বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তুলবেন কীভাবে
একসময় বই ছিল মানুষের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ বন্ধু। অবসরে গল্পের বই, জ্ঞানের খোঁজে প্রবন্ধ, কিংবা কল্পনার জগতে হারিয়ে যাওয়ার জন্য উপন্যাস—সবকিছুতেই বই ছিল জীবনের অংশ। কিন্তু প্রযুক্তিনির্ভর এই সময়ে মোবাইল ফোন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ভিডিও কনটেন্টের ভিড়ে বই পড়ার অভ্যাস ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছে। অথচ বই শুধু বিনোদনের মাধ্যম নয়; এটি মানুষের চিন্তা, কল্পনা, বিশ্লেষণ ক্ষমতা ও ব্যক্তিত্ব গঠনের অন্যতম শক্তিশালী হাতিয়ার।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নিয়মিত বই পড়া মানুষের মানসিক বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এটি ভাষাজ্ঞান বাড়ায়, মনোযোগ বৃদ্ধি করে এবং সৃজনশীলতা বিকশিত করে। তবে প্রশ্ন হলো—কীভাবে নতুন প্রজন্মের মধ্যে আবার বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তোলা যায়?
অনেকেই মনে করেন, একদিনেই বইপোকা হয়ে ওঠা সম্ভব। বাস্তবে তা নয়। বই পড়ার অভ্যাস গড়ে ওঠে ধীরে ধীরে। শুরুতে ছোটগল্প, ভ্রমণকাহিনি কিংবা নিজের পছন্দের বিষয় নিয়ে লেখা বই পড়া যেতে পারে। কেউ যদি ইতিহাস ভালোবাসেন, তাহলে ইতিহাসভিত্তিক বই দিয়ে শুরু করাই ভালো। আবার যারা রহস্য পছন্দ করেন, তারা গোয়েন্দা গল্প দিয়ে অভ্যাস শুরু করতে পারেন।
মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, শুরুতেই বড় উপন্যাস হাতে নিলে অনেক সময় আগ্রহ কমে যায়। তাই প্রতিদিন ১০ থেকে ১৫ মিনিট পড়ার অভ্যাস তৈরি করাই সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতি।
যেকোনো অভ্যাস গড়ে তুলতে নিয়মিত হওয়া সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। বই পড়ার ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম নয়। প্রতিদিন নির্দিষ্ট একটি সময় বই পড়ার জন্য বরাদ্দ রাখা যেতে পারে। কেউ সকালে ঘুম থেকে উঠে পড়তে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন, কেউ আবার রাতে ঘুমানোর আগে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ঘুমানোর আগে বই পড়া মানসিক চাপ কমাতে সাহায্য করে এবং ভালো ঘুমের জন্যও উপকারী। দিনে মাত্র আধাঘণ্টা সময় দিলেও মাস শেষে একটি বড় বই শেষ করা সম্ভব।
বর্তমান সময়ে বই পড়ার সবচেয়ে বড় বাধা মোবাইল ফোন। একটি নোটিফিকেশন মনোযোগ ভেঙে দেয়, আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঢুকলে সময় কোথায় চলে যায়, তা বোঝাই যায় না।
তাই বই পড়ার সময় মোবাইল ফোন সাইলেন্ট রাখা বা দূরে রাখার পরামর্শ দেন বিশেষজ্ঞরা। অনেকেই ‘ডিজিটাল ডিটক্স’ পদ্ধতি অনুসরণ করেন—দিনের নির্দিষ্ট সময় ইন্টারনেট বন্ধ রেখে শুধু বই পড়েন। এতে মনোযোগ বাড়ে এবং পড়ার প্রতি আগ্রহও তৈরি হয়।
বই পড়ার জন্য আরামদায়ক পরিবেশ খুব গুরুত্বপূর্ণ। ঘরের একটি ছোট কোণে বুকশেলফ, নরম আলো আর নিরিবিলি পরিবেশ একজন পাঠককে বইয়ের প্রতি আকৃষ্ট করতে পারে।
অনেক পরিবারে এখন ‘রিডিং কর্নার’ তৈরি করার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। যেখানে পরিবারের সবাই নির্দিষ্ট সময়ে বই পড়েন। এতে শিশুদের মধ্যেও বই পড়ার আগ্রহ তৈরি হয়।
আমাদের সমাজে অনেক সময় বই মানেই শুধু পাঠ্যবই। ফলে ছোটবেলা থেকেই বইকে আনন্দ নয়, বরং চাপ হিসেবে দেখা হয়। এই ধারণা বদলানো জরুরি।
শিশুদের গল্পের বই, কমিকস, বিজ্ঞানভিত্তিক মজার বই কিংবা ছবি সম্বলিত বই উপহার দিলে তারা সহজেই বইয়ের প্রতি আগ্রহী হয়ে ওঠে। অভিভাবকদের উচিত শিশুদের সামনে নিজেরাও বই পড়া। কারণ শিশুরা অনুকরণ করেই বেশি শেখে।
একলা বই পড়ার পাশাপাশি বন্ধুদের সঙ্গে বই নিয়ে আলোচনা করাও বই পড়ার আগ্রহ বাড়ায়। বর্তমানে বিভিন্ন স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠচক্র গড়ে উঠছে। সেখানে নির্দিষ্ট বই পড়ে আলোচনা করা হয়।
এ ধরনের আয়োজন পাঠকদের নতুন বই সম্পর্কে জানতে সাহায্য করে এবং মতবিনিময়ের সুযোগ তৈরি করে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও এখন অনেক বইপ্রেমী গ্রুপ রয়েছে, যেখানে বই রিভিউ ও সুপারিশ শেয়ার করা হয়।
একসময় পাবলিক লাইব্রেরি ছিল জ্ঞানচর্চার অন্যতম কেন্দ্র। এখনো দেশের বিভিন্ন এলাকায় সরকারি ও বেসরকারি পাঠাগার রয়েছে। কিন্তু অনেকেই সেখানে যান না।
লাইব্রেরিতে গেলে একই সঙ্গে বহু ধরনের বই সম্পর্কে জানা যায়। নতুন লেখক, নতুন বিষয় এবং বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে পরিচিত হওয়া সম্ভব হয়। শিক্ষাবিদদের মতে, লাইব্রেরির পরিবেশ একজন মানুষের মধ্যে পড়াশোনার মানসিকতা তৈরি করে।
প্রযুক্তি সবসময় বই পড়ার শত্রু নয়। বর্তমানে ই-বুক, অডিওবুক ও অনলাইন লাইব্রেরির কারণে বই পড়া আরও সহজ হয়েছে। যারা ব্যস্ততার কারণে বই হাতে নিয়ে পড়তে পারেন না, তারা যাতায়াতের সময় অডিওবুক শুনতে পারেন।
অনেক তরুণ এখন মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে বই পড়ছেন। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডিজিটাল মাধ্যম ব্যবহার করলেও মনোযোগ ধরে রাখা জরুরি।
ইতিহাসের অনেক সফল ব্যক্তি বই পড়ার অভ্যাসকে জীবনের অন্যতম শক্তি হিসেবে উল্লেখ করেছেন। বই মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দেয়, নতুন চিন্তা শেখায় এবং আত্মবিশ্বাস বাড়ায়।
একটি ভালো বই কখনো কখনো একজন মানুষের জীবন বদলে দিতে পারে। তাই বই পড়াকে শুধু শখ হিসেবে নয়, বরং আত্মউন্নয়নের একটি মাধ্যম হিসেবে দেখা উচিত।
সবশেষে বলতে হয়, বই পড়ার অভ্যাস রাতারাতি তৈরি হয় না। এটি ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে নিয়মিত চর্চা, আগ্রহ ও অনুপ্রেরণার মাধ্যমে। বর্তমান ব্যস্ত ও প্রযুক্তিনির্ভর জীবনে বই হয়তো আগের মতো মানুষের একমাত্র সঙ্গী নয়, কিন্তু জ্ঞান, কল্পনা ও মানসিক বিকাশের ক্ষেত্রে এর বিকল্পও নেই।
তাই প্রতিদিন একটু সময় বইয়ের জন্য রাখাই হতে পারে জীবনের সবচেয়ে সুন্দর বিনিয়োগ। কারণ একটি ভালো বই শুধু তথ্য দেয় না, মানুষকে নতুনভাবে ভাবতে শেখায়, স্বপ্ন দেখতে শেখায় এবং আলোকিত মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে সাহায্য করে।

মতামত দিন
মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে