Views Bangladesh Logo

এমআরএ’র নতুন শর্তে হুমকিতে শতশত ক্ষুদ্র এনজিও

Shanto Zabaly

শান্ত জাবালি

বাংলাদেশে ক্ষুদ্রঋণ নিয়ন্ত্রক সংস্থা মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটির (এমআরএ) বিরুদ্ধে পক্ষপাতমূলক আচরণের অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পটপরিবর্তনের পর সংস্থাটির শীর্ষ পদে আইন লঙ্ঘন করে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে এবং নতুন নীতিমালায় এমন শর্ত আরোপ করা হচ্ছে, যা কার্যত ক্ষুদ্র এনজিওগুলোকে বন্ধ করে দিয়ে বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর একাধিপত্য প্রতিষ্ঠার পথ খুলে দেবে। পরবর্তীতে বিভিন্ন স্টেকহোল্ডারদের প্রচেষ্টায় সেই নীতিমালা স্থগিতের সিদ্ধান্ত হলেও এখন পর্যন্ত এব্যাপারে কোন প্রজ্ঞাপন জারি হয় নি।

এমআরএ বাংলাদেশে ক্ষুদ্রঋণ প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও সুশাসন নিশ্চিত করতে গঠিত স্বায়ত্তশাসিত সরকারি নিয়ন্ত্রক সংস্থা। বেসরকারি স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠানের ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম পরিচালনার জন্য এমআরএর লাইসেন্স গ্রহণ বাধ্যতামূলক। বর্তমানে বাংলাদেশের ক্ষুদ্রঋণ খাত বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম, যেখানে ঋণগ্রহীতাদের ৯১ শতাংশই নারী। ফলে এই নিয়ন্ত্রক সংস্থার যেকোন সিদ্ধান্ত বা পদক্ষেপের সঙ্গে এদেশের বেশিরভাগ নারী তথা পরিবারের অর্থনৈতিক অবস্থান ওতোপ্রোতোভাবে সম্পৃক্ত।


সেখানে অভিযোগ উঠেছে, এমআরএ আইনের ১০ ধারায় বর্ণিত যোগ্যতার শর্ত পরিপালন না করেই সংস্থাটির এক্সিকিউটিভ ভাইস চেয়ারম্যান (ইভিসি) পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এরপরই নিয়মবহির্ভূতভাবে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সনদ বাতিল বা ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানের পরিচালনাগত বিষয়ে আইনবহির্ভূত হস্তক্ষেপ বেড়েই চলেছে।

এ ছাড়া গুরুত্বপূর্ণ নথি মাসের পর মাস ঝুলিয়ে রাখার অভিযোগও পাওয়া গেছে। এমআরএর কাছ থেকে প্রয়োজনীয় তথ্য পেতে বিলম্বের কারণে ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলোতে ব্যাংক ঋণের হিস্যা ২২ শতাংশ থেকে নেমে ১৪ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। শুধু ঋণ কার্যক্রম নয়, সামাজিক উন্নয়নমূলক প্রকল্প ও বাজেট অনুমোদনও আটকে আছে।

জানা গেছে, গত ৩১ মার্চ ২০২৬ তারিখে এমআরএ একটি সার্কুলার জারি করেছে। এতে ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য ন্যূনতম ঋণগ্রহীতার সংখ্যা ১ হাজার ২০০ জন এবং ন্যূনতম ঋণস্থিতি ৩ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে, যা আগে ছিল মাত্র ১ কোটি টাকা। বলা হয়েছে, ডিসেম্বর ২০২৬-এর মধ্যে এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে না পারলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাবে।

বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাগুলোর শীর্ষ সমন্বয়কারী সংগঠন অ্যাডাব বলছে, এত অল্প সময়ের মধ্যে এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন অধিকাংশ ক্ষুদ্র এনজিওর পক্ষে সম্ভব নয়। সংগঠনটির আশঙ্কা, নতুন এই শর্তের কারণে দেশের ৩০০ থেকে ৩৫০টি ক্ষুদ্র এনজিওর কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যেতে পারে।

অ্যাডাবের কর্মসূচি পরিচালক কাউসার আলম কনক বলেন, ‘যে প্রতিষ্ঠানগুলোর ১ কোটি টাকার শর্ত পূরণ করতেই এক থেকে দুই বছর লেগেছে, তারা কীভাবে এই অল্প সময়ে ৩ কোটি টাকার শর্ত পূরণ করবে? অনেক প্রতিষ্ঠান এখনো চলমান ব্যাংক ঋণ পরিশোধ করতে পারেনি, তাই নতুন ঋণ পাওয়াও অনিশ্চিত। বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে ব্যক্তি পর্যায় থেকেও তহবিল সংগ্রহ করা সম্ভব নয়।’

তিনি সতর্ক করে দিয়ে বলেন, ‘প্রতিষ্ঠান বন্ধের গুজব ছড়িয়ে পড়লে মাঠ পর্যায়ে অর্থ আদায় অনিশ্চিত হয়ে পড়বে, বড় অঙ্কের আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি হবে এবং খাতসংশ্লিষ্টদের বেকারত্ব বাড়বে।’ সরকারের নীতিমালা নিয়ন্ত্রণমূলক না হয়ে সহায়তামূলক হওয়া উচিত বলেও তিনি মত দেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন এনজিও প্রতিষ্ঠাতা বলেন, ‘এই কঠিন শর্ত বিশেষ গোষ্ঠীকে একচেটিয়া সুবিধা দেওয়ার জন্যই আরোপ করা হয়েছে। বাজারে প্রতিযোগিতা কমলে বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বেচ্ছাচারিতা ও গ্রাহক হয়রানি বাড়বে, ক্ষুদ্রঋণ গ্রহীতাদের অধিকারও ক্ষুণ্ন হবে।’

এব্যাপারে এডাব চেয়ারপারসন আনোয়ার হোসেন জানান, বিভিন্ন স্টেকহোল্ডারদের অনুরোধের প্রেক্ষিতে রেগুলেটরি সংস্থা নতুন এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায় স্থগিত রেখেছে। এ বিষয়ে চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনও নেওয়া হয়নি।

এর বাইরে আরও একটি সিদ্ধান্ত ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিপাকে ফেলেছে। সরকার এনজিওগুলোতে দুজন করে স্বতন্ত্র পরিচালক নিয়োগের বিধান করতে যাচ্ছে। এত দিন নিজেদের পর্ষদের মাধ্যমেই পরিচালিত হয়ে আসা এই প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষেত্রে এ ধরনের বিধান আগে ছিল না। এমআরএ সূত্রে জানা গেছে, স্বতন্ত্র পরিচালক নিয়োগের শর্তসংবলিত আইন ও বিধিমালার খসড়া প্রায় চূড়ান্ত হয়েছে। মূলত এমআরএর ক্ষমতা ও ক্ষুদ্রঋণদাতাদের ওপর নিয়ন্ত্রণ বাড়ানোর প্রস্তাবই রয়েছে খসড়ায়।

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা হোসেন জিল্লুর রহমান এ প্রসঙ্গে গণমাধ্যমকে বলেন, ‘বাস্তব অবস্থা অনুধাবন না করেই এ ধরনের প্রস্তাব তৈরি করা হয়েছে। এর মাধ্যমে ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর সরকারি হস্তক্ষেপ আরও বাড়বে এবং প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাভাবিক কাজের পরিবেশ নষ্ট হয়ে যেতে পারে।’

এসব বিষয়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থার ইভিসির বক্তব্য জানতে তাকে কয়েকবার ফোন করা হলেও কোন কল রিসিভ হয়নি।

২০০৬ সালের মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটি আইন (MRA Act, 2006) অনুযায়ী এমআরএ গঠিত হয়। এমআরএ-এর সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী পর্ষদের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর। এছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন ডেপুটি গভর্নর পর্ষদের সদস্য হিসেবে থাকেন।

এমআরএ-এর পক্ষ থেকে কোন বক্তব্য সংগ্রহ করা সম্ভব না হওয়াতে ভিউজ বাংলাদেশ পরবর্তীতে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসাইন খানের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি বলেন, এমআরএ একটি স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠান। সেখানে যেকোন সিদ্ধান্ত তাদের নীতিমালা অনুযায়ী গ্রহণ করা হয়। এই বিষয়ে বিস্তারিত কোন বক্তব্য তার পক্ষে একমুহূর্তে দেয়া সম্ভব নয় বলে তিনি জানান।

মতামত দিন

Avatar

ট্রেন্ডিং ভিউজ