Views Bangladesh Logo

রবীন্দ্রনাথের প্রতিকৃতি বিকৃতির চেষ্টা, প্রতিবাদে শতকণ্ঠে রবীন্দ্রসংগীত

রাজধানীর সেগুনবাগিচায় বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির সামনের দেয়ালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গ্রাফিতিতে চুনকালি দেওয়ার ঘটনার প্রতিবাদে সমবেত কণ্ঠে রবীন্দ্রসংগীত পরিবেশন করেছেন বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠনের কর্মীরা।

শনিবার (১০ অক্টোবর) আয়োজিত এ কর্মসূচি থেকে দেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও অসাম্প্রদায়িক চেতনা রক্ষার আহ্বান জানানো হয়। ‘তাৎক্ষণিক প্রতিবাদী শতকণ্ঠে রবীন্দ্রসংগীত’ শীর্ষক কর্মসূচিতে উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীসহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠনের কর্মীরা অংশ নেন। তাঁরা ‘ও আমার দেশের মাটি’, ‘আজি বাংলাদেশের হৃদয় হতে’ ও ‘সঙ্কোচের বিহ্বলতা’সহ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিভিন্ন গান পরিবেশন করেন। কর্মসূচির শেষ পর্যায়ে সমবেত কণ্ঠে জাতীয় সংগীত ‘আমার সোনার বাংলা’ গাওয়া হয়।

সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর সাধারণ সম্পাদক ও গণতান্ত্রিক সাংস্কৃতিক ঐক্যের সমন্বয়ক জামসেদ আনোয়ার তপন। বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি তামজিদ হায়দার চঞ্চলের সঞ্চালনায় বক্তব্য দেন বিবর্তন সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের সাংগঠনিক সম্পাদক আমিরুন নুজহাত মণীষা, কেন্দ্রীয় খেলাঘর আসরের সাবেক সাধারণ সম্পাদক তাহমিনা সুলতানা সাথী এবং উদীচীর কেন্দ্রীয় কমিটির সহসাধারণ সম্পাদক ইকবালুল হক খানসহ অন্যরা।

বক্তারা বলেন, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে ধর্মীয় পরিচয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ রেখে তাঁর সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক অবদান অস্বীকারের চেষ্টা চলছে। তাঁদের মতে, মুক্তিযুদ্ধ, নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থান ও ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের ধারণা গভীরভাবে যুক্ত। এই চেতনার বিপরীতে দেশকে পরিচালিত করার যেকোনো প্রচেষ্টা প্রতিহত করতে হবে।

বিবর্তন সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের সাংগঠনিক সম্পাদক আমিরুন নুজহাত মণীষা বলেন, রবীন্দ্রনাথকে ‘হিন্দু কবি’ হিসেবে চিহ্নিত করে তাঁর বিরুদ্ধে প্রচার চালানো হচ্ছে। তাঁর ভাষ্য, রবীন্দ্রনাথের ইতিহাস ও সাহিত্য সম্পর্কে না জেনেই এমন বক্তব্য দেওয়া হচ্ছে। জুলাইয়ের আন্দোলনকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহারের চেষ্টাও চলছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। সংস্কৃতির সংগ্রাম ও রাজনৈতিক সংগ্রাম একসঙ্গে চলবে বলেও জানান মণীষা।

কেন্দ্রীয় খেলাঘর আসরের সাবেক সাধারণ সম্পাদক তাহমিনা সুলতানা সাথী বলেন, স্বাধীনতার লক্ষ্য ছিল সাম্য ও অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করা। এমন একটি দেশ গড়ে তোলার কথা ছিল, যেখানে শিশুরা সমান সুযোগ পাবে এবং মানুষের কাজ, খাদ্য ও বাসস্থানের অধিকার নিশ্চিত হবে। এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে বাধা এলে ঐক্যবদ্ধভাবে প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বান জানান তিনি।

উদীচীর কেন্দ্রীয় কমিটির সহসাধারণ সম্পাদক ইকবালুল হক খানও রবীন্দ্রনাথের গ্রাফিতিতে চুনকালি দেওয়ার ঘটনার নিন্দা জানান। তিনি বলেন, বাংলাদেশকে অসাম্প্রদায়িক দেশ হিসেবে গড়ে তোলার সংগ্রাম অব্যাহত রাখতে হবে।

সমাপনী বক্তব্যে জামসেদ আনোয়ার তপন বলেন, রবীন্দ্রনাথের ছবিতে কালি লেপন করে বাঙালির মন ও সংস্কৃতি থেকে তাঁকে মুছে ফেলা সম্ভব নয়। পাকিস্তান আমলেও রবীন্দ্রসংগীত ও রবীন্দ্রচর্চা বন্ধের চেষ্টা হয়েছিল। কিন্তু বাঙালির সাংস্কৃতিক আন্দোলন মুক্তিযুদ্ধের পথ তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। ভবিষ্যতেও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে বাধা দেওয়া হলে প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বান জানান তিনি।

অনুষ্ঠানে রবীন্দ্রসংগীত পরিবেশনায় নেতৃত্ব দেন উদীচীর ঢাকা মহানগর সংসদের সাধারণ সম্পাদক রুমি প্রভা। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের শিকড়ের সঙ্গে যুক্ত বিশিষ্ট ব্যক্তিদের ইতিহাস থেকে মুছে ফেলার চেষ্টা চলছে। তাঁর মতে, এ ধরনের প্রচেষ্টা ব্যর্থ হবে। তবে এমন উদ্যোগের প্রতিবাদ জানাতেই তাঁদের এই আয়োজন।

এদিকে, শনিবার দুপুরে শিল্পকলা একাডেমির সামনের দেয়ালে রবীন্দ্রনাথের গ্রাফিতিতে চুনকালি দেওয়ার চেষ্টার ঘটনায় রাষ্ট্র সংলাপ ফোরামের সদস্যসচিব এ এন এম আয়াসসহ চারজনকে আটক করে পুলিশ। তাঁদের ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা (ডিবি) কার্যালয়ে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। আটক ব্যক্তিদের মধ্যে একজন নারীও রয়েছেন।

ডিএমপির রমনা বিভাগের উপকমিশনার শেখ জাহিদুল ইসলাম বলেন, বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির আশঙ্কায় প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা হিসেবে আয়াসকে আটক করা হয়েছে। ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (গোয়েন্দা) শফিকুল ইসলাম জানান, আটক ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পরবর্তী আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের উদ্যোগে শিল্পকলা একাডেমির পাশের দেয়ালে ১০ জন লেখক, সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বের প্রতিকৃতি আঁকা হয়েছিল। তাঁদের মধ্যে বাংলাদেশের কাজী নজরুল ইসলাম, ফকির লালন শাহ, জয়নুল আবেদিন, এস এম সুলতান, জহির রায়হান, শাহ আবদুল করিম ও হুমায়ূন ফরীদি রয়েছেন।

পাশাপাশি পশ্চিমবঙ্গের রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ও সত্যজিৎ রায়ের প্রতিকৃতিও স্থান পেয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের ব্যক্তিত্বদের অন্তর্ভুক্তি এবং তালিকায় কোনো নারী ব্যক্তিত্ব না থাকাকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পক্ষে-বিপক্ষে আলোচনা চলছে।

মতামত দিন

Avatar

ট্রেন্ডিং ভিউজ