Views Bangladesh Logo

ঘূর্ণিঝড় রিমাল

মানবিক সহায়তার পাশাপাশি ভবিষ্যতের নিরাপত্তা বাড়ান

ধারণার চেয়েও অধিক ভয়াবহ তাণ্ডব সৃষ্টি করল রিমাল। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত ভয়ংকর এই ঘূর্ণিঝড়ের আঘাতে বিভিন্ন জেলায় প্রাণ হারিয়েছেন ১৬ জন। বেশি মৃত্যু হয়েছে গাছ ও দেয়ালচাপায়। জলোচ্ছ্বাসে ভেসে যাওয়ার খবর পাওয়া গেছে দুজনের। নজিরবিহীন ক্ষতি হয়েছে ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট, ফসলি জমি ও মাছের ঘেরের। মঙ্গলবার (২৮ এপ্রিল) সংবাদমাধ্যমে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ঘূর্ণিঝড় রিমালে ১৯ জেলার ১০৭টি উপজেলার বাসিন্দা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। এসব এলাকায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা ৩৭ লাখ ৫৮ হাজারের বেশি। সম্পূর্ণভাবে বিধ্বস্ত হয়েছে ৩৫ হাজার ৪৮৩টি ঘরবাড়ি। এ ছাড়াও আংশিকভাবে বিধ্বস্ত হয়েছে ১ লাখ ১৪ হাজার ৯৯২টি ঘরবাড়ি।

দুঃখের বিষয়, বেশির ভাগ ক্ষতিই হয়েছে অব্যবস্থাপনার কারণে। আগে থেকে আরও সচেতন হলে খুব সহজেই এ ক্ষতি অনেকটা কমানো যেত। প্রায় সব কয়টি উপকূলীয় জেলাতেই শত কিলোমিটার দীর্ঘ বেড়িবাঁধের পাঁচ-দশ কিলোমিটার বাঁধ ঝুঁকিপূর্ণ ছিল আগে থেকেই। প্রশ্ন হচ্ছে, কেন ১০ কিলোমিটার বাঁধ অরক্ষিত থাকল? কেন আগে থেকেই বাঁধ ঠিক করা হলো না? তাহলে ২১টি স্থানে বাঁধ ভেঙে যেত না।

ঘূর্ণিঝড় শুরু হওয়ার আগেই ঝোড়ো হাওয়ায় মোংলা নদীতে একটি ট্রলারডুবির খবর পাওয়া গেছে। আসলে ঝোড়ো হাওয়ার কারণে নয়, ট্রলারডুবি হয়েছে অতিরিক্ত যাত্রী বহনের কারণে। আর তখন ৭ নম্বর বিপদসংকেত চলচ্ছিল। এর মধ্যেই খুলনা ইপিজেড থেকে ফোন করে শ্রমিকদের কারখানায় আসতে বাধ্য করা হয়। অথচ দুর্যোগ ব্যবস্থানা আইন অনুযায়ী ৭ নম্বর বিপদসংকেতের সময় উপকূলীয় অঞ্চলে যে কোনো ধরনের কল-কারখানা বন্ধ থাকার কথা। তার মানে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা আইনও এখন মানছেন না অনেকে। ভাগ্য ভালো, ট্রলারডুবির ঘটনায় কোনো প্রাণহানি হয়নি, যদি ৮০ যাত্রীর সবাই সেদিন মারা যেতেন, তাহলে কী হতো!

এদিকে ঝড় হয়েছে উপকূলে; কিন্তু রাজধানী ঢাকায় সৃষ্টি হয়েছে প্রচুর জলবদ্ধতা। ঢাকার আশপাশের অঞ্চলগুলো প্রায় তলিয়ে গেছে। অনেক রাস্তাঘাট ডুবে গেছে। ঘূর্ণিঝড়ের পরদিন সকালে কর্মক্ষেত্রে পৌঁছাতে রাজধানীবাসীর প্রচণ্ড ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে। রাজধানীর অনেক ছাত্রছাত্রী স্কুল-কলেজেও যেতে পারেনি। প্রচুর বৃষ্টি হয়েছে এ কথা সত্য, তাই বলে এক দিন-এক রাতের বৃষ্টিতে রাজধানী যদি তলিয়ে যায়, তাহলে উপকূলীয় অঞ্চলের সঙ্গে ঢাকার পার্থক্য থাকল কী! অন্যদিকে, ঘূর্ণিঝড় রিমালের প্রভাবে সারা দেশের ২ কোটি ৬৯ লাখ ৪৭ হাজার ৭০০ গ্রাহক বিদ্যুৎবিচ্ছিন্ন ছিলেন। শুধু উপকূলীয় অঞ্চল নয়, বিদ্যুৎ ছিল না অনেক জেলাতেই। মোবাইল নেটওয়ার্কও ছিল না অনেক জেলায়। ফলে বিদ্যুৎবিহীন অন্ধকারে থাকার পাশাপাশি মানুষ একরকম সব যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন ছিলেন।

বাংলাদেশ দুর্যোগপ্রবণ একটি দেশ। ঘূর্ণিঝড়-জলোচ্ছ্বাস এ দেশে হবেই। বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির ফলে প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের বড় শিকার বাংলাদেশ। তাই আগাম সাবধানতা ও ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহণ ছাড়া বাংলাদেশের মানুষের বাঁচার আর উপায় নেই। গত ৫০ বছরে অসংখ্য ঘূর্ণিঝড়ে বাংলাদেশের প্রচুর প্রাণহানি ও ব্যাপক ক্ষতি হওয়া সত্ত্বেও আমরা যে এখনো খুব সাবধান হয়েছি, তা বলা যাবে না। আমাদের জীবন যেন অনেকটা ভাগ্যের হাতে সমর্পণ করে দিয়ে বসে আছি। পদে পদেই আমাদের অব্যবস্থাপনা। বিপদ থেকেও আমাদের কোনো শিক্ষা হয় না।

বন্যা-ঘূর্ণিঝড়ে প্রাণহানি কমানো গেলেও দুর্যোগ-পরবর্তী পুনর্বাসনে সক্ষমতা আমাদের এখনো আসেনি। তাই সরকারের কাছে আমাদের আবেদন থাকবে, আশ্রয়কেন্দ্র থেকে গৃহহারা মানুষকে যত দ্রুত সম্ভব সব নিরাপত্তা দিয়ে আপন ঘরে ফিরে যাওয়ার ব্যবস্থা করা হোক। তাদের খাদ্য, আবাসস্থল, শিক্ষা ও চিকিৎসার সুষ্ঠু ব্যবস্থা করা হোক বা দেয়া হোক। দুর্গত অঞ্চলে দ্রুত ত্রাণসামগ্রী পৌঁছানোর ব্যবস্থা করা হোক। এর পাশাপাশি ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্যোগ থেকে বাঁচার ব্যবস্থা এখনই গ্রহণ করা হোক। বাংলাদেশে ঘূর্ণিঝড় হবেই, ঘূর্ণিঝড় ঠেকানো যাবে না, তবে তৎপরতা, পরিবর্তনশীল নীতি, সচেতনতা ও সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এ ধরনের ক্ষতি আরও কমানো সম্ভব।

মতামত দিন

মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে

ট্রেন্ডিং ভিউজ