মিয়ানমারে মানবাধিকার লঙ্ঘনের মাত্রা চরমে: জাতিসংঘ
মিয়ানমারে মানবাধিকার পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে বলে জানিয়েছে জাতিসংঘ। দেশটির সামরিক বাহিনী ও আরাকান আর্মির সহিংসতার পাশাপাশি অবৈধ বিরল মাটি খনিজ উত্তোলনকে ঘিরে গড়ে ওঠা সংঘাতনির্ভর অর্থনীতি সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ আরও বাড়িয়ে তুলছে।
মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) প্রকাশিত জাতিসংঘের নতুন প্রতিবেদনের বরাতে এ তথ্য জানিয়েছে রয়টার্স। জুন ২০২৫ থেকে মে ২০২৬ পর্যন্ত পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত, সামরিক অভিযান এবং আইনশৃঙ্খলার ভাঙনের কারণে দেশটির বেসামরিক জনগোষ্ঠী ক্রমেই ভয়াবহ মানবিক সংকটে পড়ছে। বিশেষ করে রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে গুরুতর ও পদ্ধতিগত মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠেছে সামরিক বাহিনী ও আরাকান আর্মি উভয়ের বিরুদ্ধেই। হত্যা, নির্যাতন, নির্বিচারে আটক, জোরপূর্বক শ্রম, জোর করে নিয়োগ এবং বাস্তুচ্যুত করার মতো ঘটনাও এতে উঠে এসেছে।
জাতিসংঘের হিসাবে, ২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর মিয়ানমারে অন্তত ৮ হাজার ৭৫ জন বেসামরিক মানুষ নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে ১ হাজার ৭৭৪ জন নারী এবং ১ হাজার ৭৪ জন শিশু। প্রকৃত প্রাণহানির সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সময়ে অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা বেড়ে প্রায় ৩৬ লাখে দাঁড়িয়েছে। তীব্র খাদ্যসংকটে রয়েছে প্রায় ১ কোটি ২৪ লাখ মানুষ, আর প্রায় ৪ লাখ মা ও শিশু অপুষ্টিতে ভুগছে।
রোহিঙ্গাদের পরিস্থিতি নিয়েও গভীর উদ্বেগ জানিয়েছে জাতিসংঘ। প্রতিবেদনে উত্তর রাখাইনে আরাকান আর্মির বিরুদ্ধে নির্বিচারে গ্রেপ্তার, নির্যাতন, যৌন সহিংসতা, জোরপূর্বক শ্রম ও জমি দখলের অভিযোগ করা হয়েছে। বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের নিজ এলাকায় ফেরার পথ বাধাগ্রস্ত করে তাদের জমিতে অ-রোহিঙ্গাদের বসতি স্থাপনের অভিযোগও রয়েছে। স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণে প্রায় ২ হাজার একর জমি দখলের তথ্য পাওয়া গেছে।
এদিকে মিয়ানমারের কাচিন ও শান রাজ্যে বিরল মাটি খনিজের অবৈধ উত্তোলন দ্রুত বিস্তৃত হওয়ায় সংঘাত ও মানবিক সংকট আরও জটিল হয়ে উঠছে। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, সামরিক অভ্যুত্থানের পর কাচিনে বিপুলসংখ্যক নতুন খননস্থল তৈরি হয়েছে। এর আগে জাতিসংঘের এক প্রতিবেদনে কাচিনে ৩৭০টির বেশি খননস্থল ও ২ হাজার ৭৯৫টি লিচিং পিট শনাক্ত হওয়ার কথা জানানো হয়েছিল। এসব কার্যক্রম থেকে পাওয়া অর্থ সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর কার্যক্রমে ব্যবহৃত হচ্ছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
বিরল মাটির খনিজ উত্তোলনের ফলে পরিবেশগত ক্ষতিও গুরুতর হয়ে উঠেছে। খনি থেকে নির্গত বিষাক্ত বর্জ্য পানি কৃষিজমি ও স্থানীয় পানির উৎস দূষিত করছে। এর প্রভাব সীমান্ত পেরিয়ে থাইল্যান্ড পর্যন্ত পৌঁছেছে বলে জাতিসংঘের বিভিন্ন পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে। মানবাধিকার পরিস্থিতির অবনতির পাশাপাশি প্রাকৃতিক সম্পদকে কেন্দ্র করে সংঘাতের অর্থনীতির বিস্তার মিয়ানমারের সংকটকে আরও দীর্ঘস্থায়ী করছে বলে মনে করছে জাতিসংঘ।
মতামত দিন