সংঘাত ছাড়া কি রাজনৈতিক সংকটের সমাধান হয় না?
‘আন্দোলনের মাঠ যার দখলে ভোটের ফলাফলও তার পক্ষে।’ বাংলাদেশের রাজনীতিতে বহুল প্রচলিত এই বাক্যটি সংঘাতের পথে প্রধান নিয়ামক। বিভিন্ন সময়ে বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদরাও শ্লাঘার সঙ্গে এই কথা বলে এসেছেন। তার মানে সংলাপ বা আলাপ-আলোচনা নয় বরং আন্দোলনের মাঠ দখল করে রাজপথে আধিপত্য বিস্তার করে এবং প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে পারলেই ভোটে জয়ী হওয়া যায়। এই বক্তব্যই প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সমঝোতার পথে প্রধান অন্তরায়। কেননা সব পক্ষই মনে করে, আন্দোলন করে জিততে হবে। সংঘাত-সহিংসতা করলেই কেবল প্রতিপক্ষ নমনীয় হবে। যে কারণে আলাপ-আলোচনা বা সংলাপের মধ্য দিয়ে বড় কোনো রাজনৈতিক সংকটের সমাধান হয়েছে, বাংলাদেশের ইতিহাসে তার কোনো নজির নেই।
গণতান্ত্রিক রীতি-নীতিতে বিশ্বাস করলে রক্তক্ষয়ী সংঘাত বা গণবিরোধী আন্দোলন পরিহার করে, আলাপ-আলোচনা আর সংলাপের মধ্য দিয়েই সমঝোতার মাধ্যমে দেশ ও মানুষের কল্যাণকর সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব হতো। কিন্তু বাংলাদেশ রাষ্ট্র গঠনের অর্ধ শতাব্দীতেও রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে কোনো পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ বা আস্থার সম্পর্ক গড়ে ওঠেনি। ফলে গণতন্ত্রের স্বার্থে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মতো একটি অগণতান্ত্রিক বিধান সংবিধানে যুক্ত করা হয়েছিল। কিন্তু যে বাস্তবতায় এই বিধানটি সংবিধানে যুক্ত করা হয়েছিল, সেই বাস্তবতা যে এখনও বিদ্যমান সেটি সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ঘটনা প্রবাহে আমরা স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি। অর্থাৎ ক্ষমতায় থাকা দলের অধীনে নির্বাচন হলে বিরোধী দলগুলোর কাছে যেহেতু সেটি গ্রহণযোগ্য ও বিশ্বাসযোগ্য হয় না, সে কারণেই নির্বাচনকালীন অস্থায়ী বিধান হিসেবে তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি সংবিধানে যুক্ত করা হয়েছিল। কিন্তু পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে এই বিধান বাতিল করা হয় ১৯৯৫-৯৬ সালে। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতির ১৯৯৫-৯৬ সালের দিকে দেশ এগিয়ে যাচ্ছে কি-না-সেই প্রশ্ন উঠছে। অর্থাৎ ওই সময়ে যেসব যুক্তিতে তৎকালীন বিরোধী দল আওয়ামী লীগ নির্বাচনকালীন একটি নির্দলীয় সরকারের দাবিতে আন্দোলন করেছিল, সেই একই দাবিতে এখন আন্দোলন করছে বিএনপি।
ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ এখন যে বিধানকে অগণতান্ত্রিক ও অসাংবিধানিক বলছে, এক সময় তারাই এই বিধানের দাবিতে আন্দোলন করেছিল। ওই আন্দোলনে প্রচুর রক্তক্ষয় হয়। আবার বিএনপি যে বিধানকে তখন অগণতান্ত্রিক বলেছিল, তারাই এখন সেই দাবির পক্ষে অনড়। অর্থাৎ ক্ষমতায় থাকতে যে বিধান অগণতান্ত্রিক, অসাংবিধানিক-বিরোধী দলে থাকলে সেই একই বিধান গণতান্ত্রিক! সুতরাং যে বাস্তবতায় অর্থাৎ দলীয় সরকারের অধীনে অবাধ-সুষ্ঠু-নিরপেক্ষ-গ্রহণযোগ্য ও বিতর্কমুক্ত নির্বাচন সম্ভব হবে বলে দেশের সকল রাজনৈতিক দল বিশ্বাস করে না এবং এই ইস্যুতে যেহেতু এখনও ঐকমত্য গড়ে ওঠেনি। ফলে নির্বাচনকালীন একটি নির্দলীয় ব্যবস্থা অগণতান্ত্রিক হলেও বিএনপি ও তার শরিকরা এটি পুনর্বহালের দাবিতে আন্দোলন করছে। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের আগে পেট্রোল বোমা আর গান পাউডারের আঘাতে সারাদেশে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়েছিল। অনেক মানুষকে প্রাণ হারাতে হয়েছে। সেই বিভীষিকার দৃশ্য থেকে গত প্রায় এক দশক মুক্ত ছিল বাংলাদেশ।
২০১৮ সালের নির্বাচনের আগে ওই অর্থে খুব বেশি সহিংসতা হয়নি। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির পরাজয় হলেও এর প্রতিবাদে তারা জ্বালাও-পোড়াওয়ের রাজনীতি শুরু করেনি। বরং সাম্প্রতিক বছরগুলোয় তাদের রাজনীতি ছিল যথেষ্ট শান্তিপূর্ণ এবং নিয়মতান্ত্রিক। এমনকি দলের চেয়ারপারসন দুর্নীতি মামলায় সাজাপ্রাপ্ত হয়ে জেলে গেলেও যে ধরনের সহিংসতার আশঙ্কা করা হচ্ছিল, তা হয়নি। বরং বিএনপি নিয়মতান্ত্রিক পন্থায় আন্দোলন করার চেষ্টা করেছে। আবার আওয়ামী লীগের মতো একটি শক্তিশালী দল যখন ক্ষমতায় এবং পুরো রাষ্ট্রযন্ত্র যেখানে ক্ষমতাসীনদের নিয়ন্ত্রণে সেখানে তাদের বিরুদ্ধে বড় ধরনের আন্দোলন গড়ে তুলে সফল হওয়া কতখানি সম্ভব-সেই প্রশ্নও এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। কিন্তু তার পরও সাম্প্রতিক বছরগুলোয় বিএনপি যে ধরনের আন্দোলন কর্মসূচি দিয়ে আসছিল, তাতে বড় ধরনের ছন্দপতন ঘটে ২৮ অক্টোবরের সমাবেশকে ঘিরে।
প্রসঙ্গত, ২৮ তারিখের এই কর্মসূচির বেশ কিছুদিন আগে থেকেই রাজনীতিতে নতুন করে সক্রিয় হয় বিএনপির ঘনিষ্ঠ দল জামায়াতে ইসলামী। উচ্চ আদালতের আদেশে তাদের নিবন্ধন বাতিল হওয়া এবং মুক্তিযুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধে যুক্ত থাকার দায়ে দলের শীর্ষ নেতাদের মৃত্যুদণ্ড ও আজীবন কারাদণ্ডের কারণে কোণঠাসা জামায়াত হঠাৎ করেই গা ঝাড়া দিয়ে ওঠে। ২৮ তারিখের সমাবেশটি বিএনপির হলেও জামায়াতও এই দিন রাজধানীর শাপলা চত্বর দখল করার ঘোষণা দেয়। সব মিলিয়ে এদিন বিএনপি-আওয়ামী লীগ ও জামায়াতের পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিপুল সংখ্যক সদস্য মাঠে ছিল। একটা ত্রিমুখী লড়াইয়ে রাজধানীর পল্টন, কাকরাইল এলাকায় ব্যাপক সহিংসতা ঘটে।
বিএনপির এত দিনের শান্তিপূর্ণ আন্দোলন কর্মসূচি হঠাৎ করে কেন সহিংসতায় রূপ নিল-সেটি বিরাট প্রশ্ন। কারা উসকানি দিল? যে জামায়াতের বিরুদ্ধে সহিংসতার নানা অভিযোগ রয়েছে, ২৮ তারিখের সহিংসতার পেছনে তাদের দায় কতটুকু-সেটিও খতিয়ে দেখা দরকার। ক্ষমতাসীন দল, বিএনপি এমনকি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকাও নির্মোহভাবে খতিয়ে দেখা দরকার।
বাংলাদেশে রাজনৈতিক সহিংসতার মূল কারণ ক্ষমতা। অর্থাৎ যেকোনো উপায়ে ক্ষমতায় থাকা এবং যেকোনো উপায়ে ক্ষমতায় যেতে চাওয়াই সহিংসতার পথ উন্মুক্ত করে। বিশেষ করে কেউ একবার শাসন ক্ষমতায় বসে গেলে সেখান থেকে আর নামতে চায় না। নির্বাচনী ব্যবস্থা পাশ কাটিয়ে, প্রভাবিত করে কিংবা বিতর্কিত করে হলেও ক্ষমতায় থেকে চাওয়ার বাসনাবিরোধী পক্ষকে সংঘাতের পথ বেছে নিতে উৎসাহ জোগায়। অনেক সময় দুই পক্ষের লড়াইয়ে তৃতীয় পক্ষও সুযোগ নিয়ে ক্ষমতা দখল করে।
নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থানের পর ১৯৯৫-৯৬ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে আওয়ামী লীগের আন্দোলন, ২০০১ সালের নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে বিএনপির আন্দোলন, ২০০৭ সালে বিএনপির শাসনামলে রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিনের নেতৃত্বে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের আন্দোলন, ২০১৩-১৪ সালে বিএনপির নির্বাচন বর্জন আন্দোলন একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি।
প্রশ্ন হলো, সংঘাত ছাড়া কি সমস্যার সমাধান হয় না বা সমাধানের পথ তৈরি হয় না? বাংলাদেশের অতীত ইতিহাস বলছে, আলাপ-আলোচনা বা সংলাপের মধ্য দিয়ে বড় কোনো রাজনৈতিক সংকটের সমাধান হয় না। তার কারণ কেউই তালগাছের মালিকানা ছাড়তে রাজি নয়। আলাপ-আলোচনা ও সংলাপে যুক্তি পাল্টা যুক্তিতে একপক্ষকে নমনীয় হতে হয়। কোনো পক্ষের ভুল থাকলে সেটি বেরিয়ে আসে। যৌক্তিক কারণে সেই ভুল মেনে নিতে হয়। কিন্তু কেউ নিজের ভুল স্বীকার করতে রাজি নয়। রাজি নয় বলেই আলোচনা ও সংলাপের পথ তাদের পছন্দ নয়। বিরোধী পক্ষ মনে করে যেহেতু আলাপ-আলোচনায় সমাধান হবে না, অতএব এমন আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে যাতে সরকার দাবি মেনে নিতে বাধ্য হয়। যে কারণে আন্দোলনটি এক পর্যায়ে গিয়ে আর শান্তিপূর্ণ বা অহিংস থাকে না। শুরু হয় জ্বালাও-পোড়াও, সহিংসতা। সাধারণ মানুষ প্রাণ হারায়, অপচয় হয় দেশের সম্পদের। কিন্তু সরকারের উদ্দেশ্য কোনোভাবেই আন্দোলন সফল হতে না দেওয়া। যেভাবেই হোক বিরোধী পক্ষকে দমন করতেই হবে। যে কারণে রাষ্ট্রীয় বাহিনীর সর্বোচ্চ ব্যবহার করা হয়। গণহারে চলে গ্রেপ্তার অভিযান।
বিরোধীদের গ্রেপ্তারে এবার সম্ভবত অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। হাতেগোণা দুয়েকজন বাদে বিএনপির গুরুত্বপূর্ণ সব নেতাই এখন জেলে। যারা গ্রেপ্তার হননি তারাও আত্মগোপনে। অর্থাৎ সরকার এখন চূড়ান্ত হার্ডলাইনে। এ রকম পরিস্থিতিতে চোরাগোপ্তা হামলা বেড়ে যায়। ঝটিকা আক্রমণ চলে। বড় নেতারা মাঠে না থাকলে ছোট ও মাঝারি নেতারা বড় দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে অনেক ভুল করে বসেন। যেই ভুলের মাশুল শুধু দলকে নয় বরং দেশকেও দিতে হয়। কোনো একটি দলকে নিশ্চিহ্ন করার প্রক্রিয়া শুরু হলে অনেক সময় সেই দলটি আন্ডার গ্রাউন্ডে চলে গিয়ে আরও বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে। অনেক সময় কোনো র্যাডিক্যাল ফোর্সের কব্জায় চলে গিয়ে অপেক্ষাকৃত সহনশীল একটি দলও শেষ পর্যন্ত জঙ্গি সংগঠনে রূপ নিতে পারে। সুতরাং সহিংসতামুক্ত রাজনৈতিক কর্মসূচি যেমন দেশবাসীর প্রত্যাশা তেমনি যারা যখন সরকারে থাকে তখন তাদের খেয়াল রাখতে হয় যে রাষ্ট্রীয় বাহিনী ব্যবহার করে আপাতদৃষ্টিতে বিরোধীদের দমন করা গেলেও ভেতরে ভেতরে যাতে আরও বড় কোনো সংকট তৈরি না হয়। মনে রাখা দরকার, দেশ ও দেশের মানুষের নিরাপত্তায় বিরোধী দলের চেয়েও সরকারের দায়িত্ব অনেক বেশি।
বলা হয়, একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন ব্যবস্থাই পারে রাজনৈতিক সংঘাতের অবসান ঘটাতে। আসলে কি তাই? অবাধ-সুষ্ঠু-অংশগ্রহণমূলক এবং সর্বোপরি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হলেই সে দেশের মানুষ সুখে-শান্তিতে বসবাস করতে পারবে, দেশ থেকে দুর্নীতি-অনিয়ম-লুটপাট-টাকা পাচার-সরকারি অফিসে নাগরিকের হয়রানি বন্ধ হয়ে যাবে এবং গণমাধ্যম স্বাধীনভাবে সব সত্য প্রকাশ ও প্রচার করতে পারবে, সোশ্যাল মিডিয়ায় নাগরিকরা নির্ভয়ে মনের ভাব প্রকাশ করতে পারবে কিংবা ক্ষমতাকে প্রশ্ন করতে পারবে-তেমনটি নাও হতে পারে। কেননা একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ক্ষমতায় আসা দলও চূড়ান্ত স্বৈরাচার হতে পারে। অনিয়ম ও দুর্নীতিতে আকণ্ঠ নিমজ্জিত হতে পারে। অর্থাৎ নির্বাচনই গণতন্ত্র তথা একটি জনবান্ধব শাসন ব্যবস্থায় উত্তরণের একমাত্র পথ নয়। বরং একটি ভালো নির্বাচন ভালো শাসন ব্যবস্থা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে কিছুটা ভূমিকা রাখতে পারে। কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে যদি আস্থা ও শ্রদ্ধার সম্পর্ক গড়ে না ওঠে, যদি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো জনবান্ধব হিসেবে গড়ে তোলা না যায়, যদি আইনের শাসন নিশ্চিত করা না যায়, যদি সুশাসন ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা না যায় তাহলে সংঘাতের পথ বন্ধ হবে না। বরং প্রতি পাঁচ বছর পরপর নির্বাচনকে সামনে রেখে একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটবে। অসহায় সিএনজি অটোরিকশার চালক দেখতে থাকবেন চোখের সামনে পুড়ে যাচ্ছে তার জীবিকার উৎস। অথচ যারা পুড়িয়ে দিলেন তাদের কেউ হয়তো ওই সিএনজি চালকেরই আত্মীয়, বন্ধু কিংবা প্রতিবেশী। ক্ষমতার রাজনীতি সেই বন্ধুত্ব, সেই আত্মীয়তার বন্ধন কিংবা বন্ধুত্বের দাবিও অস্বীকার করে।
ক্ষমতা মানুষকে অন্ধ করে দেয়। এতটাই অন্ধ করে দেয় যে সে তার বন্ধুকেও চেনে না। চেনে না বলেই যুগে যুগে এই ক্ষমতার মোহে অন্ধ হয়ে ক্ষমতা নামক বাঘের পিঠে চড়ার পরে কেউ আর নামতে চায় না। কারণ ওই পিঠ থেকে নামার পরে ওই বাঘ তাকে খেয়ে ফেলতে পারে-এই ভয় তার মনের ভেতরে সদা জাগ্রত থাকে।
লেখক: কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স এডিটর, নেক্সাস টেলিভিশন।

মতামত দিন
মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে