Views Bangladesh Logo

বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচারের মান নিয়ে হিউম্যান রাইটস ওয়াচের প্রশ্ন

 VB  Desk

ভিবি ডেস্ক

বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে (আইসিটি) মামলা পরিচালনার ধরন নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ)। সংস্থাটি বলেছে, আন্তর্জাতিক আইনি মানদণ্ড রক্ষায় কর্তৃপক্ষের ব্যর্থতা ভুক্তভোগীদের ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত করতে পারে, আইনের শাসনকে দুর্বল করতে পারে, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে অন্যায়ভাবে কারাবন্দি করতে পারে এবং অতীতের মানবাধিকার লঙ্ঘনেরই পুনরাবৃত্তি ঘটাতে পারে।

লন্ডন থেকে প্রকাশিত ওই বিবৃতিতে বলা হয়েছে, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার শাসনামলে সংঘটিত গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের জন্য দায়ীদের অবশ্যই জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। তবে সংস্থাটির মতে, অনেক বিচারপ্রক্রিয়াই আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী ন্যায্য বিচারের শর্ত পূরণ করছে না।

এইচআরডব্লিউর এশিয়া বিভাগের উপপরিচালক মীনাক্ষী গাঙ্গুলি বলেন, বাংলাদেশের ফৌজদারি বিচারব্যবস্থার জরুরি সংস্কার প্রয়োজন। দুর্বল তদন্ত ও ভিত্তিহীন অভিযোগের মাধ্যমে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কোনো সুযোগ যেন না থাকে, নতুন সরকারকে তা নিশ্চিত করতে হবে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

ট্রাইব্যুনালে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে আন্দোলনে নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযানের ঘটনাগুলোর বিচার চলছে। ওই সময় ৮০০ জনের বেশি নিহত এবং হাজারো মানুষ গুরুতর আহত হন। পাশাপাশি হাসিনার শাসনামলে সংঘটিত কথিত বিচারবহির্ভূত হত্যা ও গুমের ঘটনাও ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন।

এইচআরডব্লিউ জানায়, ট্রাইব্যুনালের এক ডজনের বেশি মামলা পর্যবেক্ষণ করে বিচারপ্রক্রিয়ায় গুরুতর উদ্বেগের বিষয় পাওয়া গেছে। সংস্থাটির ভাষ্য, একাধিক মামলায় সাক্ষীদের জবানবন্দিতে অভিযোগসংক্রান্ত অংশ কেটে বসিয়ে দেওয়া হয়েছে বলে মনে হয়।

সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, হাসিনা সরকারের পতনের পর ট্রাইব্যুনাল ছয়টি মামলার বিচার শেষ করেছে। এতে মানবতাবিরোধী অপরাধে ৬২ জন দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে শেখ হাসিনাসহ ৪২ জনের বিচার হয়েছে অনুপস্থিতিতে এবং ১৬ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। গত ২৭ জুলাই প্রসিকিউশন মানবতাবিরোধী অপরাধ ও গণহত্যার অভিযোগে ৪১ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র জমা দিয়েছে; অভিযুক্তদের মধ্যে রাজনীতিক, নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য ও দুই সাংবাদিক রয়েছেন।

এইচআরডব্লিউ বলছে, ২০২৪ সালের পটপরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তী সরকার ট্রাইব্যুনাল আইন সংশোধন করে অপরাধের সংজ্ঞা আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করলেও সেই সংশোধনী সমজাতীয় আন্তর্জাতিক আদালতের সমান আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করতে পারেনি। সংস্থাটির ভাষ্য, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকার এ বিষয়ে নতুন কোনো সংশোধনী আনেনি।

বিদ্যমান আইন অনুযায়ী প্রমাণের কোনো নির্দিষ্ট মানদণ্ড পূরণ ছাড়াই প্রসিকিউটররা গ্রেপ্তারের নির্দেশ দিতে পারেন, লিখিত কারণ ছাড়াই আটক ব্যক্তিদের মাসের পর মাস হেফাজতে রাখা যায় এবং বিচার শুরুর আগে পৃথক আদালতে আপিলের সুযোগ নেই বলে বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া প্রসিকিউশন সাক্ষ্য-প্রমাণ প্রকাশের তিন সপ্তাহের মধ্যেই বিচার শুরু হতে পারে, যা আত্মপক্ষ সমর্থনের প্রস্তুতির জন্য যথেষ্ট নয়। অনুপস্থিতিতে বিচারের ক্ষেত্রে আসামির নিজের পছন্দমতো আইনজীবী নিয়োগের অধিকারসহ প্রয়োজনীয় সুরক্ষা নেই এবং জেরার ক্ষেত্রে আসামিপক্ষের আইনজীবীদের ওপর বিধিনিষেধ রয়েছে বলেও সংস্থাটি জানায়।

বিবৃতিতে বলা হয়, ২০১৩ সালের মে মাসে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশ নিয়ে সংবাদ প্রকাশের ঘটনায় গত ১৪ মে দুই সাংবাদিকের গ্রেপ্তারের নির্দেশ দেয় ট্রাইব্যুনাল। তাঁরা হলেন একাত্তর টিভির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোজাম্মেল বাবু ও উপস্থাপক ফারজানা রূপা। প্রসিকিউশনের অভিযোগ, ‘মিথ্যা তথ্য’ উপস্থাপন করে তাঁরা ওই সমাবেশে নিহতদের ঘটনা ধামাচাপা দিতে তৎকালীন সরকারকে সহায়তা করেছিলেন। এইচআরডব্লিউর ভাষ্য, দুই সাংবাদিকের আইনজীবীরা জানিয়েছেন, গ্রেপ্তারের লিখিত কারণ প্রসিকিউশন তাঁদের দেয়নি, যা আন্তর্জাতিক নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার সনদের ১৪ অনুচ্ছেদ এবং দেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইনের লঙ্ঘন।

২৭ জুলাই দাখিল করা অভিযোগপত্রে ওই দুই সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের পাশাপাশি গণহত্যার অভিযোগ যুক্ত করার বিষয়েও প্রশ্ন তুলেছে সংস্থাটি। এইচআরডব্লিউ মনে করিয়ে দেয়, আন্তর্জাতিক আইনে গণহত্যা প্রমাণের জন্য কোনো জাতীয়, জাতিগত, বর্ণগত বা ধর্মীয় গোষ্ঠীকে সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে ধ্বংস করার সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্যের প্রমাণ থাকতে হয়।

জবানবন্দির অভিন্নতা নিয়ে উদাহরণ হিসেবে চট্টগ্রামের একটি মামলার কথা উল্লেখ করেছে সংস্থাটি। ২০২৪ সালের ১৬ ও ১৮ জুলাই এবং ৪ আগস্ট চট্টগ্রাম নগরে হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় আওয়ামী লীগের ২২ জন রাজনীতিক ও কর্মীর বিরুদ্ধে তিনটি অভিযোগ গঠন করা হয়েছে। প্রসিকিউশনের প্রমাণের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে প্রকাশিত ৫৫টি সাক্ষ্যবিবরণী পর্যালোচনা করে এইচআরডব্লিউ জানায়, ছয় লাইনের একটি অনুচ্ছেদ প্রায় হুবহু ১৪টি পৃথক জবানবন্দিতে পাওয়া গেছে, যেখানে সাতজন রাজনীতিকের বিরুদ্ধে ‘পরিকল্পনা, অর্থায়ন, উসকানি ও নির্দেশনা’র মাধ্যমে ছয়জনকে হত্যার অভিযোগ করা হয়েছে। আরেকটি দীর্ঘ অনুচ্ছেদ প্রায় অবিকল আকারে আরও নয়টি জবানবন্দিতে পাওয়া গেছে।

একই মামলায় হেফাজতে থাকা আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ রাজনীতিক এ বি এম ফজলে করিম চৌধুরীর আইনজীবীরা সাংবাদিকদের কাছে কিছু রেকর্ডিং সরবরাহ করেন, যেখানে ট্রাইব্যুনালের এক প্রসিকিউটর ১ কোটি টাকার বিনিময়ে জামিন করিয়ে দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিলেন বলে দাবি করা হয়। রেকর্ডিং প্রকাশের পর ওই প্রসিকিউটর পদত্যাগ করেন, তবে প্রধান প্রসিকিউটরের দপ্তর এখনো তদন্ত শেষ করেনি। এর মধ্যেই বিচারকেরা অভিযোগ গঠন করেছেন এবং আগামী ৬ আগস্ট মামলাটির বিচার শুরু হওয়ার কথা রয়েছে।

মীনাক্ষী গাঙ্গুলি বলেন, আওয়ামী লীগ যখন রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে বিরোধীদের হয়রানি করত, সেই অতীতের পুনরাবৃত্তি যে ঘটানো যাবে না, বাংলাদেশের কর্তৃপক্ষকে তা উপলব্ধি করতে হবে। তাঁর ভাষ্য, নকল করা জবানবন্দির ভিত্তিতে আনা অভিযোগ একটি বিশ্বাসযোগ্য বিচারপ্রক্রিয়ার অনুপস্থিতিই তুলে ধরে, যা আবারও ভুক্তভোগী, তাঁদের পরিবার এবং সব বাংলাদেশিকে হতাশ করবে।

মতামত দিন

Avatar

ট্রেন্ডিং ভিউজ