউনিস শহরের কাছে আল-কারারা শহরের পূর্বে বেশ কয়েকটি মর্টার শেল দিয়ে ইসরায়েলি সেনা এবং যানবাহনের ওপর হামলা চালিয়েছে।
এ অবস্থায় গাজার মানবিক সংকট মোকাবিলায় ফের যুদ্ধবিরতির দাবি জানিয়েছে ফিলিস্তিনি শরণার্থীদের জন্য জাতিসংঘের সংস্থা (ইউএনআরডব্লিউএ)। সংস্থাটির মুখপাত্র আদনান আবু হাসনা আল জাজিরাকে বলেন, ‘অপুষ্টির কারণে গাজার বেশিরভাগ নবজাতক কম ওজনের এবং ছোট আকারের হচ্ছে। সেখানকার সব পানি সংশোধন প্ল্যান্ট ধ্বংস হয়ে গেছে। যার ফলে পানিদূষণে রোগ ছড়িয়ে পড়ছে। যুদ্ধবিরতি ছাড়া গাজার এসব মানবিক সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব নয়’।
প্রতিদিন শত শত ত্রাণের ট্রাক গাজা উপত্যকায় প্রবেশ করতে হয়। ইসরায়েলকে সেগুলোর জন্য নিরাপদ পথ ও ত্রাণ বিতরণে জাতিসংঘের গুদামে পৌঁছাতে দেয়ার দাবিও জানান তিনি।
সংঘাতের দ্বিরাষ্ট্রীয় সমাধানের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করে কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি আগেই জানিয়ে দিয়েছেন, তার দেশ সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেবে। একই অধিবেশনে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেয়ার কথা ভাবছেন বলে জানিয়েছেন পর্তুগালের প্রধানমন্ত্রী লুইস মন্টিনিগ্রো।
জার্মানির পররাষ্ট্রমন্ত্রী জোহান ওয়াডেফুল বলেছেন, দ্বিরাষ্ট্র সমাধানের জন্য আলোচনার শেষে ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রের স্বীকৃতি আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ। সতর্ক করে দিয়ে তিনি বলেন, তবে সেই প্রক্রিয়াটি এখনই শুরু করতে হবে। না হলে বার্লিন ‘একতরফা পদক্ষেপ’ নেবে।
যুদ্ধবিরতিতে রাজি করাতে গাজায় যুদ্ধ পরিচালনার বিষয়ে ইসরায়েলের সাথে তাদের অ্যাসোসিয়েশন চুক্তির বাণিজ্য বিভাগ স্থগিতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন সুইডেনের প্রধানমন্ত্রী উলফ ক্রিস্টারসনও।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলায় এক হাজার ২০০ ইসরায়েলি নিহত হন এবং ২৫১ জনকে জিম্মি করা হয়। এর জবাবে ইসরায়েল সামরিক অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে গাজার বিভিন্ন এলাকায়।
চলতি বছরের ১৯ জানুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য মধ্যস্থতাকারী দেশের চাপে যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দিলেও ১৮ মার্চ থেকে ফের সামরিক অভিযান চালাচ্ছে আইডিএফ। দ্বিতীয় দফার এই অভিযানে এখন পর্যন্ত নিহত হয়েছেন নয় হাজার ২০২ জন ফিলিস্তিনি এবং আহত হয়েছেন ৩৩ হাজার ২২৩ জন।
মতামত দিন
মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে