Views Bangladesh Logo

শরণার্থী শিবির থেকে বিশ্বকাপের তারকা

অভিবাসীদের গল্পেই বদলে যাচ্ছে অস্ট্রেলিয়ার আধুনিক সকারুজ

২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের আগে মিডফিল্ডার জ্যাকসন আরভাইনের বলা এই কথাগুলো যেন উত্তর আমেরিকায় অস্ট্রেলিয়ার অনুপ্রেরণাদায়ক অভিযানের প্রতীক হয়ে উঠেছে। শুক্রবার বিশ্বকাপের শেষ ৩২-এর গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে মিশরের মুখোমুখি হওয়ার আগে দলটি আত্মবিশ্বাসে উজ্জীবিত। কারণ, তাদের বর্তমান স্কোয়াডের অনেক খেলোয়াড়ই যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চল থেকে শরণার্থী বা অভিবাসী পরিবার হিসেবে অস্ট্রেলিয়ায় এসে আজ জাতীয় দলের প্রতিনিধিত্ব করছেন। ফলে দলটি এখন বহুসাংস্কৃতিক অস্ট্রেলিয়ার এক উজ্জ্বল প্রতীক।

তুরস্ক ম্যাচেই মিলল সেই গল্পের প্রতিচ্ছবি
তুরস্কের বিপক্ষে গ্রুপ পর্বে ২-০ গোলের জয়ে এই গল্পের সবচেয়ে সুন্দর প্রতিফলন দেখা যায়। ম্যাচে প্রথম গোলটি করেন ২০ বছর বয়সী তরুণ তারকা নেস্টরি ইরানকুন্ডা। গোল করার পর তিনি শৈশবের নায়ক টিম কাহিলের বিখ্যাত কর্নার-ফ্ল্যাগে ঘুষি মারার উদযাপন অনুকরণ করেন। কিছুক্ষণ পরই গোল করেন তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও সতীর্থ মোহাম্মদ তুরে। দুই বন্ধুর এই সাফল্য ছিল এক আবেগঘন মুহূর্ত, কারণ দুজনের জীবনযাত্রার গল্পই প্রায় একই রকম।

গৃহযুদ্ধ থেকে পালিয়ে নতুন জীবনের সন্ধান
নেস্টরি ইরানকুন্ডা ও মোহাম্মদ তুরে—দুজনই জন্মেছেন আফ্রিকার শরণার্থী শিবিরে। গৃহযুদ্ধ থেকে পালিয়ে আসা পরিবারের সন্তান তারা। ইরানকুন্ডার জন্ম ২০০৬ সালে তানজানিয়ার একটি শরণার্থী শিবিরে। প্রতিবেশী দেশ বুরুন্ডির সংঘাত থেকে পালিয়ে সেখানে আশ্রয় নিয়েছিলেন তার বাবা-মা। মাত্র তিন মাস বয়সে পরিবারসহ অস্ট্রেলিয়ায় পাড়ি জমান তিনি। তুরস্কের বিপক্ষে গোল করে সাবেক অ্যাডিলেড ইউনাইটেড তারকা, বর্তমানে জার্মান ক্লাব বায়ার্ন মিউনিখের খেলোয়াড় (ধারে ওয়াটফোর্ডে খেলছেন) ইরানকুন্ডা বিশ্বকাপে অস্ট্রেলিয়ার ইতিহাসে সর্বকনিষ্ঠ গোলদাতার রেকর্ড গড়েন।

মোহাম্মদ তুরের গল্পও প্রায় একই। লাইবেরিয়ার গৃহযুদ্ধ থেকে পালিয়ে তার পরিবার আশ্রয় নিয়েছিল গিনির রাজধানী কোনাক্রিতে। সেখানেই তার জন্ম। পরে ২০০৪ সালে শিশু অবস্থায় পরিবারের সঙ্গে অস্ট্রেলিয়ায় চলে আসেন তিনি। বর্তমানে ইংলিশ ক্লাব নরউইচ সিটির হয়ে খেলা ২২ বছর বয়সী এই ফরোয়ার্ডের কাছে অস্ট্রেলিয়ার জার্সি কেবল একটি ফুটবল জার্সি নয়, বরং তার পরিবারের পাওয়া স্বাধীনতা ও নতুন জীবনের প্রতীক।

সংগ্রাম পেরিয়ে গড়া একটি দল
২৬ সদস্যের অস্ট্রেলিয়া দলে এমন আরও অনেক ফুটবলার রয়েছেন, যারা জীবনের কঠিন বাস্তবতা পেরিয়ে বিশ্বকাপের মঞ্চে পৌঁছেছেন।

উইঙ্গার আওয়ার মাবিলের বাবা-মা দক্ষিণ সুদানের সংঘাত থেকে পালিয়ে কেনিয়ার একটি শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় নিয়েছিলেন। সেখানে জীবনের প্রথম ১০ বছর কাটান মাবিল। বর্তমানে স্পেনের ক্লাব কাস্তেয়নের হয়ে খেলা ৩০ বছর বয়সী এই ফুটবলার এখন তরুণদের পরামর্শদাতার ভূমিকাও পালন করছেন। পাশাপাশি তিনি ‘বেয়ারফুট টু বুটস’ নামে একটি দাতব্য সংস্থার সহ-প্রতিষ্ঠাতা, যা শরণার্থী শিশুদের জুতা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবায় সহায়তা করে।

ডিফেন্ডার মিলোস ডেগেনেকের জীবনও কম সংগ্রামের নয়। ১৯৯৪ সালে ক্রোয়েশিয়ার নিন শহরে জন্ম তার। মাত্র ১৮ মাস বয়সে ক্রোয়েশিয়ার স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় পরিবারকে ট্রাক্টরে করে পালিয়ে সার্বিয়ার বেলগ্রেডে আশ্রয় নিতে হয়। সেই যুদ্ধে তারা সবকিছু হারিয়েছিলেন। পরে সার্বিয়ায় বোমা হামলার ভয়াবহ সময় পার করে ছয় বছর বয়সে পরিবারসহ সিডনিতে চলে আসেন ডেগেনেক।

আধুনিক অস্ট্রেলিয়ার প্রতিচ্ছবি
অস্ট্রেলিয়া দলের বৈচিত্র্য শুধু শরণার্থী পরিবারের খেলোয়াড়দের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। সমসাময়িক অস্ট্রেলিয়ার বহুজাতিক সমাজের প্রতিচ্ছবি ফুটে উঠেছে পুরো স্কোয়াডজুড়ে।

অভিজ্ঞ ফুলব্যাক আজিজ বেহিচের জন্ম মেলবোর্নে। তার বাবা-মা রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে সাইপ্রাস থেকে পালিয়ে এসেছিলেন। আরেক মেলবোর্নে জন্ম নেওয়া ফুটবলার নিশান ভেলুপিল্লাইয়ের বাবা মালয়েশিয়ান, যার শিকড় শ্রীলঙ্কার তামিল সম্প্রদায়ে; আর মা অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান।

এছাড়া ফরোয়ার্ড টেটে ইয়েঙ্গির বাবা শরণার্থীদের পুনর্বাসনে মানবিক অবদানের জন্য ‘মেডেল অব দ্য অর্ডার অব অস্ট্রেলিয়া’ সম্মাননা পেয়েছেন। ডিফেন্ডার জেসন গেরিয়া আবার উগান্ডা থেকে আসা অভিবাসী পরিবারের সন্তান। ভিন্ন ভিন্ন সংস্কৃতি ও জীবনের গল্প মিলিয়েই তৈরি হয়েছে বর্তমান অস্ট্রেলিয়া দল, যা দেশটির ফুটবলপ্রেমীদের গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করছে।

টেক্সাসে ইতিহাস গড়ার হাতছানি
গ্রুপ ‘ডি’-তে রানার্সআপ হয়ে নকআউট পর্বে উঠেছে অস্ট্রেলিয়া। তিন ম্যাচে চার পয়েন্ট সংগ্রহ করেছে তারা। তুরস্ককে ২-০ গোলে হারানোর পাশাপাশি স্বাগতিক যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ২-০ গোলে হেরেছে এবং প্যারাগুয়ের সঙ্গে গোলশূন্য ড্র করেছে।

এবার টেক্সাসের আর্লিংটনের এটিঅ্যান্ডটি স্টেডিয়ামে শেষ ৩২-এর ম্যাচে মিশরের মুখোমুখি হবে গ্রাহাম আর্নল্ডের দল। এই ম্যাচ জিততে পারলে বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে প্রথমবারের মতো জয়ের ইতিহাস গড়বে অস্ট্রেলিয়া।

তবে ফল যাই হোক না কেন, বর্তমান সকারুজ ইতোমধ্যেই বিশ্বকে একটি শক্তিশালী বার্তা দিয়েছে—আধুনিক অস্ট্রেলিয়ার পরিচয় নির্ধারিত হয় না একজন মানুষের জন্ম কোথায়, বরং সে কোথায় পৌঁছাতে চায়, সেটিই আসল পরিচয়।

মতামত দিন

Avatar

ট্রেন্ডিং ভিউজ