Views Bangladesh Logo

এপস্টেইন ফাইল কী, কে কীভাবে জড়িত

R J Hridoy

আর জে হৃদয়

কজন মানুষের ব্যক্তিগত অপরাধ কীভাবে ধীরে ধীরে বৈশ্বিক রাজনীতি, কূটনীতি, দাতব্য, গবেষণা ও গোয়েন্দা তৎপরতার সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে—‘এপস্টেইন ফাইলস’ তার এক ভয়ংকর দলিল। এটি কেবল একজন কুখ্যাত অপরাধীর কাহিনি নয়; বরং এটি দেখায়, ক্ষমতা ও প্রভাব কীভাবে বিচারব্যবস্থার সীমা ঝাপসা করে দিতে পারে এবং কীভাবে গোপনীয়তার আড়ালে বছরের পর বছর ধরে ভয়াবহ অপরাধ চলতে পারে।

বিশ্বজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রে উঠে আসা ‘এপস্টেইন ফাইলস’ মার্কিন ধনকুবের জেফরি এপস্টেইনের অপরাধ, সম্পদ এবং সামাজিক নেটওয়ার্ক সম্পর্কে অভূতপূর্ব তথ্য প্রকাশ করেছে। লাখ লাখ পাতার নথি, ছবি, ইমেইল, আর্থিক রেকর্ড, ব্যক্তিগত বিমান ও ইয়টের যাত্রার তালিকা এবং অসংখ্য সাক্ষীর জবানবন্দি এমন এক ব্যক্তির কার্যক্রমের বিস্তৃত চিত্র তুলে ধরেছে, যার অপরাধ, প্রভাব ও সম্পদ একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে ছিল।

গত কয়েক দশক ধরে এপস্টেইনের কার্যক্রম তদন্ত করতে গিয়ে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, আদালত এবং সাংবাদিকরা লাখ লাখ পাতার নথিপত্র সংগ্রহ করেছেন। এসব ফাইলে রয়েছে ছবি, ইমেইল, বিমান যাত্রার লগ, আর্থিক রেকর্ড এবং সাক্ষীদের শপথ পড়ানো বক্তব্য। এগুলো এমন এক ব্যক্তির কর্মকাণ্ডের বিশদ বিবরণ দেয়, যিনি অপ্রাপ্তবয়স্কদের পাচার করতেন, বিশ্বের ক্ষমতাধর ব্যক্তিদের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলেছিলেন এবং প্রভাব ও গোপনীয়তার জটিল জালের মাধ্যমে তার অপরাধ দীর্ঘদিন আড়াল করতে সক্ষম হয়েছিলেন।

‘এপস্টেইন ফাইলস’ মূলত জেফরি এপস্টেইনের বিরুদ্ধে কয়েক দশকের তদন্তে সংগৃহীত প্রমাণের একটি পূর্ণাঙ্গ সংকলন। ২০০৫ সালে ফ্লোরিডার স্থানীয় ও রাজ্য কর্তৃপক্ষ যৌন নির্যাতন ও মানবপাচারের অভিযোগে তার বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করে। সেই প্রাথমিক তদন্ত থেকেই তৈরি হয় বিস্তারিত পুলিশ রিপোর্ট, সাক্ষীদের বক্তব্য এবং প্রমাণের তালিকা—যা পরবর্তীতে ফেডারেল পর্যায়ের তদন্তের ভিত্তি হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

এরপর এফবিআই এবং মার্কিন অ্যাটর্নি অফিস গ্র্যান্ড জুরির মাধ্যমে এপস্টেইনের কার্যক্রমের বিস্তৃত তদন্ত চালায়। তবে ২০০৮ সালে ফ্লোরিডায় একটি বিতর্কিত আপসমূলক চুক্তিতে এপস্টেইন প্রবেশ করেন, যা তার অপরাধের মাত্রার তুলনায় অত্যন্ত কম বলে ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দেয়। এই চুক্তি বহু বছর ধরে বিচারব্যবস্থার ওপর প্রশ্ন তুলে রেখেছে।

২০১৯ সালে নিউইয়র্কে ফেডারেল অভিযোগ পুনরায় জোরদার হলে তদন্ত নতুন গতি পায়। সেই সময় আরও বিপুল নথি সংগ্রহ করা হয়—যার মধ্যে রয়েছে বিমান যাত্রার বিস্তারিত লগ, সাক্ষীদের হিসাব, আর্থিক লেনদেনের রেকর্ড এবং অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ। ২০২১–২০২২ সালে অপ্রাপ্তবয়স্ক পাচারের অভিযোগে ব্রিটিশ অভিজাত নারী গিসলেইন ম্যাক্সওয়েলের দোষী সাব্যস্ততা ‘এপস্টেইন ফাইলসের’ প্রমাণভিত্তিকে আরও শক্তিশালী করে এবং সংরক্ষণাগারে নতুন স্তর যোগ করে।

এই ফাইলগুলোর বড় অংশ যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি সংস্থার নিয়ন্ত্রণে ছিল—বিশেষ করে বিচার বিভাগ (ডিওজে), ফেডারেল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (এফবিআই) এবং ফেডারেল আদালতের কাছে। ভুক্তভোগীদের পরিচয় রক্ষা, গ্র্যান্ড জুরির গোপনীয়তা বজায় রাখা এবং চলমান তদন্তের স্বার্থে অধিকাংশ নথি দীর্ঘদিন সিলগালা অবস্থায় রাখা হয়েছিল।

পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে ২০২৫ সালের নভেম্বরে, যখন কংগ্রেস ‘এপস্টেইন ফাইলস ট্রান্সপারেন্সি অ্যাক্ট’ পাস করে। এই আইন ডিওজেকে নির্দেশ দেয়, সব অশ্রেণীবদ্ধ নথি অনুসন্ধানযোগ্য ও ডাউনলোডযোগ্য ফরম্যাটে প্রকাশ করতে। তবে একই সঙ্গে ভুক্তভোগীদের সুরক্ষা এবং চলমান তদন্তের কারণে কিছু অংশ বাদ দেওয়ার সুযোগও রাখা হয়।

আইন অনুযায়ী ১৯ ডিসেম্বর ২০২৫-এ প্রথম ধাপে লাখ লাখ পাতার নথি প্রকাশ করা হয়। কিন্তু এই প্রকাশনা ব্যাপক সম্পাদনা ও কালো করা অংশের কারণে দুই দলের আইনপ্রণেতাদের কাছ থেকেই সমালোচনার মুখে পড়ে। অনেকেই অভিযোগ করেন, এটি আইনের মূল উদ্দেশ্য পূরণে ব্যর্থ হয়েছে।

এরপর ৩০ জানুয়ারি ২০২৬-এ বিশ্বের সামনে আসে এক বিশাল প্রকাশনা—যেখানে ৩৫ লাখেরও বেশি পাতা, প্রায় ২ হাজার ভিডিও এবং প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার ছবি অন্তর্ভুক্ত ছিল। বিচার বিভাগের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা ৩০ লাখের বেশি পৃষ্ঠা পর্যালোচনা করতে গিয়ে নিউইয়র্ক টাইমস প্রায় ৪০টি স্পষ্ট ছবি খুঁজে পায়। ছবিগুলো একটি ব্যক্তিগত ফটো সংগ্রহের অংশ বলে মনে হয়, যেখানে নগ্ন দেহ এবং ছবিতে থাকা ব্যক্তিদের মুখও দেখা যাচ্ছিল।

ছবির ব্যক্তিরা দেখতে তরুণ মনে হলেও তারা অপ্রাপ্তবয়স্ক কি না, তা স্পষ্ট নয়। কিছু ছবিতে সমুদ্রসৈকতসহ এপস্টেইনের ব্যক্তিগত দ্বীপের দৃশ্য দেখা যায়। অন্য কিছু ছবি তোলা হয়েছে শোবার ঘর ও ব্যক্তিগত স্থানে।

তবুও বিশেষজ্ঞদের মতে, সংরক্ষণাগারের বিশালতার কারণে আরও কিছু উপাদান এখনো গোপন থাকতে পারে।

‘এপস্টেইন ফাইলস’র বিষয়বস্তু বহুমাত্রিক ও বিস্তৃত। আদালতের নথিতে রয়েছে অভিযোগপত্র, প্রস্তাব, আপস চুক্তি, সাজা সংক্রান্ত স্মারকলিপি এবং ভুক্তভোগী ও সাক্ষীদের শপথ পড়ানো জবানবন্দি। ইমেইল ও চিঠিপত্র এপস্টেইন, গিসলেইন ম্যাক্সওয়েল এবং তাদের সহযোগীদের মধ্যে যোগাযোগের বিস্তারিত তুলে ধরে। বিমান যাত্রার লগে এপস্টেইনের ব্যক্তিগত জেট ও ইয়টের যাত্রাপথ, যাত্রীদের তালিকা এবং বিশ্বজুড়ে গন্তব্যের বিবরণ রয়েছে।

কিছু ছবি ও ভিডিওতে নির্যাতনের দৃশ্যও আছে। এসব এপস্টেইনের সামাজিক অনুষ্ঠান এবং ব্যক্তিগত সমাবেশ থেকে সংগৃহীত। আর্থিক রেকর্ডে ব্যাংক স্টেটমেন্ট, অর্থ স্থানান্তর, সম্পত্তির নথি এবং কর্পোরেট ফাইলিং রয়েছে, যা তার সম্পদ ও প্রভাব বজায় রাখার কৌশল প্রকাশ করে।

সাক্ষী ও ভুক্তভোগীদের বক্তব্যে নির্যাতন, পাচার এবং জোরজবরদস্তির ভয়াবহ বিবরণ উঠে আসে। পাশাপাশি আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ও সাংবাদিকদের কাছে জমা দেওয়া তথ্য অতিরিক্ত সূত্র ও সংযোগের ইঙ্গিত দেয়। সব মিলিয়ে, এই ফাইলগুলো এপস্টেইনের অপরাধ সাম্রাজ্যের বিস্তার এবং তার গড়ে তোলা জটিল সামাজিক ও পেশাদার নেটওয়ার্কের পূর্ণাঙ্গ দলিল।

এই প্রকাশনার রাজনৈতিক প্রভাব ছিল তীব্র। চলতি সপ্তাহে এটি প্রকাশের আগেই যুক্তরাষ্ট্রে বড় রাজনৈতিক সংঘর্ষ শুরু হয়। মার্কিন প্রতিনিধি রো খান্নার মতো আইনপ্রণেতারা ডিওজের বিলম্ব এবং অসম্পূর্ণ প্রকাশের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে প্রতিবাদ জানান। সমালোচকরা ডিওজে নেতৃত্বের বিরুদ্ধে দায়িত্ব এড়ানো এবং আইন পুরোপুরি বাস্তবায়নে ব্যর্থ হওয়ার অভিযোগ তোলেন—যা মার্কিন রাজনৈতিক সংবাদে বড় শিরোনাম হয়।

‘এপস্টেইন ফাইলস’র বৈশ্বিক প্রভাবও ছিল সুদূরপ্রসারী। স্লোভাকিয়ায় একজন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা পদত্যাগ করেন, যখন তার সঙ্গে এপস্টেইনের পরোক্ষ যোগাযোগের চিঠিপত্র প্রকাশ পায়, যদিও তিনি অভিযোগ অস্বীকার করেন। নরওয়েতে ক্রাউন প্রিন্সেস মেটে-মারিট এপস্টেইনের সঙ্গে অতীত যোগাযোগের জন্য জেরার মুখে পড়েন এবং প্রকাশ্যে সেটিকে ‘বিব্রতকর’ বলে স্বীকার করে ক্ষমা চান।

যুক্তরাষ্ট্রে ইলন মাস্ক, বিল গেটস, হাওয়ার্ড লুটনিক ও রিচার্ড ব্র্যানসনের মতো ব্যবসায়ী ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের নাম নথিতে আসে। মাস্ক নথিতে তার সীমিত উল্লেখ স্বীকার করলেও অপরাধমূলক কার্যকলাপের সম্পৃক্ততা অস্বীকার করেন। গেটসসহ অন্যদের নাম ইমেইল বা চিঠিপত্রে থাকলেও বেআইনি কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

ডোনাল্ড ট্রাম্পের নাম পুরোনো ছবি ও বিমান যাত্রার লগে দেখা গেলেও বর্তমান প্রকাশনায় তার বিরুদ্ধে অপরাধমূলক কার্যকলাপের ইঙ্গিত নেই। যুক্তরাজ্যে প্রিন্স অ্যান্ড্রুর সঙ্গে এপস্টেইন ও ম্যাক্সওয়েলের সম্পর্ক নতুন করে আলোচনায় আসে।

ভারতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নাম ২০১৭ সালে ইসরায়েলে তার সরকারি সফরের প্রসঙ্গে উল্লেখ করা হয়। ভারত সরকার অভিযোগ দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করে জানায়, এটি শুধুই সরকারি কূটনৈতিক প্রেক্ষাপট। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় স্পষ্ট করে যে- মোদি ও এপস্টেইনের মধ্যে কোনো ব্যক্তিগত যোগাযোগ বা বৈঠক হয়নি। তবে বিরোধী দল সংসদীয় আলোচনার দাবি তোলে।

ফাইলগুলোতে বিশিষ্ট ভারতীয়-আমেরিকান চলচ্চিত্র নির্মাতা মীরা নায়েরের নামও আসে—গিসলেইন ম্যাক্সওয়েল আয়োজিত একটি সামাজিক সমাবেশে অংশগ্রহণের সূত্রে। তবে সেটি কোনো অপরাধমূলক আচরণের সঙ্গে যুক্ত নয়।

‘এপস্টেইন ফাইলস’ অনুযায়ী, ২০১৮ সালে সাংবাদিক জামাল খাশোগি হত্যার পর এপস্টেইন লিখেছিলেন যে সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ বিন জায়েদ সম্ভবত সৌদি ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমানকে জড়াতে পরিস্থিতি পরিকল্পনা করেছিলেন। তিনি এটিকে বৃহত্তর ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে উল্লেখ করেন এবং হ্যাক করা ভিডিও ফুটেজের কথা বলেন।

নথিতে আরও দাবি করা হয়, এপস্টেইন ইসরায়েলি ও মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং ইসরায়েলের সাবেক প্রধানমন্ত্রী এহুদ বারাকের অধীনে প্রশিক্ষণ পেয়েছিলেন—যা তার বৈশ্বিক নেটওয়ার্কের গভীরতা তুলে ধরে।

বাংলাদেশ প্রসঙ্গে এখন পর্যন্ত কোনো ভেরিফায়েড আন্তর্জাতিক সূত্রে কোনো বাংলাদেশি পাবলিক ফিগারের নাম নিশ্চিত করেনি। তবে ফাইলগুলোতে আইসিডিডিআরবি (আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ) এর কথা উল্লেখ রয়েছে। ১৭ এপ্রিল ২০১৪ সালের একটি ইমেইলে প্রতিষ্ঠানটিকে ‘সুপরিচিত’ হিসেবে বর্ণনা করে দীর্ঘমেয়াদি প্রো-বায়োটিক গবেষণায় বিনিয়োগের প্রস্তাব দেওয়া হয়। ২০১৫ সালের একটি আইমেসেজে এপস্টেইন বাংলাদেশে গবেষণায় সহায়তার আগের প্রচেষ্টার কথা উল্লেখ করেন, যা প্রত্যাশিত ফল দেয়নি বলে দাবি করেন। ২০১০ সালের একটি ইমেইলে তার এক সহযোগীর বাংলাদেশ ও ভারত সফরের ইঙ্গিতও পাওয়া যায়।

‘এপস্টেইন ফাইলস’ শুধু অপ্রাপ্তবয়স্কদের নির্যাতন ও পাচারের নথি নয়; এটি দেখায় কীভাবে বৈশ্বিক প্রভাবের নেটওয়ার্ক অপরাধকে দীর্ঘদিন অদৃশ্য রাখতে পারে। একই সঙ্গে এটি মনে করিয়ে দেয়—ফাইলে কারও নাম থাকা মানেই অপরাধী হওয়া নয়, এবং দোষারোপের ক্ষেত্রে সতর্ক ব্যাখ্যা অপরিহার্য।

সবশেষে বলা যায়, ‘এপস্টেইন ফাইলস’ একটি চলমান আইনি, রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রক্রিয়ার অংশ। এই নথিগুলোর ধারাবাহিক বিশ্লেষণ জবাবদিহিতা, স্বচ্ছতা এবং ভুক্তভোগীদের কণ্ঠস্বরকে সামনে আনার গুরুত্ব তুলে ধরে—যাতে ভবিষ্যতে এমন ভয়াবহ অপরাধ আর কখনো গোপনে বেড়ে উঠতে না পারে।

মতামত দিন

মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে

ট্রেন্ডিং ভিউজ