বিবাহবিচ্ছেদের সঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কতটা দায় আছে!
বিশ্ব এখন এক অভূতপূর্ব পরিবর্তনের মুখোমুখি। প্রযুক্তি, নগরায়ণ, জলবায়ু পরিবর্তন, অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং সামাজিক-সাংস্কৃতিক রূপান্তরের ফলে মানুষের জীবনযাত্রা আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে দ্রুত বদলে যাচ্ছে। এর প্রভাব পড়ছে আমাদের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ সামাজিক প্রতিষ্ঠান- পরিবার ও বিবাহের ওপর। একদিকে ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার দেশগুলোতে জন্মহার হ্রাস পাচ্ছে, বিবাহ বন্ধনের সংখ্যা কমে যাচ্ছে। অন্যদিকে দক্ষিণ এশিয়ার মতো সমাজে পারিবারিক বন্ধনের কাঠামো এখনো টিকে আছে, তবে দ্রুত ভেঙেও পড়ছে।
সুইডেনসহ স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশগুলোতে বিবাহ আর আগের মতো বাধ্যতামূলক সামাজিক প্রতিষ্ঠান নয়। ভালোবাসা থাকলেই সম্পর্ক টিকে থাকে; না থাকলে আলাদা হওয়ার পথ উন্মুক্ত। আইনি কাঠামো, অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা এবং সামাজিক স্বীকৃতি- সবই এই সিদ্ধান্তকে সহজ করে তুলেছে। এর ফলাফল হলো- বিবাহহীন সহবাস বৃদ্ধি, জন্মহার হ্রাস এবং পারিবারিক কাঠামোর শিথিলতা। তবে ইতিবাচক দিকও আছে- ব্যক্তির স্বাধীনতা, আত্মসম্মান রক্ষা এবং জোরপূর্বক সম্পর্ক বজায় রাখার বাধ্যবাধকতা থেকে মুক্তি।
বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে পারিবারিক বন্ধন, সামাজিক সম্পর্ক ও ধর্মীয় মূল্যবোধকে কেন্দ্র করে বিবাহকে অপরিহার্য প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখেছে। তবে সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান ইঙ্গিত দিচ্ছে- এই কাঠামো দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। সে ক্ষেত্রে ঢাকা সিটি কর্পোরেশনে প্রতি ঘণ্টায় প্রায় একটি করে বিবাহবিচ্ছেদের মামলা হচ্ছে। নারীদের উদ্যোগে বিচ্ছেদের হার পুরুষদের তুলনায় দ্বিগুণ। গত ৭ বছরে দেশে বিবাহবিচ্ছেদের আবেদন প্রায় ৩৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
এটি স্পষ্ট করে যে আধুনিক অর্থনীতি, নারীর কর্মসংস্থান, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাব, পারিবারিক সহিংসতা এবং মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা- সব মিলিয়ে বাংলাদেশেও পরিবার ভাঙনের হার বেড়ে চলেছে।
কেন বিশ্বজুড়ে এই সংকট?
১. অর্থনৈতিক চাপ: বিশ্বব্যাপী জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ছে। চাকরির অনিশ্চয়তা, বৈষম্য ও মুদ্রাস্ফীতি সম্পর্কের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
২. আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থা: সামাজিক মাধ্যম নতুন সম্পর্ক তৈরি করছে, আবার ভুল বোঝাবুঝি ও অবিশ্বাসের জন্ম দিচ্ছে।
৩. মানসিক স্বাস্থ্য সংকট: উদ্বেগ, বিষণ্নতা ও স্ট্রেস এখন বৈশ্বিক সমস্যা। পরিবারে বোঝাপড়ার অভাব ও মানসিক চাপ ভাঙনের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
৪. মূল্যবোধের পরিবর্তন: পশ্চিমে ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা বৃদ্ধি পেয়েছে, পূর্বে ধীরে হলেও একই ধারা এগোচ্ছে। ফলে পারিবারিক কর্তৃত্বের জায়গায় ব্যক্তির স্বাধীনতা গুরুত্ব পাচ্ছে।
৫. শৈশব অভিজ্ঞতার প্রভাব: ভাঙা পরিবারে বেড়ে ওঠা প্রজন্ম পরবর্তী সময়ে স্থায়ী সম্পর্ক তৈরি করতে সংকটে পড়ে।
বর্তমান বিশ্বের রাজনৈতিক সংকট, যুদ্ধ এবং অর্থনৈতিক বৈষম্য সম্পর্ক ও জন্মহারের ওপর গভীর প্রভাব ফেলছে। সিরিয়া, ইউক্রেন, গাজা কিংবা আফ্রিকার অনেক অঞ্চলের মতো যুদ্ধবিধ্বস্ত এলাকায় শিশু মৃত্যুর হার বাড়ছে পুষ্টিহীনতা, রোগ ও সহিংসতার কারণে। পাশ্চাত্যের তরুণ প্রজন্ম এ দৃশ্য দেখে আতঙ্কিত- কীভাবে তারা জেনেশুনে নতুন জীবন পৃথিবীতে আনবে, যখন ভবিষ্যৎ প্রতিটি মুহূর্ত অনিশ্চয়তায় ভরা?
রাজনীতি যখন দুর্নীতি ও যুদ্ধের রণক্ষেত্রে পরিণত হয় তখন মানুষের মধ্যে জন্ম ও পরিবার গঠনের আগ্রহ কমে যায়। এই দোটানা পশ্চিমা বিশ্বের নতুন প্রজন্মের মধ্যে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। আমার বিশ্বাস, এর প্রভাব শুধু ইউরোপ বা আমেরিকা নয়, খুব শিগগিরই এশিয়া, আফ্রিকা এবং দক্ষিণ আমেরিকার সমাজেও পড়বে। কারণ এআই প্রযুক্তির ব্যবহারে তথ্য প্রবাহ এখন এত দ্রুত যে বিশ্বব্যাপী এই ভয়ের অনুভূতি সমানভাবে ছড়িয়ে পড়ছে।
আজ আমরা প্রবেশ করেছি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে যা শুধু অর্থনীতি বা শিল্পেই নয়, সম্পর্কের জগতেও প্রভাব ফেলছে।
- ডিজিটাল বিচ্ছিন্নতা: দম্পতিরা সময় কাটাচ্ছেন মোবাইল স্ক্রিনে, পরস্পরের সঙ্গে নয়।
- ভার্চুয়াল সম্পর্ক: এআই-চ্যাটবট, ভার্চুয়াল সঙ্গী ও অনলাইন কমিউনিটি অনেককে বাস্তব সম্পর্ক থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে।
- কর্মক্ষেত্রের পরিবর্তন: এআই কাজের ধরন বদলে দিচ্ছে, যার ফলে অনেকে চাকরিহীন বা অনিশ্চিত ভবিষ্যতের ভয়ে মানসিক চাপের শিকার হচ্ছেন।
- সাংস্কৃতিক প্রভাব: প্রযুক্তির সঙ্গে বেড়ে ওঠা নতুন প্রজন্মের কাছে সম্পর্ক মানে দ্রুত গড়ে ওঠা ও দ্রুত ভেঙে যাওয়া।
সামনে কী করা উচিত?
১. মানসিক স্বাস্থ্য সচেতনতা: বিশ্বব্যাপী বিবাহ ও সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে কাউন্সেলিং ও থেরাপিকে সহজলভ্য করতে হবে।
২. অর্থনৈতিক নিরাপত্তা: বেকারত্ব ও আয় বৈষম্য কমানো গেলে পরিবার ভাঙনের হার হ্রাস পেতে পারে।
৩. পারিবারিক শিক্ষা: স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে সম্পর্ক ব্যবস্থাপনা, সহমর্মিতা ও যোগাযোগ দক্ষতা শেখানো দরকার।
৪. প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার: এআই ও সামাজিক মাধ্যমকে সম্পর্কের সহায়ক হিসেবে ব্যবহার করা- যেমন অনলাইন কাউন্সেলিং, পরিবারকেন্দ্রিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম।
৫. সামাজিক সংহতি: পরিবার ও সমাজকে একত্রে এনে সমর্থনমূলক পরিবেশ তৈরি করা।
বিবাহবিচ্ছেদ বা পরিবার ভাঙন কেবল বাংলাদেশের সমস্যা নয়; এটি একটি বৈশ্বিক বাস্তবতা। পশ্চিমে এটি ব্যক্তির স্বাধীনতার প্রকাশ, আর দক্ষিণ এশিয়ায় এটি সামাজিক সংকটের প্রতিচ্ছবি। তবে দুই ক্ষেত্রেই মূল কারণ প্রায় একই- অর্থনৈতিক চাপ, মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা, যোগাযোগের অভাব এবং পরিবর্তিত সামাজিক মূল্যবোধ।
এআই-প্রযুক্তির যুগ আমাদের সামনে নতুন সুযোগও এনেছে- যদি আমরা এটিকে মানবিক সম্পর্কের সহায়ক শক্তি হিসেবে ব্যবহার করতে পারি। অন্যথায় এটি আমাদের আরও বিচ্ছিন্ন করে তুলবে।
অতএব, এখন সময় এসেছে পারিবারিক মূল্যবোধ, ব্যক্তিস্বাধীনতা ও প্রযুক্তিগত অগ্রগতিকে ভারসাম্যপূর্ণভাবে একত্রে আনার, যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম একটি স্থিতিশীল, সুখী ও মানবিক সমাজে বেড়ে উঠতে পারে।
রহমান মৃধা: গবেষক ও সাবেক পরিচালক, ফাইজার, সুইডেন।
মতামত দিন
মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে