ইরানে প্রকাশ্যে হিজাব ছাড়ছেন নারীরা
ইরানে যুদ্ধ, অর্থনৈতিক সংকট ও রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যেই প্রকাশ্যে হিজাব পরা থেকে বিরত থাকছেন ক্রমবর্ধমানসংখ্যক নারী। তেহরানের পাশাপাশি দেশটির বিভিন্ন শহরের রাস্তায় খোলা চুলে নারীদের চলাচল এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি দৃশ্যমান। এতে বাধ্যতামূলক হিজাব আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ করা নিয়ে নতুন করে চাপে পড়েছে ইরান সরকার।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংঘাত এবং দেশের অভ্যন্তরে নিরাপত্তা পুনর্গঠনের মতো বিষয়গুলো সামলাতে গিয়ে নারীদের পোশাকবিধি কঠোরভাবে প্রয়োগের বিষয়টি সরকারের অগ্রাধিকারে কিছুটা পিছিয়েছে বলে বিশ্লেষণে উঠে এসেছে। তবে দেশটির কট্টরপন্থি ধর্মীয় নেতা ও রাজনীতিকরা আবারও বাধ্যতামূলক হিজাব আইন কঠোরভাবে কার্যকরের দাবি জানাচ্ছেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন ভিডিওতে তেহরানসহ ইরানের কয়েকটি শহরে স্কার্ফ ছাড়া নারীদের চলাচল করতে দেখা যাচ্ছে। অনেক নারী খোলা চুলে রাস্তায় বের হচ্ছেন, কেউ কেউ স্কুটারও চালাচ্ছেন। যুদ্ধের সময় সরকারপন্থি কিছু অনুষ্ঠানেও হিজাব ছাড়া নারীদের উপস্থিতি দেখা গেছে।
ইরানে বাধ্যতামূলক হিজাব আইন নিয়ে এই পরিস্থিতির পেছনে সবচেয়ে বড় ঘটনা হিসেবে বিবেচনা করা হয় মাহসা আমিনির মৃত্যুকে। ২০২২ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর হিজাববিধি যথাযথভাবে না মানার অভিযোগে ২২ বছর বয়সী কুর্দি-ইরানি তরুণী মাহসা আমিনিকে তেহরান থেকে আটক করে নীতি পুলিশ। তিন দিন পর পুলিশি হেফাজতে তার মৃত্যু হয়। তার মৃত্যুর পর দেশজুড়ে ‘নারী, জীবন, স্বাধীনতা’ আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে।
বিক্ষোভের সময় হাজার হাজার মানুষ আটক হন এবং জাতিসংঘের একটি তদন্তে নিরাপত্তা বাহিনীর প্রাণঘাতী বল প্রয়োগের বিষয়টি উঠে আসে। পরে আন্দোলন কঠোরভাবে দমন করা হলেও বাধ্যতামূলক হিজাবের বিরুদ্ধে নারীদের প্রকাশ্য অবস্থান পুরোপুরি থামানো যায়নি।
১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর ধীরে ধীরে ইরানে নারীদের জন্য বাধ্যতামূলক ইসলামি পোশাক চালু করা হয়। ২০০০-এর দশকে নীতি পুলিশ এই আইন প্রয়োগের অন্যতম প্রধান হাতিয়ার হয়ে ওঠে। তবে ২০২২ সালের আন্দোলনের পর রাস্তায় নারীদের পোশাকবিধি মানানোর ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষের কার্যক্রমে পরিবর্তন দেখা যায়।
২০২৪ সালে হিজাববিধি লঙ্ঘনের জন্য আরও কঠোর শাস্তি ও নজরদারির বিধান রেখে আইন অনুমোদন করা হলেও সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের হস্তক্ষেপে এর বাস্তবায়ন স্থগিত করা হয়। বর্তমানে কট্টরপন্থিরা সেই আইন কার্যকরের দাবি জানালেও সরকার সরাসরি নারীদের বিরুদ্ধে বড় ধরনের অভিযান চালাতে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।
এর অন্যতম কারণ, হিজাব আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ করতে গিয়ে আবারও বড় ধরনের গণবিক্ষোভের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। যুদ্ধ ও অর্থনৈতিক সংকটে থাকা ইরানের জন্য নতুন করে অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।
ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানও জোর করে মানুষের আচরণ পরিবর্তনের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তার বক্তব্য, আচরণ পরিবর্তন সাংস্কৃতিক ও বিশ্বাসের বিষয়; শক্তি প্রয়োগ করে মানুষের মনে বিশ্বাস তৈরি করা যায় না।
তবে কট্টরপন্থিরা ভিন্ন অবস্থানে রয়েছেন। তাদের দাবি, হিজাব আইন প্রয়োগ করা শুধু আইনি দায়িত্ব নয়, ধর্মীয় দায়িত্বও। ইতোমধ্যে পোশাকবিধি না মানার অভিযোগে বিভিন্ন ক্যাফে ও রেস্তোরাঁ বন্ধ করে দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।
ফলে ইরান সরকারের সামনে এখন দ্বিমুখী চাপ। একদিকে কট্টরপন্থিদের হিজাব আইন কঠোরভাবে প্রয়োগের দাবি, অন্যদিকে বিপুলসংখ্যক নারীর প্রকাশ্য অমান্যতা এবং তা দমন করতে গেলে নতুন বিক্ষোভের আশঙ্কা। মাহসা আমিনির মৃত্যুর পর যে আন্দোলন ইরানের শাসকগোষ্ঠীকে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছিল, সেই অভিজ্ঞতার কারণে তেহরান নতুন করে একই পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে চাইছে না। সূত্র: সিএনএন
মতামত দিন