Views Bangladesh Logo

জোর করে নেওয়া পদত্যাগপত্রের আইনি বৈধতা নেই, শিক্ষককে পুনর্বহালের নির্দেশ হাইকোর্টের

কোনো শিক্ষকের কাছ থেকে জোরপূর্বক পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর নেওয়া হলে তার কোনো আইনগত বৈধতা নেই বলে রায় দিয়েছেন হাইকোর্ট। একই সঙ্গে এমন পদত্যাগের কারণে চাকরি হারানো শিক্ষককে অবিলম্বে স্বপদে পুনর্বহালের নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। নির্দেশনা বাস্তবায়নে ব্যর্থ হলে সংশ্লিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদ বাতিল, সভাপতিকে অপসারণ এবং ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের এমপিও বন্ধসহ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানিয়েছেন আদালত।

‘মো. আলকাছ উদ্দিন আহমেদ বনাম রাষ্ট্র’ মামলায় এ রায় দেন বিচারপতি মো. ইকবাল কবির ও বিচারপতি এস এম সাইফুল ইসলামের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ। গাজীপুরের কালিয়াকৈরের গোলাম নবী মডেল পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. আলকাছ উদ্দিন আহমেদকে জোর করে পদত্যাগে বাধ্য করার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে করা রিটের চূড়ান্ত শুনানি শেষে গত ২০ আগস্ট আদালত রুল নিষ্পত্তি করে এ রায় দেন। সম্প্রতি রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি প্রকাশিত হয়েছে। মূল রায়টি লিখেছেন বেঞ্চের জ্যেষ্ঠ বিচারপতি মো. ইকবাল কবির।

রায়ে আদালত বলেন, রিটকারীর পদত্যাগপত্র স্বেচ্ছায় দেওয়া হয়নি। তার স্বাক্ষর জোরপূর্বক নেওয়া হয়েছিল। ফলে এ ধরনের পদত্যাগের কোনো আইনগত বৈধতা নেই। প্রচলিত আইন ও বিধিবিধান জোরপূর্বক কিংবা চাপ প্রয়োগ করে নেওয়া পদত্যাগকে সমর্থন করে না।

মামলার বিবরণ অনুযায়ী, মো. আলকাছ উদ্দিন আহমেদ কালিয়াকৈর উপজেলার গোলাম নবী মডেল পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। ২০২৪ সালের ১৪ আগস্ট একদল দুষ্কৃতকারী তার অনিচ্ছা সত্ত্বেও জোর করে একটি পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর নেয় বলে অভিযোগ করেন তিনি। ঘটনার পরদিন তিনি কালিয়াকৈর থানায় সাধারণ ডায়েরি করেন।

এরপর ২০ আগস্ট জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা এবং ২৪ আগস্ট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে লিখিতভাবে বিষয়টি জানান আলকাছ উদ্দিন। পরে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ও ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যানের কাছেও তিনি আবেদন করে আইনি প্রতিকার ও প্রয়োজনীয় হস্তক্ষেপ কামনা করেন।

ঘটনা তদন্তে একটি কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে আলকাছ উদ্দিন আহমেদকে স্বপদে বহাল করার নির্দেশ দেয় ঢাকা শিক্ষা বোর্ড। তবে সেই নির্দেশ যথাযথভাবে বাস্তবায়িত না হওয়ায় প্রতিকার চেয়ে ২০২৪ সালে হাইকোর্টে রিট করেন তিনি। প্রাথমিক শুনানি শেষে একই বছর আদালত রুল জারির পাশাপাশি জোর করে নেওয়া পদত্যাগপত্রের কার্যকারিতা তিন মাসের জন্য স্থগিত করেন। পরে চলতি বছরের ২০ আগস্ট সেই রুল নিষ্পত্তি করে চূড়ান্ত রায় দেন হাইকোর্ট।

রায়ের পর্যবেক্ষণে হাইকোর্ট বলেন, বাস্তবে রিটকারীর পদত্যাগের কোনো আইনগত বৈধতা ছিল না। এমনকি ২০২৫ সালের জুলাই পর্যন্ত তিনি এমপিওর অংশ হিসেবে বেতন-ভাতা পেয়ে আসছিলেন। এই পরিস্থিতিতে বিদ্যালয়ের পরিচালনা পর্ষদ আইনগতভাবে তাকে প্রধান শিক্ষক পদে দায়িত্ব পালনের সুযোগ দিতে এবং চাকরিতে বহাল রাখতে বাধ্য ছিল। ফলে তিনি অবিলম্বে স্বপদে পুনর্বহালের অধিকারী।

আদালত আরও বলেন, আইন অনুযায়ী ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ হিসেবে শিক্ষা বোর্ডের এখতিয়ার রয়েছে পরিচালনা পর্ষদের প্রস্তাব করা শৃঙ্খলামূলক বা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা পর্যালোচনা, অনুমোদন, সংশোধন কিংবা বাতিল করার। প্রয়োজন হলে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতাও বোর্ডের রয়েছে। তাই বোর্ডের পক্ষ থেকে পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি ও বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের প্রতি দেওয়া নির্দেশনা তাদের জন্য বাধ্যতামূলক ছিল।

হাইকোর্টের মতে, বোর্ডের নির্দেশনা ইচ্ছাকৃতভাবে অমান্য করা অসদুপায়, স্বেচ্ছাচারিতা ও ক্ষমতার অপব্যবহারের শামিল। একই সঙ্গে এ ধরনের আচরণ ন্যায়বিচারের নীতি, প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ও সমতার বিধানের পরিপন্থী। শিক্ষা বোর্ডের নির্দেশনা বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা আইনগত ও সংবিধিবদ্ধভাবে বাধ্য। তাদের নিষ্ক্রিয়তা, প্রশাসনিক অবহেলা এবং দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতা রিটকারীর বৈধ অধিকার লঙ্ঘনের শামিল।

রায়ে আদালত সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেন, বিদ্যালয়ের পরিচালনা পর্ষদের মাধ্যমে আলকাছ উদ্দিন আহমেদকে স্বপদে পুনর্বহাল নিশ্চিত করতে হবে এবং এ জন্য প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ নিতে হবে। এ নির্দেশ বাস্তবায়নে ব্যর্থ হলে শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান ও মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক নির্দেশনা অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে উপযুক্ত শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেবেন।

এসব ব্যবস্থার মধ্যে পরিচালনা পর্ষদ বাতিল, পরিচালনা পর্ষদের সভাপতিকে অপসারণ এবং প্রতিষ্ঠানের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক—যিনি পরিচালনা পর্ষদের সদস্যসচিব—তার এমপিও বন্ধের মতো পদক্ষেপ নেওয়ার সুপারিশও থাকতে পারে বলে রায়ে উল্লেখ করা হয়েছে।

রিটকারীর পক্ষে আদালতে ছিলেন আইনজীবী মো. জহুরুল ইসলাম মুকুল ও মানবেন্দ্র রায়। বিদ্যালয় পরিচালনা পর্ষদের সভাপতির পক্ষে ছিলেন আইনজীবী এস এম রেজাউল ইসলাম।

মতামত দিন

Avatar

ট্রেন্ডিং ভিউজ