টেলিযোগোযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি খাত
প্রস্তাবিত বাজেট নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টিতে কতটা ইতিবাচক?
বাংলাদেশে বিনিয়োগের প্যাটার্ন প্রতিবেশী দেশগুলো যেমন ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলংকার তুলনায় কিছুটা ভিন্ন। সেসব দেশে প্রথম প্রজন্মের ব্যবসায়ীদের মধ্যে অনেকের নিজেদের জমানো টাকা থেকে নতুন করে বিনিয়োগ করার সক্ষমতা আছে। তাদের ব্যাংক ঋণের উপর নির্ভর না করলেও চলে। কিন্তু বাংলাদেশে স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে যারা বড় ব্যবসায়ী হয়েছেন তাদের মধ্যে বলতে গেলে কেউই এখন পর্যন্ত সম্পূর্ণ নিজের জমানো টাকা থেকে নতুন করে বিনিয়োগের কথা চিন্তা করেন না। কারও কারও সক্ষমতা থাকলেও জটিল কর কাঠামোর কথা চিন্তা করে একটা বড় অংশ ব্যাংক ঋণ নিয়ে নতুন বিনিয়োগ শুরু করেন। আর যখনই ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে ব্যবসা শুরু হয়, তখনই সেই ঋণের সুদও নতুন ব্যাবসার পরিচালন ব্যয় বা অপারেটিং কস্টের একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে যায়।
বাংলাদেশের জন্য আরও একটা বড় সুযোগ সরাসরি বিদেশী বিনিয়োগ। আঙ্কটাডের তথ্য অনুযায়ী ২০১৯ সাল পর্যন্ত সরাসরি বিদেশী বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল প্রায় ১ হাজার ৮০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। তবে সেটা এখন কমে ১ হাজার ৭০০ মিলিয়নের কাছাকাছি। ২০২৪ সালের শেষে সবচেয়ে কম ছিল, ১ হাজার ২৭০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারে নেমে এসেছিল। এর পেছনে বড় একটা কারণ ছিল বিদেশী বিনিয়োগকারীদের স্থানীয় ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়ার সুযোগ করে দেওয়ার সরকারি সিদ্ধান্ত। তখন বিদেশী কোন প্রতিষ্ঠান ১০০ টাকা বিনিয়োগ করলে এর বিপরীতে ৫০ টাকা পর্যন্ত ঋণ নিতে পারত। বিগত অন্তবর্তী সরকারের সময়ে এটা ৬০:৪০ করা হয়। অর্থাৎ ১০০ টাকা বিনিয়োগ করলে স্থানীয় ব্যাংক থেকে ৬০ টাকা পর্যন্ত ঋণ নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়। এখনও সেই সুযোগ বহাল আছে।
স্থানীয় ব্যাংক থেকে বিদেশী কোম্পানির ঋণ নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হলে সরাসারি বিদেশী বিনিয়োগ স্বাভাবিকভাবেই কমে যায়। একই সঙ্গে দেশীয় বিনিয়োগকারীদের ঋণ নেওয়ার সুযোগও সংকুচিত হয়। কারণ ব্যাংকগুলো ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে অনেক বেশী নিশ্চিত থাকে বিদেশী কোম্পানির ক্ষেত্রে। যেমন টেলিযোগাযোগ খাতের বিদেশী কোম্পানিগুলো স্থানীয় ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়ার সুযোগ পাওয়ার কারণে এ খাতে বিদেশী বিনিয়োগ কমতে থাকে। বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, টেলিযোগাযোগ খাতে ২০০৬ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত মোট এফডিআই এসেছিল ২১৭ কোটি ৬৫ লাখ ডলার। কিন্তু বিপুল পরিমাণ বিনিয়োগ তুলে নেওয়ায় ২০২৩ সাল শেষে এ খাতে পুঞ্জীভূত এফডিআইয়ের পরিমাণ কমে দাঁড়ায় মাত্র ১৩২ কোটি ৬৪ লাখ ডলারে। অর্থাৎ মাত্র এক বছরে টেলিকম খাত থেকে প্রায় ৮৫ কোটি ডলার বিদেশী বিনিয়োগ বেরিয়ে যায়, যা মোট পুঞ্জীভূত বিনিয়োগের প্রায় ৩৯ শতাংশ।
২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত মোট এফডিআই স্টকের মধ্যে টেলিযোগাযোগ খাতের অংশ ছিল মাত্র ৭.২ শতাংশ। অথচ এটি একসময় দেশের সর্বোচ্চ এফডিআই আকর্ষণকারী খাত ছিল। ফলে 'ডিজিটাল সার্বভৌমত্ব' নীতির আলোকে টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতে যখন স্থানীয় সক্ষমতা তৈরিকে বিশ্বের প্রায় সব দেশ গুরুত্ব দিচ্ছে তখন আমাদের স্থানীয় বিনিয়োগেকারীদের বিনিয়োগের সুযোগ আগের চেয়ে সংকুচিত হয়েছে।
আবার জাতীয় বাজেটে প্রতি বছরই ব্যাংক খাত থেকে সরকারের ঋণ নেওয়ার একটা অংশ থাকে। যেমন ২০২৪-২৫ অর্থ বছরে ব্যাংক খাত থেকে ঋণের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৯৯ হাজার কোটি টাকা। ২০২৫-২৬ অর্থ বছরে এই লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা। এবার ২০২৬-২৭ অর্থ বছরের প্রস্তাবিত বাজেটে লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা। আবার জাতীয় বাজেটে যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়, বাস্তবে তার চেয়ে বেশী ঋণ নেয় সরকার। যেমন ২০২৫-২৬ অর্থ বছরে এই লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা। এ পরিমাণ লক্ষ্যমাত্রা ধরা হলেও বাস্তবে নেওয়া হয় ১ লাখ ২২ হাজার কোটি টাকা ঋণ।
সরকার যখন অনেক বেশী ঋণ ব্যাংকখাত থেকে নেয়, তখন স্বাভাবিকভাবেই স্থানীয় বিনিয়োগকারীদের ঋণ পাওয়ার সুযোগ কমে যায়। স্থানীয় উদ্যোক্তা তৈরি ও বিনিয়োগও কমে যায়। ব্যাংকগুলো সরকারকে ঋণ দিলে সুদসহ সময়মত ফেরত পাওয়ার নিশ্চয়তা পায়, ফলে স্থানীয় উদ্যোক্তাদের ঋণ দিতে উৎসাহিত হয় না। এই আলোকেই ২০২৬-২৭ অর্থ বছরের প্রস্তাবিত বাজেটকে সরাসারি স্থানীয় 'নতুন বিনিয়োগ বান্ধব' বলা মুশকিল। যদিও কিছু ক্ষেত্রে কর কমানোর ফলে বিদ্যমান ব্যবসায়ীরা উপকৃত হবেন। এটা অবশ্যই ইতিবাচক দিক।
বিশ বছর পর বিএনপি সরকারের প্রথম বাজেট। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম বাজেট। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর পেশ করা প্রথম বাজেট। অতএব কিছু ক্ষেত্রে করহার কমানোর ফলে সরকারের জনপ্রিয়তার সূচকে উন্নতি হয়েছে, সন্দেহ নেই।
টেলিযোগাযোগ খাতের জন্য সবচেয়ে বড় চমক ছিল মোবাইল সিম কার্ডের ওপর বিদ্যমান ৩০০ টাকা কর সম্পূর্ণ প্রত্যাহারের প্রস্তাব। এর মধ্য দিয়ে প্রায় দুই দশক ধরে চলা এক নীতি-বিতর্কের অবসান ঘটল। অর্থমন্ত্রী বাজেট বক্তৃতায় জানান, বর্তমানে দেশের টেলিকম খাতে করের হার প্রায় ৫০ শতাংশ এবং তথ্যপ্রযুক্তি খাতে প্রায় ২৫ শতাংশ, যা বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় অনেক বেশি; খাতের দ্রুত বিকাশ ও মোবাইল সেবা সহজলভ্য করতে করহার ক্রমান্বয়ে যৌক্তিক পর্যায়ে নামিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
অবশ্য অর্থমন্ত্রীর বক্তব্যের বিপরীতে গ্রাহকের রিচার্জের ওপর ১৫ শতাংশ ভ্যাট, ১৫ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক ও ১ শতাংশ সারচার্জের যে ভার, সেটা থেকেই গেছে। অর্থাৎ সিম কার্ড হাতে পাওয়া সস্তা হলো, কথা বলা ও ডেটা ব্যবহার আগের মতোই ভারী। বিশেষ বর্তমান বাস্তবতায় ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সম্প্রসারণের জন্য কোন সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা বা নীতি প্রস্তাবিত বাজেটে প্রতিফলিত হয়নি। স্থানীয়ভাবে যারা ক্লাউড, ডাটা সেন্টার নির্মাণ করছেন, যারা বেসরকারি সাবমেরিন কেবলে বিনিয়োগ করতে চান, তাদের জন্য নতুন কোন আশার আলো নেই প্রস্তাবিত বাজেটে।
তবে মোবাইল নেটওয়ার্ক সেবা খাতে উৎসে কর কর্তনের হার ১২ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশ করার প্রস্তাব এসেছে, যা অপারেটরদের পরিচালন ব্যয় কিছুটা কমাবে এবং ভবিষ্যতে গ্রাহক পর্যায়ে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। উৎসে কর প্রকৃত মুনাফা নয়, এটা টার্নওভারের ভিত্তিতে নির্ধারিত হয়। এ কারণে লোকসান হলেও দিতে হয়। এ কারণে দুই শতাংশ কর কমানোর প্রস্তাব করভার কিছুটা কমাবে।
তরুণ উদ্যোক্তা তৈরির জন্য তথ্যপ্রযুক্তি খাতে ৫০০ কোটি টাকার স্টার্টআপ তহবিলের প্রস্তাব খুবই কম। ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেটে স্টার্টআপের জন্য মাত্র ৫০০ কোটি টাকার প্রস্তাব, এক অর্থে হতাশার। এটা অন্তত ৫ হাজার কোটি টাকা হওয়া উচিত ছিল। কারণ তথ্যপ্রযুক্তি খাতে নতুন উদ্ভাবন, উদ্যোক্তা তৈরির মাধ্যমেই বিশ্ব বাজারে বাংলাদেশের অবস্থানের মাত্রা নির্ধারিত হবে। নিঃসন্দেহে বাংলাদেশ প্রতিবেশী ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলংকার তুলনায় তথ্যপ্রযুক্তির বাজারে অনেকখানি পিছিয়ে আছে। নেপালও আমাদের ছাড়িয়ে গেছে। এ অবস্থায় আমাদের জন্য ‘স্টার্টআপ’ খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি খাত। তবে খেয়াল রাখতে হবে, নিকট অতীতে স্টার্টআপ তহবিল ঘিরে যে স্টান্টবাজি হয়েছে সেটা যেন না হয়। একটা ই-কমার্স খুলে ঋণ নিয়ে সেখানে সামান্য ব্যয় করে পুরো টাকা অন্য কোথাও সরিয়ে ফেলার যে খেলা আমরা দেখেছি, তার যেন পুনরাবৃত্তি না হয়। স্টার্টআপের নামে খোলা স্টান্টবাজির কোন ই-কমার্সই মূলত শেষ পর্যন্ত টিকে থাকেনি। এমনকি ফেসবুকে ‘এফ-কমার্স’ এর নামে শত শত প্লাটফর্ম খুলে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র আকারে বৃহৎ তহবিল গায়েব করার উদাহরণও আমরা দেখেছি। অন্যদিকে যারা সত্যিকারের উদ্ভাবন নিয়ে এসেছেন, তারা তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগের নীতি নির্ধারকদের কাছে পাত্তাই পাননি। আওয়ামী লীগ আমলে ডিজিটাল বাংলাদেশ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে যে সাফল্য আসার কথা ছিল, এই ‘স্টার্টআপ স্টানটবাজি’র কারণেই তা আসেনি। আশঙ্কার বিষয় হচ্ছে, সরকার বদলায়, প্রশাসনে কর্তা-ব্যক্তি বদল হয়, কিন্তু স্টান্টবাজরা নতুন চেহারায় ফিরে আসে। স্টার্টআপ তহবিলের ক্ষেত্রে তাই সতর্ক থাকা খুবই জরুরি।
স্থানীয়ভাবে তৈরি মোবাইল ফোনের উৎপাদন ব্যয় কমাতে একাধিক কর ছাড়ের প্রস্তাব দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী, সেটা ইতিবাচক। প্রাক-বাজেট আলোচনায় অর্থমন্ত্রী ইঙ্গিত দিয়েছিলেন মোবাইল ফোন, কম্পিউটার, ইলেকট্রনিকস ও ডিজিটাল যন্ত্রাংশ উৎপাদনের ক্ষেত্রে বিদ্যমান সুবিধা ২০৩০ সাল পর্যন্ত বাড়ানোর। দেশীয় হ্যান্ডসেট শিল্প যখন গ্রে-মার্কেটের চাপ আর চাহিদা-মন্দায় ধুঁকছে, তখন নীতি-ধারাবাহিকতার এই বার্তা এই খাতে দেশী-বিদেশী বিনিয়োগ ধরে রাখতে সহায়ক হবে। তবে সরকারকে এনইআইআর বাস্তবায়নে আরও বাস্তবমুখী হতে হবে। বিটিআরসি এর আগে এনইআইআর বাস্তবায়নে আন্তর্জাতিক স্বীকৃত পদ্ধতি অনুসরণ করেনি। ফলে বড় ধরনের সংকটের সৃষ্টি হয়। আন্তর্জাতিকভাবে সফল ও স্বীকৃত পদ্ধতি চোখের সামনেই আছে, সে অনুযায়ী এনইআইআর কাঠামো গড়ে তোলা কঠিন কিছু নয়।
সার্বিকভাবে টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতের জন্য বাজেট নতুন অভিমুখের একটি সূচনা বলা যেতে পারে। এই সূচনা সম্ভবনার পথকে আরও বিস্তৃত করুক, এটাই প্রত্যাশা।
রাশেদ মেহেদী, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি খাত বিশ্লেষক, সম্পাদক, ভিউজ বাংলাদেশ

মতামত দিন