হামাসকে ৬০ দিনের সময়সীমা বেঁধে দিল ইসরায়েল
গাজায় কার্যকর ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতির মধ্যেই হামাসকে ৬০ দিনের সময়সীমা বেঁধে দিয়েছে ইসরায়েল। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সংগঠনটিকে সব ধরনের অস্ত্র সমর্পণ করতে হবে, অন্যথায় গাজা উপত্যকায় পুনরায় বড় ধরনের সামরিক অভিযান শুরু করা হবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছে তেলআভিভ।
সোমবার জেরুজালেমে এক সম্মেলনে ইসরায়েলি মন্ত্রিপরিষদ সচিব ইয়োসি ফুচস এ ঘোষণা দেন। তিনি জানান, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের অনুরোধে এই ৬০ দিনের সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে।
ইয়োসি ফুচস বলেন, “ট্রাম্প প্রশাসন ৬০ দিনের একটি সময় চেয়েছে, এবং আমরা সেটাকে সম্মান জানিয়েছি।”
মন্ত্রিপরিষদ সচিব আরও বলেন, এই সময়ের মধ্যে হামাসকে তাদের সব অস্ত্র, এমনকি একে-৪৭-এর মতো রাইফেলও সম্পূর্ণভাবে সমর্পণ করতে হবে। তার মতে, এসব অস্ত্রই হামাসের সামরিক সক্ষমতার মূল ভিত্তি।
তিনি স্পষ্ট করে বলেন, “যদি এটি কার্যকর হয়, ভালো। আর যদি না হয়, তাহলে আইডিএফ (ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী) তাদের মিশন সম্পন্ন করবে।” তার এই বক্তব্যকে গাজায় পুনরায় বড় ধরনের সামরিক অভিযান শুরুর ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
তবে ৬০ দিনের সময় গণনা কবে থেকে শুরু হবে, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট করে জানাননি ফুচস। তিনি ইঙ্গিত দেন, যুক্তরাষ্ট্র-নেতৃত্বাধীন ‘বোর্ড অব পিস’-এর একটি বৈঠকের পর এটি শুরু হতে পারে। বৈঠকটি চলতি সপ্তাহে ওয়াশিংটনে হওয়ার কথা রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, ইসরায়েলের আসন্ন নির্বাচনের আগেই হয় হামাসকে নিরস্ত্রীকরণ হতে হবে, নয়তো গাজায় ইসরায়েলি বাহিনী আরও জোরালো সামরিক অভিযানে জড়িয়ে পড়বে।
গত অক্টোবর থেকে গাজায় যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকলেও সহিংসতা পুরোপুরি থামেনি। গাজার সিভিল ডিফেন্স সংস্থা জানিয়েছে, রোববার সকাল থেকে ইসরায়েলি বিমান হামলায় অন্তত ১২ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন।
ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর দাবি, হামাসের যোদ্ধারা সুড়ঙ্গ থেকে বেরিয়ে তথাকথিত ‘ইয়েলো লাইন’ এর কাছে এসে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করেছে, যা ইসরায়েলি ও ফিলিস্তিনি বাহিনীর মধ্যে একটি বাফার জোন হিসেবে পরিচিত।
এসব কর্মকাণ্ডকে “যুদ্ধবিরতির স্পষ্ট লঙ্ঘন” বলে উল্লেখ করেন এক ইসরায়েলি সামরিক কর্মকর্তা।
ইসরায়েলি বাহিনী জানায়, রাফাহ এলাকায় হামাসের সুড়ঙ্গ নেটওয়ার্কের বিরুদ্ধে তারা অভিযান চালাচ্ছে। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে প্রায় ৫০ জন হামাস সদস্যকে হত্যা বা আটক করা হয়েছে বলে দাবি করেছে তারা।
এদিকে গাজার ভবিষ্যৎ পুনর্গঠনের শর্ত হিসেবে হামাসের সম্পূর্ণ নিরস্ত্রীকরণকে কেন্দ্রীয় বিষয় হিসেবে তুলে ধরেছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু। তার মতে, হামাস অস্ত্র রাখলে গাজার পুনর্গঠন সম্ভব নয়।
যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত একটি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে গাজার শাসনব্যবস্থা পুনর্গঠন, মানবিক সহায়তা বৃদ্ধি, ধাপে ধাপে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার এবং একটি আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বাহিনী গঠনের প্রস্তাব রয়েছে। এ পরিকল্পনার অধীনে ‘বোর্ড অব পিস’, ‘গাজা এক্সিকিউটিভ কাউন্সিল’ এবং ‘ন্যাশনাল কমিটি ফর গাজা’সহ কয়েকটি অন্তর্বর্তী কাঠামো গঠনের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
তবে সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ ও নিরাপত্তা জটিলতার কারণে এসব প্রশাসনিক কাঠামোর কার্যক্রম পুরোপুরি গাজায় শুরু করা সম্ভব হয়নি।
অন্যদিকে হামাস অভিযোগ করেছে, ইসরায়েল বারবার যুদ্ধবিরতির শর্ত লঙ্ঘন করছে, বিশেষ করে মিশরের সঙ্গে রাফাহ ক্রসিংয়ে। তাদের দাবি, চুক্তি অনুযায়ী যে সংখ্যক ফিলিস্তিনিকে গাজা ছাড়ার ও প্রবেশের অনুমতি দেয়ার কথা ছিল, তা মানা হয়নি।
গাজা কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ফেব্রুয়ারির শুরুতে আংশিকভাবে রাফাহ ক্রসিং খুলে দেওয়ার পর থেকে প্রায় ২,৮০০ প্রত্যাশিত যাত্রীর মধ্যে মাত্র ৮১১ জন পারাপার করতে পেরেছেন—যা চুক্তিকৃত সংখ্যার এক-তৃতীয়াংশেরও কম।
হামাসের দাবি, হাজারো আহত ও গুরুতর অসুস্থ রোগী চিকিৎসার জন্য বাইরে যেতে পারছেন না। তারা যুদ্ধবিরতির শর্ত বাস্তবায়নে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতাকারীদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে।
মতামত দিন
মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে