গরমে সাবধান— হিট স্ট্রোক থেকে নিজেকে বাঁচান
বাইরে বেরোলেই মাথার ওপর যেন আগুন ঢালছে সূর্য। এই তীব্র গরমে শুধু অস্বস্তি নয়, লুকিয়ে আছে বড় বিপদও। চিকিৎসকরা বলছেন, গরম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হিট স্ট্রোকের ঝুঁকিও বাড়ছে। আর এটি শুধু অসুস্থতা নয় — সঠিক সময়ে ব্যবস্থা না নিলে এটি প্রাণঘাতীও হতে পারে।
হিট স্ট্রোক আসলে কী
আমাদের শরীর সবসময় নিজের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করে। কিন্তু দীর্ঘক্ষণ তীব্র গরমে থাকলে বা রোদে কঠোর পরিশ্রম করলে একসময় শরীর আর সেই কাজটা করতে পারে না। তখনই ঘটে বিপদ। শরীরের তাপমাত্রা হু হু করে বেড়ে ৪০.৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার ওপরে চলে যায়। এই অবস্থার নামই হিট স্ট্রোক।
চিকিৎসার ভাষায় এটি একটি মেডিকেল ইমার্জেন্সি। সময়মতো চিকিৎসা না পেলে কিডনি, লিভার, হৃদযন্ত্র— একের পর এক অঙ্গ বিকল হতে শুরু করে। রোগী খিঁচুনিতে পড়তে পারেন, অজ্ঞান হয়ে যেতে পারেন। কাজেই এটিকে সাধারণ গরম লাগা ভেবে এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।
কারা বেশি ঝুঁকিতে
সবার জন্যই গরম বিপজ্জনক, তবে কিছু মানুষের ঝুঁকি অনেক বেশি। ছোট শিশু আর ৬৫ বছরের বেশি বয়স্করা সবচেয়ে নাজুক অবস্থায় থাকেন, কারণ তাদের শরীর তাপ সামলানোর ক্ষমতা কম। যারা রোদের মধ্যে দীর্ঘক্ষণ কাজ করেন বা মাঠে খেলাধুলা করেন, তারাও বড় ঝুঁকিতে আছেন।
এর বাইরে হৃদরোগ বা ফুসফুসের সমস্যায় যারা ভুগছেন, তাদেরও সতর্ক থাকা জরুরি। অনেকে হয়তো জানেন না— ব্লাড প্রেশারের ওষুধ, অ্যান্টিডিপ্রেসেন্ট বা সাধারণ সর্দি-কাশির ওষুধও শরীরকে তাপের প্রতি আরও সংবেদনশীল করে তুলতে পারে।
কী কী লক্ষণ দেখলে সতর্ক হবেন
হিট স্ট্রোক হঠাৎ আসে না, এর আগে শরীর কিছু সংকেত দেয়। মাথাব্যথা, মাথা ঘোরা, অতিরিক্ত ঘাম, বমি বমি ভাব বা বমি— এগুলো প্রথম দিকের লক্ষণ। এরপর দেখা দিতে পারে পেশিতে টান বা ব্যথা, হৃদস্পন্দন দ্রুত হয়ে যাওয়া এবং শ্বাস-প্রশ্বাস বেড়ে যাওয়া।
সবচেয়ে বিপজ্জনক লক্ষণ হলো মানসিক অবস্থার পরিবর্তন— আক্রান্ত ব্যক্তি হঠাৎ বিভ্রান্ত হয়ে পড়তে পারেন, কথাবার্তা এলোমেলো হয়ে যেতে পারে। ত্বক ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়া আর গাঢ় রঙের প্রস্রাব মারাত্মক পানিশূন্যতার ইঙ্গিত দেয়। এসব দেখলে একটুও দেরি না করে চিকিৎসা নিতে হবে।
হিট স্ট্রোক হলে তাৎক্ষণিক করণীয়
কেউ হিট স্ট্রোকে আক্রান্ত হলে প্রথমেই তাকে রোদ বা গরম থেকে সরিয়ে ছায়ায় বা ঘরের ভেতরে নিয়ে যান। গায়ের অতিরিক্ত পোশাক খুলে দিন যাতে বাতাস চলাচল করতে পারে। আশেপাশে ভিড় জমানো যাবে না— একজন মানুষ পাশে থাকুন, বাকিরা জায়গা ছেড়ে দিন।
শরীর দ্রুত ঠান্ডা করাটাই এই মুহূর্তে সবচেয়ে জরুরি কাজ। ঠান্ডা পানিতে ভেজানো তোয়ালে কপালে, ঘাড়ে, বগলে আর কুঁচকিতে দিন। সম্ভব হলে ঠান্ডা শাওয়ার দিন বা বরফের প্যাক ব্যবহার করুন। এর পাশাপাশি দ্রুত জরুরি চিকিৎসা সেবার জন্য ফোন করুন।
গরমে সুস্থ থাকতে যা করবেন
প্রতিরোধই সবচেয়ে ভালো পথ। গরমে বের হলে ঢিলেঢালা, হালকা রঙের সুতির পোশাক পরুন— শরীর অনেকটা ঠান্ডা থাকবে। সঙ্গে রাখুন টুপি আর সানগ্লাস। সানস্ক্রিন লোশন লাগাতে ভুলবেন না, অন্তত SPF ১৫ হওয়া দরকার।
সারাদিন পর্যাপ্ত পানি পান করুন। শুধু তেষ্টা পেলে নয়, নিয়মিত পানি খাওয়ার অভ্যাস করুন। অ্যালকোহল এড়িয়ে চলুন, কারণ এটি শরীরকে দ্রুত পানিশূন্য করে দেয়। খাবার তালিকায় রাখুন তরমুজ, শসা, ডালিম আর কলা— এগুলো শরীরে পানি ও খনিজের ভারসাম্য রাখতে সাহায্য করে।
দুপুরের কড়া রোদে জোরালো শারীরিক পরিশ্রম না করাই ভালো। ব্যায়াম করতে চাইলে সাঁতার বা জলের মধ্যে ব্যায়াম বেছে নিন — শরীর ঠান্ডা থাকবে। বাইরে থাকলে মাঝেমধ্যে ছায়ায় বিশ্রাম নিন আর পানি পান করুন।
একটা কথা মনে রাখবেন— বদ্ধ গাড়ির ভেতর শিশু বা বয়স্ককে একা রেখে যাবেন না, এমনকি মাত্র কয়েক মিনিটের জন্যও নয়। রোদে পার্ক করা গাড়ির ভেতর তাপমাত্রা অবিশ্বাস্য রকম দ্রুত বাড়ে।
গরমের মৌসুমে একটু সচেতনতাই পারে বড় বিপদ এড়াতে। নিজে সাবধান থাকুন, পরিবারের সবাইকে সতর্ক করুন — বিশেষ করে বাড়ির শিশু ও বয়স্কদের দিকে একটু বাড়তি নজর রাখুন।

মতামত দিন
মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে