Views Bangladesh Logo

চীনের চংকিং শহর ঘুরে এসে

চংকিংয়ের হংইয়ান: পাহাড়ের গায়ে লেখা এক জাতির ঘুরে দাঁড়ানোর ইতিহাস

Rased Mehedi

রাশেদ মেহেদী

চীনের দক্ষিণ-পশ্চিমের পাহাড়ি শহর চংকিং। ইয়াংসি আর চিয়ালিং নদী এখানে এসে মিলেছে। কুয়াশায় ঢাকা এই শহরের আকাশছোঁয়া দালান, পাহাড় কেটে বানানো উড়ালসড়ক আর ভবনের ভেতর দিয়ে চলে যাওয়া মেট্রোরেল দেখে প্রথমে মনে হয়, এ শহরের পুরোটাই বুঝি ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে আছে। কিন্তু চিয়ালিং নদীর তীরে ইউঝং জেলার ছোট্ট একটি গ্রাম, হংইয়ান, মনে করিয়ে দেয় যে এই ঝলমলে বর্তমানের ভিত গড়া হয়েছিল আগুন, রক্ত আর অসীম ধৈর্যের এক অতীতের ওপর। হংইয়ান মানে ‘লাল পাথর’। এখানেই আছে চংকিং হংইয়ান বিপ্লবী স্মৃতি জাদুঘর। চৌ এন লাই আর মাও সে তুংয়ের জীবনের সবচেয়ে কঠিন দিনগুলোর নীরব সাক্ষী এই জাদুঘর।


ছবি: চংকিং হংইয়ান বিপ্লবী স্মৃতি জাদু্ঘরের সামনে

এক নারী শিল্পোদ্যোক্তার খামার থেকে বিপ্লবের ঘাঁটি

জায়গাটার শুরুর গল্পটা বেশ চমকপ্রদ। হংইয়ান আসলে ছিল রাও গুওমো নামে চংকিংয়ের এক নারী শিল্পোদ্যোক্তার খামার। জাপানি আগ্রাসনের সেই অন্ধকার সময়ে চীনের কমিউনিস্ট পার্টির একটি দপ্তর দরকার ছিল। রাও গুওমো তখন নিজের খামারটি চৌ এন লাইয়ের হাতে তুলে দেন। এক নারী উদ্যোক্তার এই একটি সিদ্ধান্তই চংকিংয়ের এক নিরিবিলি খামারকে আধুনিক চীনের ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঠিকানায় পরিণত করে।


ছবি: জাপানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের সময় চৌ এন লাই এর সেই গোপন বাড়ি


জাপানি আক্রমণে নানচিং পড়ে যাওয়ার পর চংকিং হয় চীনের যুদ্ধকালীন রাজধানী। শহরটি ছিল চিয়াং কাই-শেকের কুওমিনতাং সরকারের নিয়ন্ত্রণে। দীর্ঘ গৃহযুদ্ধের তিক্ততা পেছনে রেখে জাপানের বিরুদ্ধে জাতীয় যুক্তফ্রন্ট গড়েছিল কমিউনিস্টরা ও কুওমিনতাং। সেই যুক্তফ্রন্টের সূত্রেই ১৯৩৯ সালে হংইয়ানে কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির ‘দক্ষিণাঞ্চলীয় ব্যুরো’ গঠিত হয়। এর সম্পাদক ছিলেন চৌ এন লাই। একই জায়গায় ছিল অষ্টম রুট বাহিনীর চংকিং দপ্তর। তুং পিউ, ইয়ে চিয়েনইং, তেং ইংছাওয়ের মতো নেতারাও একে একে এখানে আসেন।

সহজ ভাষায় বললে, প্রতিপক্ষের রাজধানীর ভেতরে বসে, প্রতিদিন গোয়েন্দা নজরদারির মধ্যে, জাপানি বোমার ভয় মাথায় নিয়ে চৌ এন লাই এখান থেকে কূটনীতি, প্রচার আর সাংগঠনিক কাজ চালিয়েছেন। বিদেশি সাংবাদিক, কূটনীতিক, লেখক আর ব্যবসায়ীদের সঙ্গে নিরন্তর যোগাযোগ রেখে বিশ্বের সামনে তুলে ধরেছেন জাপানবিরোধী লড়াইয়ে চীনের জনগণের অবস্থান। তাঁর সেই ধৈর্যশীল, মার্জিত অথচ দৃঢ় কূটনৈতিক শৈলীর জন্ম অনেকটাই এই লাল পাথরের গ্রামে।

ঝৌ গংগুয়ান: পঞ্চাশ নম্বর বাড়ির গোপন সিঁড়ি

জাদুঘরের অন্যতম আকর্ষণ চেংচিয়াইয়ানের ৫০ নম্বর বাড়ি। স্থানীয়রা একে বলেন ‘ঝৌ গংগুয়ান’, মানে চৌ সাহেবের বাড়ি। শহরের ভেতরে এটিই ছিল চৌ এন লাইয়ের আবাস ও কর্মস্থল। বাড়িটির নকশা দেখার মতো। প্রতিটি তলায় ওঠার সিঁড়ি লুকানো আছে একেকটি কক্ষের ভেতরে, বাইরে থেকে খুঁজে পাওয়া কঠিন। নজরদারি আর অনুপ্রবেশের ঝুঁকির মধ্যে টিকে থাকার সেই কৌশল আজও দর্শনার্থীদের অবাক করে। ঘরগুলোর সাধারণ আসবাব, পুরোনো টেবিল-চেয়ার আর ম্লান আলোয় একটা কথাই স্পষ্ট হয়: বড় ইতিহাস প্রায়ই খুব ছোট ঘরে বসে লেখা হয়।


ছবি: জাপানের আগ্রাসন বন্ধ হওয়ার পর ঐতিহাসিক মুহূর্ত


হংইয়ানে কমিউনিস্ট পার্টির মুখপত্র সিনহুয়া দৈনিকের পুরোনো কার্যালয়ও আছে। চীনের এক প্রবীণ সাংবাদিকের হাতে গড়া সংবাদপত্রের ছাপাখানা দেখে আমার মতো একজন সংবাদকর্মীর মনে প্রশ্ন জাগে: সেন্সরশিপ, কাগজের সংকট আর বোমাবর্ষণের মধ্যে কীভাবে প্রতিদিন একটি পত্রিকা বের হতো? যুদ্ধের সময় সংবাদপত্র শুধু খবরের বাহক থাকে না, প্রতিরোধেরও হাতিয়ার হয়ে ওঠে। হংইয়ানের ছাপাখানা সেই সত্যের সাক্ষী।

৪৩ দিনের চংকিং আলোচনা ও কুইয়ুয়ান

১৯৪৫ সালের আগস্টে জাপান আত্মসমর্পণ করে। চিয়াং কাই-শেকের আমন্ত্রণে ২৮ আগস্ট মাও সে তুং ইয়েনান থেকে বিশেষ বিমানে চংকিং আসেন। সঙ্গে ছিলেন চৌ এন লাই। মাও আর চিয়াংয়ের মধ্যে প্রায় ২০ বছর পর এই প্রথম সাক্ষাৎ। শুরু হয় ইতিহাসখ্যাত ‘চংকিং আলোচনা’। চল্লিশ দিনেরও বেশি সময় মাও হংইয়ানে থেকেছেন। আলোচনার ফাঁকে তিনি সমাজের নানা স্তরের শতাধিক মানুষের সঙ্গে দেখা করেছেন: সরকারি কর্মকর্তা, শিল্পপতি, বুদ্ধিজীবী, শিক্ষার্থী।

শহরের ভেতরে মাওয়ের কাজ ও অতিথি আপ্যায়নের জায়গা ছিল কুইয়ুয়ান, অর্থাৎ ‘ওসমানথাস বাগান’। উঠানে দুটি পুরোনো ওসমানথাস গাছ আছে। শরতে ফুল ফুটলে পুরো আঙিনা সুবাসে ভরে যায়, সেখান থেকেই এই নাম। ১৯৪৫ সালের ১০ অক্টোবর এখানেই সই হয় ‘ডাবল টেন চুক্তি’। এতে কুওমিনতাং ও কমিউনিস্ট পার্টি শান্তিপূর্ণ জাতীয় পুনর্গঠনের অঙ্গীকার করে।

ইতিহাসের নির্মম পরিহাস হলো, সেই চুক্তি টেকেনি। কয়েক মাসের মধ্যেই চীন আবার পূর্ণমাত্রার গৃহযুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। তবু চংকিং আলোচনার রাজনৈতিক তাৎপর্য অস্বীকার করা যায় না। শান্তির পক্ষে কে আন্তরিক, সেই প্রশ্নে জনমত গড়তে এই আলোচনা বড় ভূমিকা রেখেছিল। চার বছর পর ১৯৪৯ সালে গণপ্রজাতন্ত্রী চীনের প্রতিষ্ঠার পটভূমি তৈরিতেও এর গুরুত্ব কম ছিল না।


ছবি: চংকিং হংইয়ান বিপ্লবী স্মৃতি জাদুঘরের ভেতরের অংশ


‘বরফ’ কবিতার পাণ্ডুলিপি

জাদুঘরের সবচেয়ে আবেগময় প্রদর্শনীগুলোর একটি মাও সে তুংয়ের বিখ্যাত কবিতা ‘ছিনইউয়ানছুন: বরফ’-এর পাণ্ডুলিপি। চংকিং আলোচনার সময় মাও কবিতাটি বন্ধু কবি লিউ ইয়াজিকে উপহার দিয়েছিলেন। একজন রাষ্ট্রনায়ক যখন যুদ্ধ আর দরকষাকষির চরম উত্তেজনার মধ্যেও কবিতা লেখেন, তখন বোঝা যায় রাজনীতি আর সাহিত্য একে অন্যের প্রতিপক্ষ নয়। বরং বড় স্বপ্নের মানুষদের ভেতরে দুটোই একসঙ্গে বাস করে। মাওয়ের ব্যবহৃত পানির পাত্র আর তামার চামচের মতো সাধারণ জিনিসও এখানে যত্নে রাখা আছে।

হো চি মিনের কক্ষ: এক এশীয় সংযোগ

অনেকেই জানেন না, হংইয়ানের সঙ্গে ভিয়েতনামেরও গভীর যোগ আছে। ১৯৩৯-৪০ সালের দিকে হো চি মিন ‘হো কুয়াং’ ছদ্মনামে এখানে একটি কক্ষে থেকে বিপ্লবী কাজ করেছেন। সেই কক্ষটিও সংরক্ষিত আছে। ২০২৪ সালের নভেম্বরে ভিয়েতনামের প্রধানমন্ত্রী ফাম মিন চিন এই স্থান পরিদর্শন করেন। অর্থাৎ হংইয়ান শুধু চীনের নয়, ঔপনিবেশিকতা ও আগ্রাসনবিরোধী এশীয় সংগ্রামের এক যৌথ স্মৃতিস্তম্ভও।

জাদুঘর থেকে ‘হংইয়ান চেতনা’

হংইয়ান বিপ্লবী স্মৃতি জাদুঘর প্রথম খোলে ১৯৫৮ সালের ১ মে। জাদুঘরের নামফলকটি ১৯৫৯ সালে লিখে দেন তুং পিউ। ২০০০ সালে নতুন জাদুঘর ভবনের উদ্বোধন হয়। ২০০৭ সালের ১৯ জানুয়ারি গঠিত হয় চংকিং হংইয়ান বিপ্লবী ইতিহাস জাদুঘর। এর অধীনে আছে তিনটি অংশ: হংইয়ান স্মৃতি জাদুঘর, গ্যলে পাহাড় বিপ্লবী স্মৃতি জাদুঘর এবং চীনের গণতান্ত্রিক দলগুলোর ইতিহাস প্রদর্শনী কেন্দ্র। গ্যলে পাহাড়ের পাইকংগুয়ান ও ঝাজিতং কারাগার মনে করিয়ে দেয় সেইসব রাজনৈতিক বন্দির কথা, যাঁরা মুক্তির ভোরের ঠিক আগে প্রাণ দিয়েছিলেন।

চীনে আজ ‘হংইয়ান চেতনা’ কথাটা খুব পরিচিত। নিষ্ঠার সঙ্গে অধ্যবসায়, সততার সঙ্গে পরিশ্রম, প্রতিকূলতার মধ্যেও আদর্শে অটল থাকা—এই হলো এর মূল কথা। চীনের রাষ্ট্রীয় বয়ানে এই চেতনাকেই দেশটির পরবর্তী উন্নয়নযাত্রার অন্যতম নৈতিক ভিত্তি হিসেবে তুলে ধরা হয়। জাদুঘর থেকে বেরিয়ে চংকিংয়ের আকাশরেখার দিকে তাকালে সেই যোগসূত্রটা চোখে পড়ে। যে শহর একসময় জাপানি বোমায় বারবার পুড়েছে, সে আজ চীনের অন্যতম বৃহৎ শিল্প ও প্রযুক্তি কেন্দ্র।

আমাদের জন্য শিক্ষা

বাংলাদেশের জন্যও হংইয়ানের গল্পে ভাবার মতো অনেক কিছু আছে। একটি জাতি কীভাবে বিদেশি আগ্রাসনের মুখে অভ্যন্তরীণ বিরোধ সাময়িকভাবে সরিয়ে রেখে ঐক্য গড়ে, কীভাবে প্রতিকূল পরিবেশে ধৈর্যশীল কূটনীতি দিয়ে বিশ্বজনমত নিজের পক্ষে আনে, আর কীভাবে নিজের সংগ্রামের স্মৃতি যত্নে ধরে রেখে পরের প্রজন্মের হাতে তুলে দেয়, তার জীবন্ত পাঠ হংইয়ান। আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের অসংখ্য স্মৃতিচিহ্ন আজও অবহেলায় হারিয়ে যাচ্ছে। চংকিংয়ের এই লাল পাথরের গ্রাম মনে করিয়ে দেয়, ইতিহাস সংরক্ষণ কোনো বিলাসিতা নয়। এটা একটি জাতির আত্মপরিচয়ের চর্চা।

চিয়ালিং নদীর ওপর সন্ধ্যা নামে। হংইয়ানের ওসমানথাস গাছের পাতায় বাতাস লাগে। প্রায় আট দশক আগে এই উঠানেই এক জাতির ভবিষ্যৎ নিয়ে দরকষাকষি হয়েছিল। ইতিহাস এখানে শুধু কাচের বাক্সে রাখা কোনো প্রদর্শনী নয়। প্রতিটি সিঁড়ি, প্রতিটি টেবিল আর প্রতিটি হলদে হয়ে যাওয়া পাণ্ডুলিপিতে সেই ইতিহাস এখনো নিঃশ্বাস নিচ্ছে।

রাশেদ মেহেদী
সম্পাদক, ভিউজ বাংলাদেশ

মতামত দিন

Avatar

ট্রেন্ডিং ভিউজ