মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়: একজন রাজপথের লড়াকুর উত্থান-পতন যেভাবে
পশ্চিমবঙ্গে রাজনীতি মানেই চিরকাল রাজপথের রাজনীতি— বিশাল মিছিল, সহিংস আন্দোলন আর বন্ধের দিনে ফাঁকা রাস্তা। এই রাজনীতিই স্বাধীনতার পর থেকে রাজ্যের ভাগ্য নির্ধারণ করেছে। কংগ্রেস থেকে বামফ্রন্ট, তারপর বামফ্রন্ট থেকে তৃণমূল কংগ্রেস— প্রতিটি পরিবর্তনেই রাজপথ ছিল মূল মঞ্চ। আর এই রাজপথের রাজনীতিতেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজেকে প্রমাণ করেছিলেন একজন সত্যিকারের লড়াকু নেত্রী হিসেবে— সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়ে একের পর এক প্রতিপক্ষকে হারিয়েছেন।
কিন্তু এবার পশ্চিমবঙ্গ বেছে নিল বিজেপিকে। দশকের পর দশক পর এই প্রথম, একই দল দিল্লি ও কলকাতা— দুই জায়গায় একসঙ্গে ক্ষমতায় আসতে চলেছে। মমতার ১৫ বছরের সরকারকে এভাবে প্রত্যাখ্যান করার পেছনে মূল কারণ হলো তীব্র ক্ষমতাবিরোধী মনোভাব, ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ এবং হিন্দু ভোটের একজোট হয়ে যাওয়া।
শেষ লড়াইয়ে মমতা
‘আমি সব আসনের প্রার্থী’— এই ঘোষণা ছিল মমতার নির্বাচনী রাজনীতির চিরচেনা বৈশিষ্ট্য। ২০২৬ সালেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। ৭১ বছর বয়সে তিনি মাত্র দুই মাসে ৯০টি জনসভা করেছেন এবং ২২টি রোডশো করেছেন— এটি একটি রেকর্ড। বিজেপির হেভিওয়েট নেতারা তো বটেই, তৃণমূলের তরুণ নেতারাও এই সংখ্যার ধারেকাছে আসতে পারেননি।
তবুও সোমবার সন্ধ্যা নাগাদ ‘দিদি’ কার্যত পরাজিত। নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, সন্ধ্যা ছটার মধ্যে বিজেপি ২৯৪টি আসনের মধ্যে ৪৪টিতে জিতেছে এবং ১৬০টিতে এগিয়ে আছে; তৃণমূল জিতেছে ২১টিতে এবং এগিয়ে আছে ৬২টিতে। বাংলা হয়ে উঠেছে গেরুয়া রঙে।
মমতার ভবানীপুর কেন্দ্রের ভোট গণনার সময় তার ভাগ্নে এবং দলের দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় যখন সখাওয়াত মেমোরিয়াল গার্লস স্কুলে ঢোকেন, তখন বিজেপি সমর্থকরা ‘চোর, চোর’ বলে চিৎকার করে ওঠেন।
তৃণমূলের সামনে কী কী চ্যালেঞ্জ ছিল
সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে উঠে আসা এবং ১৯৮৪ সালে যুব কংগ্রেস নেত্রী হিসেবে প্রথম লোকসভা নির্বাচনেই জাদবপুরে বামপন্থার দিকপাল সোমনাথ চ্যাটার্জিকে হারানো মমতার জন্যও ২০২৬ সালের নির্বাচন ছিল এক অভূতপূর্ব চ্যালেঞ্জ।
সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় পুনর্বিন্যাস (এসআইআর)। গত অক্টোবরে এই প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার সময় পশ্চিম বাংলায় প্রায় ৭ কোটি ৬৬ লক্ষ ভোটার ছিলেন। পুনর্বিন্যাসের ফলে প্রায় ৯১ লাখ নাম বাদ পড়েছে— এর মধ্যে প্রায় ৬৩ লাখ মৃত ও অনুপস্থিত ভোটার এবং আরো ২৭ লাখের কাগজপত্রে গরমিল পাওয়া গেছে। মমতা অভিযোগ করেছেন, ‘বিজেপি নির্বাচন কমিশনকে দিয়ে তাদের সমর্থকদের নাম মুছিয়ে দিয়েছে।’
মমতার উত্থান ও পতনের গল্প
মমতার বামফ্রন্টবিরোধী প্রথম বড় আন্দোলন শুরু হয়েছিল ২০০০ সালে— কংগ্রেস ছেড়ে তৃণমূল গঠনের দুই বছর পর। পশ্চিম মেদিনীপুরের কেশপুর ও গড়বেতায় সিপিএম কর্মীদের বিরুদ্ধে অত্যাচারের অভিযোগ তুলে আন্দোলন শুরু করেন তিনি। তখন তার মিত্র অটলবিহারী বাজপেয়ী সরকারের কাছে ৩৫৬ ধারা জারির দাবি জানিয়ে তিনি স্লোগান দেন— ‘কেশপুর হবে সিপিএমের শেষপুর।’
তবে সেটা তখন হয়নি। এরপর একের পর এক আন্দোলন এবং ধর্মঘটের পর নন্দীগ্রাম ও সিঙ্গুরে জমি অধিগ্রহণবিরোধী আন্দোলন বামফ্রন্ট সরকারের বিরুদ্ধে জমে থাকা ক্ষোভকে তীব্র করে তোলে। ৩৪ বছরের বামফ্রন্ট শাসনের শেষ পর্বে মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের শিল্পবান্ধব ভাবমূর্তি তৈরির চেষ্টাও সেই জোয়ার থামাতে পারেনি।
সোমবার পশ্চিম বাংলা ২০১১ সালের পুনরাবৃত্তি দেখল।
রাজনীতি বিজ্ঞানের অধ্যাপক উদয়ন বন্দ্যোপাধ্যায় বললেন, ‘২০১১ সালে বামেরা যেমন ক্ষমতাবিরোধী মনোভাবের শিকার হয়েছিল, তেমনি এবার ব্যাপক বেকারত্ব ও শিল্পের অভাবজনিত অসন্তোষও মমতার বিপক্ষে কাজ করেছে।’
তৃণমূলের অনেক নেতাই নাম না জানানোর শর্তে স্বীকার করলেন যে, প্রথম মেয়াদে মমতার বিরোধীশূন্য রাজ্য গড়ার চেষ্টাই শেষ পর্যন্ত তার পতনের কারণ হয়ে দাঁড়াল।
২০১১ সালে কংগ্রেসের সাথে জোট করে ক্ষমতায় আসার এক বছরের মধ্যেই সম্পর্কে ফাটল ধরে। কংগ্রেস অভিযোগ করে, তৃণমূল তাদের বিধায়কদের দলে টানছে। জোট ভেঙে যায়।
এরপর কংগ্রেস ও বাম যত কাছে আসতে থাকে, ততই বাংলায় শূন্য থেকে বিজেপির বিস্তার শুরু হয়। এখান থেকেই মেরুকরণের রাজনীতির সূচনা।
দুর্নীতির বোঝা
২০১২ সালে রাজ্যের সব মসজিদের ইমামদের মাসিক ২,৫০০ টাকা এবং মুয়াজ্জিনদের ১,৫০০ টাকা ভাতা দেওয়ার সিদ্ধান্তকে বিজেপি সংখ্যালঘু তোষণ হিসেবে চিহ্নিত করে। পরে কলকাতা হাইকোর্ট এটিকে ধর্মনিরপেক্ষতার পরিপন্থী বলে রায় দেয়। তবে রাজ্য সরকার ওয়াকফ বোর্ডের মাধ্যমে সেই অর্থ প্রদান অব্যাহত রাখে।
নারী, শিক্ষার্থী, বৃদ্ধ ও কৃষকদের জন্য নানা সামাজিক প্রকল্প চালু করলেও বিজেপি প্রতিটি নির্বাচনে ‘বাংলাদেশ থেকে অনুপ্রবেশ’ ও তৃণমূল নেতাদের দুর্নীতিকেই প্রধান ইস্যু করেছে। শারদা ও নারদা কাণ্ড আলোচনায় থাকলেও ২০১৬ সালের নির্বাচনে ভোটারদের তেমন প্রভাবিত করতে পারেনি, সেবার তৃণমূল বিপুল ভোটে জেতে।
২০১৮ সালে দুর্গাপূজা কমিটিগুলোকে ১০,০০০ টাকা অনুদান দেওয়ার ঘোষণাও আইনি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে। তবে হাইকোর্ট রাজ্যের যুক্তি মেনে নেয় যে, অর্থটি সামাজিক নিরাপত্তা ও উৎসব ব্যবস্থাপনার জন্য দেওয়া হয়েছে। ২০২১ সালে মমতা ২১৩ আসন জিতে আবার ক্ষমতায় আসেন। সেই বছরই ইউনেস্কো কলকাতার দুর্গাপূজাকে সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের স্বীকৃতি দেয়।
২০২৫ সালে প্রতিটি পূজা কমিটিকে দেওয়া অনুদানের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়ায় ১ লাখ ১০ হাজার টাকা, মোট ব্যয় প্রায় ৪৯৫ কোটি টাকা।
মেরুকরণ ঠেকাতে মমতার হিন্দু মন্দির কৌশল
জাতীয় নাগরিক পঞ্জি (এনআরসি), নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (সিএএ) এবং উত্তরাখণ্ডে চালু হওয়া অভিন্ন দেওয়ানি বিধির (ইসিসি) বিরোধিতা করা মমতা বুঝতে পারছিলেন যে ২০২৬ নির্বাচনের আগে ধর্মীয় মেরুকরণ তীব্র হচ্ছে।
সেটা ঠেকাতে তিনি পাল্টা পদক্ষেপ নেন। বিজেপির মুসলিম তোষণের অভিযোগের জবাবে ২৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে পূর্ব মেদিনীপুরের দিঘায় জগন্নাথ মন্দির নির্মাণ করেন এবং ২০২৫ সালের জুনে উদ্বোধন করেন। ভোটের তিন মাস আগে জানুয়ারিতে শিলিগুড়ির কাছে ৩৪৪ কোটি টাকা ব্যয়ে বিশ্বের সর্বোচ্চ শিবমূর্তি ও মন্দির কমপ্লেক্স নির্মাণের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন।
তবে বিজেপি প্রশ্ন তুলেছে— ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রে করদাতাদের অর্থ মন্দির নির্মাণে ব্যয় করা কি উচিত?
এই প্রচেষ্টা শেষ পর্যন্ত ফলপ্রসূ হয়নি। অধ্যাপক বন্দ্যোপাধ্যায় বললেন, ‘নির্বাচনের ফলাফল বলছে, একটা বড় অংশের মুসলিম ভোটারও বিজেপিকে সমর্থন করেছেন। কারণ মমতা কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারেননি— লাখ লাখ মুসলিম পেটের দায়ে রাজ্যের বাইরে চলে যেতে বাধ্য হয়েছেন। বিজেপি প্রায় ২২ লাখ পরিযায়ী শ্রমিককে বাড়ি ফিরিয়ে ভোট দেওয়ানোর ব্যবস্থা করেছিল।’
নারী ভোটাররাও মুখ ফিরিয়ে নিলেন
যেসব নারীরা এতদিন ছিলেন মমতার সবচেয়ে বড় শক্তি, তারাও এবার মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন বলে মনে হচ্ছে।
ভোটের ধরন দেখে মনে হচ্ছে, তৃণমূলের ‘লক্ষ্মীর ভান্ডার’ প্রকল্পের (সাধারণ শ্রেণীর জন্য মাসে ১,৫০০ এবং তফসিলি জাতি ও উপজাতির জন্য ১,৭০০ টাকা) চেয়ে বিজেপির মাসে ৩,০০০ টাকার প্রতিশ্রুতি নারীদের কাছে বেশি আকর্ষণীয় হয়েছে।
কালীঘাটের গলিতেও— যেখানে মমতা ছোটবেলা থেকে বড় হয়েছেন— লাউডস্পিকারে বাজছিল বিজেপির নির্বাচনী গান: ‘পাল্টানো দরকার, চাই বিজেপি সরকার।’

মতামত দিন
মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে