হেবরনে প্রায় ২ হাজার ফিলিস্তিনিকে বাস্তুচ্যুত করেছে ইসরায়েল
অধিকৃত পশ্চিম তীরের হেবরন শহরে ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর অভিযান ও অবরোধের মধ্যে দুই হাজারের বেশি ফিলিস্তিনিকে বাড়িঘর ছেড়ে যেতে হয়েছে। শহরটিতে প্রবেশ ও বের হওয়ার পথ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
একই সঙ্গে পশ্চিম তীরের বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে প্রায় ৭০ ফিলিস্তিনিকে গ্রেপ্তার করেছে ইসরায়েলি বাহিনী।
শনিবার (২৪ অক্টোবর) আল-জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়, হেবরনের মেয়র ইউসেফ আল-জাবারি জানিয়েছেন, ইসরায়েলি সেনাদের অভিযানে প্রায় ২ হাজার ২০০ মানুষ ঘরবাড়ি ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন। ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজও প্রায় দুই হাজার ফিলিস্তিনির বাস্তুচ্যুত হওয়ার কথা স্বীকার করেছেন। তিনি বলেছেন, হেবরনে হামাস-সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো মোকাবিলা শেষ না হওয়া পর্যন্ত বাস্তুচ্যুত বাসিন্দাদের নিজেদের এলাকায় ফিরতে দেওয়া হবে না।
শুক্রবার হেবরনের কাছে ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর একটি চেকপোস্টে দুই ফিলিস্তিনি বন্দুকধারীর হামলায় দুই ইসরায়েলি সেনা নিহত হন। হামলাকারী দুই ফিলিস্তিনিও নিহত হন। এ ঘটনার পর ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু অধিকৃত পশ্চিম তীরে পূর্ণ অবরোধের নির্দেশ দেন। এরপর হেবরনসহ বিভিন্ন এলাকায় ব্যাপক অভিযান শুরু করে ইসরায়েলি বাহিনী।
ফিলিস্তিনিদের অভিযোগ, গভীর রাতে মাইকিং করে বাসিন্দাদের বাড়িঘর ছেড়ে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। এতে প্রস্তুতি নেওয়ার পর্যাপ্ত সময় পাননি তারা। আশ্রয় নেওয়ার জায়গাও সীমিত। হেবরনের মেয়র জানিয়েছেন, শহরে প্রবেশ বা বের হওয়ার সুযোগ বন্ধ থাকায় বাসিন্দারা কার্যত অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছেন।
ইসরায়েলি সেনারা হেবরনের ফারশ আল-হাওয়া চেকপোস্টের কাছে অভিযান ও বাড়িঘর ভাঙার দৃশ্য ধারণের সময় আল-জাজিরার সাংবাদিকদের লক্ষ্য করে স্টান গ্রেনেডও ছোড়ে। শনিবার পশ্চিম তীরের অন্তত ১৫টি এলাকায় অভিযান চালানোর খবর দিয়েছে আল-জাজিরা। জেনিন, নাবলুস, রামাল্লা, আল-বিরেহ, বিরজেইত, পূর্ব জেরুজালেম ও বেথলেহেমের বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালানো হয়। ফিলিস্তিনি প্রিজনার্স সোসাইটির তথ্য অনুযায়ী, এসব অভিযানে প্রায় ৭০ জন ফিলিস্তিনিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। জেনিন অঞ্চলে অভিযানের সময় কয়েকজন আহত হওয়ার খবরও দিয়েছে ফিলিস্তিনি সংবাদ সংস্থা ওয়াফা।
হেবরন শহরে প্রায় দুই লাখ এবং পুরো হেবরন গভর্নরেটে প্রায় আট লাখ ফিলিস্তিনি বসবাস করেন। ফিলিস্তিনি অধিকারকর্মী ও বিশ্লেষক ঈসা আমরো আল-জাজিরাকে বলেন, শহরের সব প্রবেশ ও বের হওয়ার পথ বন্ধ থাকায় পুরো গভর্নরেটের বাসিন্দারা অবরুদ্ধ অবস্থায় রয়েছেন। তার ভাষায়, শহরের ভেতরে কারও জন্যই নিরাপদ আশ্রয় নেই এবং মানুষ আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।
ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ ইসরায়েলের পদক্ষেপকে ‘সমষ্টিগত শাস্তি’ আখ্যা দিয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের হস্তক্ষেপ চেয়েছে। তাদের অভিযোগ, বাড়িঘর গুঁড়িয়ে দেওয়া, পুরো এলাকার বাসিন্দাদের জোর করে সরিয়ে দেওয়া এবং শহর অবরুদ্ধ করে রাখার মাধ্যমে সাধারণ ফিলিস্তিনিদের শাস্তি দেওয়া হচ্ছে। হামাসও এক বিবৃতিতে বলেছে, ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে ইসরায়েলি বাহিনী ও বসতি স্থাপনকারীদের অভিযান এবং সহিংসতা ক্ষোভ আরও বাড়াবে।
জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস হেবরনে চলাচলে বিধিনিষেধ এবং বাড়িঘর ধ্বংসের খবরে গভীর উদ্বেগ জানিয়েছেন। তার মতে, এসব বিধিনিষেধ ফিলিস্তিনিদের চলাচলের স্বাধীনতা, মৌলিক সেবা পাওয়ার সুযোগ ও জীবিকার ওপর গুরুতর প্রভাব ফেলছে। ইসরায়েলি মানবাধিকার সংস্থা বি’তসেলেমও সতর্ক করে বলেছে, এসব পদক্ষেপ সমষ্টিগত শাস্তি এবং যুদ্ধাপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
ইসরায়েলে ২৭ অক্টোবরের সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে হেবরনের অভিযানকে ঘিরে রাজনৈতিক উত্তেজনাও তৈরি হয়েছে। আল-জাজিরার পশ্চিম তীর প্রতিনিধি নূর ওদেহের মতে, নেতানিয়াহু ও তাঁর ডানপন্থী জোটের নেতারা হামলার পর কঠোর অবস্থান তুলে ধরে নির্বাচনী সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করছেন।
মতামত দিন