Views Bangladesh Logo

মুসলিম বিশ্বে শীর্ষ নারী শাসক ছিলেন যারা

Shanto Zabaly

শান্ত জাবালি

মুসলিম বিশ্বের ইতিহাসে বেশ কয়েকজন নারী সফলভাবে রাষ্ট্র ও সরকার প্রধানের দায়িত্বপালন করেছেন। রাষ্ট্র পরিচালনায় তাদের দক্ষতার গৌরবময় অবদান স্মরণীয় হয়ে আছে। সেই মহীয়সী নারীদের নিয়েই আজকের প্রতিবেদন।

মুসলিম বিশ্বে নারী কেবল রাজনীতিতে অংশ নেননি, বরং বহু ক্ষেত্রে সরাসরি রাষ্ট্র পরিচালনাও করেছেন। তারা কেউ ছিলেন সুলতান, কেউ রানী, কেউ রাষ্ট্র প্রধান।

এই তালিকায় মধ্যযুগের খিলাফতি রাজনীতি থেকে শুরু করে আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র—সবই অন্তর্ভুক্ত। মধ্যযুগে দলীয় রাজনীতির ধারণা যেখানে ছিল না, সেখানে তারা ছিলেন একচ্ছত্র শাসক; আর আধুনিক রাষ্ট্রে তারা ছিলেন রাজনৈতিক দলের প্রধান, রাষ্ট্র কিংবা সরকার প্রধান। জেনে নেওয়া যাক, মুসলিম নারী নেত্রীদের ইতিহাস...

রাযিয়া সুলতানা
রাযিয়া সুলতানা ১২৩৬ থেকে ১২৪০ সাল পর্যন্ত দিল্লির সিংহাসনে অধিষ্ঠিত ছিলেন। তিনি ইতিহাসে প্রথম মুসলিম নারী, যিনি সরাসরি “সুলতান” উপাধিতে শাসন করেন। রাযিয়া নিজেকে কখনো “সুলতানা” বলেননি, বরং পুরুষ শাসকদের মতো “সুলতান” পরিচয় ব্যবহার করেছেন। তিনি পুরুষদের পোশাক পরে দরবারে বসতেন এবং নিজ হাতে সেনাবাহিনী পরিচালনা করতেন। রাজকীয় সিদ্ধান্তে তিনি স্বাধীন ছিলেন। উলামা ও অভিজাতদের একটি অংশ তার শাসনের বিরোধিতা করেছিল, যার বড় কারণ ছিল তার নারী পরিচয়। তবুও তিনি প্রশাসনিক দক্ষতার পরিচয় দেন।


শাজার আল-দুর
শাজার আল-দুর ছিলেন মিসরের শাসক। ১২৫০ সালে তিনি কার্যত মিসরের রাষ্ট্রক্ষমতা গ্রহণ করেন। তিনি আইয়ুবি ও প্রাথমিক মামলুক শাসনব্যবস্থার কেন্দ্রীয় চরিত্র ছিলেন। ফ্রান্সের রাজা লুই নবমের ক্রুসেড আক্রমণের সময় তিনি রাষ্ট্র পরিচালনা করেন । তার নামে মুদ্রা জারি করা হয় এবং খুতবায় তার নাম উচ্চারিত করা হতো, যা রাষ্ট্রপ্রধান হওয়ার সুস্পষ্ট ইসলামি চিহ্ন।


আরওয়া আল-সুলাইহি
রানী আরওয়া আল-সুলাইহি ইয়েমেন কে ১০৬৭ থেকে ১১৩৮ সাল পর্যন্ত প্রায় ৭০ বছর শাসন করেন। তিনি ফাতিমি খিলাফতের স্বীকৃত শাসক ছিলেন এবং তার নামেই জুমার খুতবা পাঠ করা হতো, যা ইসলামি রাষ্ট্রক্ষমতার সর্বোচ্চ স্বীকৃতি। তিনি প্রশাসন ও ধর্মীয় নেতৃত্ব একসঙ্গে পরিচালনা করেন এবং কূটনৈতিকভাবে অত্যন্ত দক্ষ ছিলেন। নিজ নামে ফরমান জারি করতেন। তিনি সরাসরি রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত নিতেন।


তাজ আল-আলম সফিয়াতুদ্দিন শাহ
তাজ আল-আলম সফিয়াতুদ্দিন শাহ ছিলেন আচেহ সালতানাতের শাসক। তিনি ১৬৪১ থেকে ১৬৭৫ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় ছিলেন এবং একজন নারী সুলতানাহ হিসেবে পরিচিত। আচেহে একাধিক নারী সুলতান শাসন করেছেন, যা মুসলিম বিশ্বের এক ব্যতিক্রমী দৃষ্টান্ত। তাঁর শাসনামলে ইসলামি শরিয়াহ আদালত সক্রিয় ছিল এবং ইউরোপীয় শক্তির সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখা হয়েছিল। তিনি ধর্মীয় ও রাজনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখেন এবং ধর্মীয় বৈধতার মাধ্যমে শাসন চালান।


নূর জাহান
নূর জাহান ছিলেন মুঘল সাম্রাজ্যের কার্যত শাসক। তিনি সম্রাট জাহাঙ্গীরের স্ত্রী ছিলেন এবং ১৬১১ থেকে ১৬২৭ সাল পর্যন্ত প্রকৃত ক্ষমতা প্রয়োগ করেন। তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে সম্রাজ্ঞী ছিলেন না, তবুও তার নামে ফরমান জারি হতো এবং মুদ্রায় তার নাম খোদাই করা হয়। তিনি সেনা ও প্রশাসন পরিচালনা করতেন, কূটনৈতিক সিদ্ধান্ত নিতেন এমনকি দরবারও নিয়ন্ত্রণ করতেন।


বেনজির ভুট্টো
বেনজির ভুট্টো ছিলেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী। তিনি ১৯৮৮–১৯৯০ এবং ১৯৯৩–১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় ছিলেন। তিনি পাকিস্তান পিপলস পার্টির চেয়ারম্যান ছিলেন এবং দলীয় প্রধানও ছিলেন। তিনি আধুনিক মুসলিম বিশ্বের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী। তিনি গণতান্ত্রিক রাজনীতির প্রতীক ছিলেন এবং সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেন। ১৯৯০ সালে প্রধানমন্ত্রী পদে থাকার সময়ই সন্তানের জন্ম দিয়ে ব্যতিক্রমী ইতিহাস সৃষ্টি করেন।


খালেদা জিয়া
১৯৯১–১৯৯৬ এবং ২০০১–২০০৬ সালে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। তিনি বিএনপির চেয়ারপারসন এবং দলীয় প্রধান ছিলেন। তিনি গণতান্ত্রিক আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন এবং সামরিক শাসন-পরবর্তী রাজনীতির নেতা হিসেবে পরিচিত। তিনি স্বৈরশাসন বিরোধী গণতান্ত্রিক সংগ্রামে আপসহীনেত্রী হিসেবে স্বীকৃতি পান। রাষ্ট্র পরিচালনায় তার দৃঢ়তা প্রশংসিত হয়েছে।



শেখ হাসিনা
শেখ হাসিনা বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ১৯৯৬–২০০১ এবং ২০০৯–২০২৪ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় ছিলেন।উন্নয়ন ও নারীর ক্ষমতায়নে তার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।তিনি আওয়ামী লীগের সভাপতি এবং দলীয় প্রধান। তিনি মুসলিম বিশ্বের সবচেয়ে দীর্ঘসময় ক্ষমতায় থাকা নারী সরকারপ্রধান। 


তানসু চিল্লার
তানসু চিল্লার ছিলেন তুরস্কের প্রথম ও একমাত্র নারী প্রধানমন্ত্রী। তিনি ১৯৯৩ থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। তিনি True Path Party এর চেয়ারপারসন এবং দলীয় প্রধান ছিলেন। তুরস্ক একটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ হলেও রাষ্ট্রীয়ভাবে ধর্মনিরপেক্ষ। তিনি একজন মুসলিম নারী সরকারপ্রধান হিসেবে অর্থনীতিবিদ হিসেবে রাজনীতিতে প্রবেশ করেন। তিনি অর্থনৈতিক সংস্কারে জোর দেন এবং রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্য দিয়ে দেশের ভারসাম্য রক্ষা করেন।


মেগাওয়াতি সুকর্ণোপুত্রী
মেগাওয়াতি সুকর্ণোপুত্রী ছিলেন ইন্দোনেশিয়ার রাষ্ট্রপতি। তিনি ২০০১ থেকে ২০০৪ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। ইন্দোনেশিয়া বিশ্বের সবচেয়ে বড় মুসলিম জনসংখ্যার দেশ। তিনি ইন্দোনেশিয়ান ডেমোক্রেটিক পার্টি অব স্ট্রাগল (PDI-P)–এর চেয়ারপারসন এবং দলীয় প্রধান ছিলেন। তিনি ইন্দোনেশিয়ার প্রথম নারী রাষ্ট্রপতি এবং দেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি সুকর্ণোর কন্যা। তার রাজনৈতিক উত্থান গণআন্দোলনের মাধ্যমে হয়।


আতিফেতে জাহজাগা
আতিফেতে জাহজাগা ছিলেন কসোভোর রাষ্ট্রপতি। তিনি ২০১১ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। কসোভো একটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ। তিনি কসোভোর প্রথম নারী রাষ্ট্রপতি। তিনি কোনো ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক পরিবারের সদস্য ছিলেন না। রাষ্ট্রপতি হিসেবে তিনি নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করেন এবং সরাসরি কোনো রাজনৈতিক দলের প্রধান ছিলেন না। তিনি রাষ্ট্রীয় প্রধান হিসেবে সর্বোচ্চ ক্ষমতাধর ছিলেন।


হালিমা ইয়াকোব
হালিমা ইয়াকোব ছিলেন সিঙ্গাপুরের রাষ্ট্রপতি। তিনি ২০১৭ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। সিঙ্গাপুর মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ নয়, তবু তিনি সেদেশে মুসলিম নারী রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে দায়িত্বপালন করেন সফরতার সঙ্গে। তিনি সিঙ্গাপুরের প্রথম নারী রাষ্ট্রপতি এবং আগে পার্লামেন্টের স্পিকার ছিলেন। তিনি সামাজিক ঐক্যের প্রতীক ছিলেন এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্ব করেন।



এই দীর্ঘ ইতিহাস একটিই সত্য সামনে আনে—মুসলিম সমাজে নারী নেতৃত্ব কোনো নতুন, অস্বাভাবিক বা পশ্চিমা চাপিয়ে দেওয়া ধারণা নয়। রাযিয়া সুলতানা থেকে শুরু করে শাজার আল-দুর, আরওয়া আল-সুলাইহি কিংবা আচেহের নারী সুলতানরা প্রমাণ করেছেন যে ইসলামি রাষ্ট্রব্যবস্থায় নারী সর্বোচ্চ ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হতে পেরেছেন। তাদের শাসনকালে মুদ্রা জারি হয়েছে, সেনাবাহিনী পরিচালিত হয়েছে এবং রাষ্ট্র পরিচালনার পূর্ণ বৈধতা কার্যকর ছিল। তাঁরা শুধু প্রতীকী নেতা ছিলেন না, ছিলেন ক্ষমতার বাস্তব ভরকেন্দ্র।

ইতিহাস তাই স্পষ্টভাবে দেখায়, মুসলিম বিশ্বে নারী নেতৃত্বের প্রসঙ্গ একক কোনো ব্যাখ্যায় বন্দি নয়; এটি বহুমাত্রিক, পরিবর্তনশীল ও বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত। নারী নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন তাই ধর্মের নয়, প্রশ্নটি আসলে পুরুষতান্ত্রিক সংকীর্ণ মানসিকতা এবং নারীকে ন্যায়সঙ্গত অধিকার থেকে বঞ্চিত রাখতে ক্ষমতার রাজনীতির অপকৌশল মাত্র।


মতামত দিন

মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে

ট্রেন্ডিং ভিউজ