Views Bangladesh Logo

ভারত মহাসাগর কেন বৈশ্বিক অর্থনীতি ও ভূরাজনীতির গুরুপূর্ণ দ্বার?

Simon Mohsin

সাইমন মোহসিন

গত কয়েক দশকে ভারত মহাসাগরের ভূ-অর্থনৈতিক ও ভূকৌশলগত গুরুত্ব পরিষ্কার হয়ে উঠেছে। গত মে মাসে ঢাকায় ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রলায়ের সঙ্গে যৌথভাবে বাংলাদেশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ভারত মহাসাগর সম্মেলন আয়োজন করে। ভারত মহাসাগরের সার্বিক উকর্ষের লক্ষ্যে একটি রোডম্যাপ প্রণয়নের জন্য এ সম্মেলনে সব গুরুত্বপূর্ণ অংশীদারদের একত্রিত করা হয়। একবিংশ শতাব্দীতে বৈশ্বিক রাজনীতির প্রকৃতি দ্রুতগতিতে পরিবর্তনশীল। নতুন চ্যালেঞ্জগুলো সামলাতে এবং নিজেদের জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় সংশ্লিষ্ট সব রাষ্ট্র সময়োচিত কৌশল অবলম্বন করতে চাইছে। বৈশ্বিক বিনিয়োগ ও বাণিজ্যের প্রসার এবং বাজারকেন্দ্রিক টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনের মাধ্যমে এই অঞ্চলে কর্মসংস্থান সৃষ্টির অপার সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে বিশ্বের তৃতীয় সর্ববৃহ মহাসাগরের প্রতি এখন বিশেষ আগ্রহ বিশ্ব শক্তিগুলোর।

 

ভারত মহাসাগরের এক গুরুত্বপূর্ণ উপকূলীয় রাষ্ট্র বাংলাদেশ। এ অঞ্চলের সামগ্রিক উকর্ষের সমন্বয়ে বাংলাদেশের গুরুত্ব অপরিসীম। ভারত মহাসাগরের কেন্দ্রীয় অবস্থানে রয়েছে বঙ্গোপসাগর, আর বঙ্গোপসাগরের কেন্দ্রীয় অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ। বঙ্গোপসাগরের উপকূলব্যাপী ১৩টি বন্দর বিদ্যমান, যার মধ্যে চারটিই (পায়রা, মোংলা, চট্টগ্রাম ও মাতারবাড়ী) বাংলাদেশের সমুদ্রসীমার অন্তর্ভুক্ত। বঙ্গোপসাগরের মতো গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক সমুদ্রপথের উকর্ষ ভারত মহাসাগরের সামগ্রিক কৌশলগত উন্নয়নের জন্য অপরিহার্য।

 

উত্তরে এশিয়া, পশ্চিমে আফ্রিকা, পূর্বে ভারত-চীন ও দক্ষিণে এন্টার্কটিকা নিয়ে বিশ্বের তৃতীয় সর্ববৃহ মহাসাগর এটি। বিশ্বের সমুদ্র অঞ্চলের প্রায় ২০ শতাংশজুড়ে ভারত মহাসাগর। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে প্রায় সাড়ে পাঁচ গুণ আয়তনে বড় ভারত মহাসাগর। বৈশ্বিক সামুদ্রিক বাণিজ্যিক অন্যতম সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ পথগুলো যেমন- স্ট্রেট অব হরমুজ, স্ট্রেট অব মালাক্কা, বাব-এল-মানদেব, সুন্দা ও লম্বক স্ট্রেট, মোজাম্বিক চ্যানেল, টেন ডিগ্রি ও সিক্স ডিগ্রি চ্যানেল, সুয়েজ ক্যানাল- এসবই ভারত মহাসাগরে অন্তর্ভুক্ত। ভারত মহাসাগরের ভৌগোলিক ও কৌশলগত গুরুত্ব এবং এর উপকূলীয় অঞ্চলে মজুত প্রাকৃতিক সম্পদের প্রাচুর্য এই সমুদ্র অঞ্চলের অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব আরও বৃদ্ধি করে।

 

বিশ্বের তেল মজুতের দুই-তৃতীয়াংশ ভারত মহাসাগরের উপকূলীয় রাষ্ট্রগুলোয় রয়েছে। বিশ্বের গ্যাস মজুতের প্রায় ৩৫ শতাংশ, ইউরেনিয়ামের ৬০ শতাংশ, স্বর্ণের ৪০ শতাংশ এবং হীরকের ৮০ শতাংশ এই দেশগুলোতে মজুত রয়েছে। ভারত মহাসাগরের ওপর দিয়ে জাপানের প্রায় ৯০ শতাংশ, ইতালির ৮৫ শতাংশ, ব্রিটেন ও জার্মানির ৬০ শতাংশ ও ফ্রান্সের প্রায় ৫০ শতাংশ তেল বাণিজ্য সংঘটিত হয়ে থাকে। এ উপকূলীয় অঞ্চলে শিল্পবাণিজ্যসংশ্লিষ্ট কাঁচামালের বিশাল মজুতও এই মহাসাগরের গুরুত্ব আরও বৃদ্ধি করে। লিথিয়াম, বেরিলিয়াম, জিরকোনিয়াম, থোরিয়াম, কয়লা, লোহা, তামা, ম্যাঙ্গানিজ, টিন, বক্সাইট, ক্রোমাইট, নিকেল, কোবাল্ট, ফসফেটসহ আরও অনেক খনিজই এই অঞ্চলে মজুত রয়েছে।

 

সমুদ্রপথে বৈশ্বিক বাণিজ্যের বিচারে ভারত মহাসাগরের অর্থনৈতিক গুরুত্ব তো ইতোমধ্যেই পরিষ্কার। সমুদ্রপথের নেটওয়ার্কের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধমনিগুলোর প্রায় সবই ভারত মহাসাগরের অংশ। এই সামুদ্রিক ধমনিগুলো বিশ্বের সবচেয়ে ব্যস্ততম বাণিজ্যিক পথের অন্যতম। বিশ্বের তেলজাত পণ্যের প্রায় ৭০ শতাংশ ভারত মহাসাগরের পথে আদান-প্রদান হয়। সমুদ্রপৃষ্ঠের তেল উত্তোলন বাণিজ্যের প্রায় ৪০ শতাংশ এই মহাসাগর পৃষ্ঠে হয়ে থাকে। বিশ্বের পুরো বাণিজ্যিক মস্য শিকারের প্রায় ১৫ শতাংশ এই মহাসাগরে হয়ে থাকে। বিশ্বের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ মানুষ এই মহাসাগরের তীরবর্তী দেশে বসবাস করে। এই অঞ্চলের বিশাল বাজার ও মানবসম্পদের সম্ভাবনা এতেই পরিষ্কার। বিশ্বের প্রায় ১০ শতাংশ জিডিপি এই তীরবর্তী রাষ্ট্রগুলো থেকেই উপত্তি হয়। ভারত মহাসাগরবর্তী দক্ষিণ এশীয়, আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো অর্থনৈতিক সমন্বয় ও একীভূতকরণ এদের সবার জন্য বিপুল উন্নয়ন বয়ে আনতে সক্ষম।

 

চীন ইতোমধ্যে এই অঞ্চলের কৌশলগত গুরুত্ব অনুধাবন করে এখানে তার সামরিক শক্তিবর্ধনে সচেষ্ট। দক্ষিণ এশিয়ার অধিকাংশ রাষ্ট্রই বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সম্পর্কসংশ্লিষ্ট বিষয়ে চীনের ওপর প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে নির্ভরশীল। ফলে এই মহাসাগরে সামরিক শক্তিবর্ধনে চীন দক্ষিণ এশিয়ান রাষ্ট্রগুলোর সহযোগিতায়ই অনেকটা প্রণয়ন করছে। একই সঙ্গে, চীনের মতো ভারতও এ অঞ্চলে তার কৌশলগত শক্তি বৃদ্ধিতে তপর। দুই দেশই এই মহাসাগরের উপকূলে কয়েকটি গভীর সমুদ্রবন্দর অর্থায়ন করছে। যেমনটা জাপান করছে বাংলাদেশের সীমান্তে। ঠিক তেমনি পাকিস্তানের গোয়াদার বন্দর চীন ও ইরানের ছাবার বন্দর ভারতের অর্থায়নে প্রতিষ্ঠিত। ভারত ও চীনের চলমান প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রও এই অঞ্চলে এখন হস্তক্ষেপ অব্যাহত রেখেছে। ফলে ভারত মহাসাগর অঞ্চলের ভূরাজনৈতিক জটিলতা কেবল বৃদ্ধিই পাচ্ছে বৈকি।

 

উপরোল্লিখিত আলোচনা থেকেই পরিষ্কার যে, কী কারণে বিশ্ব পরাশক্তিদের মনোযোগ এখন ভারত মহাসাগরবর্তী এশিয়ান ও আফ্রিকান অঞ্চলের প্রতি নিবিষ্ট হয়েছে। ভারত মহাসাগরে ভারত, চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের নতুন ভূমিকা ও উদ্যোগের ফলে ভারত মহাসাগর এখন বিশ্ব অর্থনীতি ও রাজনীতির কেন্দ্রে পরিণত হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, ইইউ, জাপান, অস্ট্রেলিয়াসহ অনেকের ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলপত্রই এর সবচেয়ে বড় নিদর্শন।

ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলের প্রণয়ন-পরবর্তী বিশ্বের মেরুকরণ প্রক্রিয়া যেন ত্বরান্বিত হয়েছে। ইন্দো-প্যাসিফিক প্রণয়নে সচেষ্ট রাষ্টগুলো এমন এক বিশ্বব্যবস্থা বাস্তবায়নে ব্যতিব্যস্ত, যেই বিশ্বব্যবস্থা তাদের স্বার্থসিদ্ধিকেন্দ্রিক হবে। নিজ স্বার্থসংশ্লিষ্ট কৌশল অবলম্বন করেই কেবল ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলে তারা সবার অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে তপর।

 

বাংলাদেশ তার পররাষ্ট্রনীতির আওতায় আইওআরএর সভাপতিত্বে এই মহাসাগর ও তীরবর্তী অঞ্চলের নিরাপত্তা, সংযোগ, শান্তি ও সমৃদ্ধির প্রসারে একচেটিয়া কাজ করছে। এ অঞ্চলের স্থিতিশীলতা ও সমৃদ্ধি বাস্তবায়নে বাংলাদেশ অনন্য ভূমিকা পালন করতে পারে। ভারত মহাসাগরের গুরুত্ব অনুধাবনের পাশাপাশি ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ইন্দো-প্যাসিফিক এক নতুন বাস্তবতা। বাংলাদেশের এই বাস্তবতার বিচারে নিজ নীতিনির্ধারণী কৌশল, পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন সক্ষমতা বৃদ্ধির প্রতি মনোনিবেশ করা প্রয়োজন।

 

লেখক: রাজনৈতিক ও আন্তর্জাতিকবিষয়ক বিশ্লেষক

 

মতামত দিন

মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে

ট্রেন্ডিং ভিউজ