একসঙ্গে পথচলা, তবু ভিন্ন জীবনধারা: সম্পর্কে নীরব ফাটল ডেকে আনছে ‘ওয়েলনেস গ্যাপ’
দুজন মানুষ একসঙ্গে জীবন কাটালেও তাদের রুচি, অভ্যাস বা চিন্তাভাবনা এক রকম হবে— এমনটা ভাবা ভুল। বহু দম্পতি ভিন্ন স্বভাব নিয়েও বছরের পর বছর একসঙ্গে সুখে থাকেন, ছোট মতপার্থক্য তাদের ভালোবাসায় চিড় ধরাতে পারে না। তবে সাম্প্রতিক সময়ে সম্পর্কের ভেতর নিঃশব্দে একধরনের টানাপোড়েন তৈরি করছে আধুনিক জীবনযাত্রার এক নতুন বাস্তবতা, যাকে বলা হচ্ছে ‘ওয়েলনেস গ্যাপ’।
‘ওয়েলনেস গ্যাপ’ বলতে আসলে কী বোঝায়
সহজভাবে বললে, দম্পতির দুজনের মধ্যে শরীরচর্চা, খাদ্যাভ্যাস, ঘুম কিংবা সার্বিক জীবনযাপনের প্রতি সচেতনতার ক্ষেত্রে বিশাল ফারাক থাকাকেই বলা হয় ওয়েলনেস গ্যাপ। মহামারির পর বিশ্বজুড়ে মানুষ স্বাস্থ্য নিয়ে অনেক বেশি সজাগ হয়ে উঠেছে, আর এই সচেতনতাই এখন অনেক সম্পর্কে নতুন এক টানাপোড়েনের জন্ম দিচ্ছে। বৈশ্বিক ওয়েলনেস অর্থনীতির আকার ২০২৪ সালে দাঁড়িয়েছে ৬ দশমিক ৮ ট্রিলিয়ন ডলারে, যা বলে দেয় স্বাস্থ্যসচেতনতা এখন কতটা বড় একটি সাংস্কৃতিক শক্তিতে পরিণত হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে অনেকের কাছে স্বাস্থ্যচর্চা কেবল অভ্যাস নয়, বরং একধরনের পরিচয়ে রূপ নিয়েছে। ধরা যাক, সঙ্গীদের একজন কঠোর নিয়মে ডায়েট করেন, প্রতিদিন ভোরে ব্যায়াম করেন, মদ্যপান এড়িয়ে চলেন এবং ঘুমের সময় মেনে চলেন। অন্যজন হয়তো এসবের ধার ধারেন না; রাত জেগে সিরিজ দেখেন, প্রক্রিয়াজাত খাবারে অভ্যস্ত। জীবনযাপনের এই বৈপরীত্যই তৈরি করে ওয়েলনেস গ্যাপ।
দৈনন্দিন জীবনে যেভাবে দেখা দেয় সংকট
একই বাড়িতে থেকেও জীবনযাপনের এই পার্থক্য দম্পতির সম্পর্কে নানা ধরনের টানাপোড়েন তৈরি করে। অবসর কাটানোর ধরনেই প্রথম অমিলটা চোখে পড়ে; একজন হয়তো ছুটির দিনটা কাটাতে চান পাহাড়ে হাঁটতে গিয়ে বা জিমে ঘাম ঝরিয়ে, আবার অন্যজন চান সারা দিন শুয়ে-বসে আরাম করে কাটাতে। শুরুতে এটি নিছক পছন্দের পার্থক্য মনে হলেও ধীরে ধীরে তা দুজনের একসঙ্গে মানসম্পন্ন সময় কাটানোর সুযোগ কমিয়ে দেয়। একইভাবে অশান্তির আরেকটি বড় জায়গা হয়ে ওঠে খাবারের টেবিল। একজন হয়তো প্রতিটি খাবারের ক্যালরি মেপে খান, নিয়ম মেনে পুষ্টিকর উপাদান বেছে নেন, অথচ অন্যজনের পছন্দ তেলে-মসলায় ভরপুর খাবার। ফলে যে খাওয়ার সময়টা দুজনের কাছাকাছি আসার কথা, সেটাই বদলে যায় নিরন্তর তর্ক আর অস্বস্তির উৎসে।
সবচেয়ে বেশি সমস্যা তৈরি হয় যখন স্বাস্থ্য নিয়ে বেশি সচেতন সঙ্গীটি বারবার অন্যজনকে বদলে দেওয়ার চেষ্টা করেন। ‘এটা খেয়ো না’, ‘একটু হাঁটাহাঁটি করো’ এই ধরনের কথা বারবার শুনতে শুনতে তা আর সাধারণ পরামর্শ থাকে না, বরং একধরনের চাপ ও অনাহূত হস্তক্ষেপের মতো মনে হতে থাকে। এতে সম্পর্কের ভেতর জমতে থাকে মানসিক অস্বস্তি ও ক্ষোভ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এমন পরিস্থিতিতে প্রায়ই একজন সঙ্গী ধীরে ধীরে বকাঝকা করার ভূমিকায় চলে যান, আর অন্যজন সেই চাপ থেকে বাঁচতে প্রতিরোধমূলক বা এড়িয়ে যাওয়ার মনোভাব গড়ে তোলেন। ফলে যে বিষয়টি ভালোবাসা থেকে শুরু হয়েছিল, সেটাই একসময় সম্পর্কের ভেতর নিয়ন্ত্রণ আর স্বাধীনতার লড়াইয়ে রূপ নিতে পারে।
সম্পর্কে যেভাবে জমে ওঠে মানসিক দূরত্ব
যখন সম্পর্কের একপক্ষ স্বাস্থ্যচর্চা, শরীরচর্চা কিংবা সুশৃঙ্খল জীবনযাপনে অনেকটা এগিয়ে যান, তখন অন্যজনের মনে অজান্তেই এক ধরনের অপরাধবোধ তৈরি হতে পারে। নিজের অগোছালো অভ্যাস বা কম যত্নশীল জীবনধারার তুলনা যখন সঙ্গীর নিয়মানুবর্তিতার পাশে দাঁড় করানো হয়, তখন সেই তুলনা থেকে জন্ম নেয় এক ধরনের হীনম্মন্যতা; যদিও তা প্রকাশ্যে বলা হয় না। স্বাস্থ্যসচেতন সঙ্গীটি হয়তো আন্তরিকভাবেই মনে করেন, তিনি সম্পর্কের ভালোর জন্যই বারবার পরামর্শ দিচ্ছেন, সঙ্গীকে সচেতন করার চেষ্টা করছেন ভালোবাসা থেকে। কিন্তু অন্যজনের অভিজ্ঞতাটা হতে পারে সম্পূর্ণ ভিন্ন; তার কাছে এই বারবার তাগাদা বা মনে করিয়ে দেওয়া মনে হতে পারে নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারানোর ভয়, অথবা ব্যক্তিগত স্বাধীনতায় অযাচিত হস্তক্ষেপ হিসেবে।
দুই পক্ষের এই বিপরীতমুখী উপলব্ধিই আসলে সমস্যাটাকে জটিল করে তোলে। একজন যখন ভাবেন তিনি সহযোগিতা করছেন, অন্যজন তখন হয়তো অনুভব করেন বিচারের সম্মুখীন হচ্ছেন। সময়ের সঙ্গে এই ভুল বোঝাবুঝি জমতে জমতে সম্পর্কে তৈরি করে এক ধরনের নীরব প্রাচীর; যেখানে দুজনেই একই ছাদের নিচে থেকেও একে অপরের কাছ থেকে মানসিকভাবে সরে যেতে থাকেন। এভাবেই শারীরিক অভ্যাস বা জীবনযাপনের সামান্য অমিল, যা শুরুতে নিতান্তই ব্যক্তিগত পছন্দের বিষয় ছিল, ধীরে ধীরে রূপ নেয় গভীর মানসিক দূরত্বে— যা সময়মতো বোঝাপড়া না হলে সম্পর্কের ভিত পর্যন্ত নাড়িয়ে দিতে পারে।
তাহলে কি এটি বিচ্ছেদের ইঙ্গিত?
গবেষক ও সম্পর্ক-বিশেষজ্ঞরা অবশ্য বলছেন, জীবনযাপনে ভিন্নতা থাকলেই সম্পর্ক ভেঙে যায়—এমন নয়। দম্পতিদের একে অপরের চাহিদার মূল্য বুঝতে পারলে এই টানাপোড়েন অনেকটাই কমে আসে। সম্পর্ক কেবল একই রকম অভ্যাসের ওপর নির্ভর করে না, বরং তা টিকে থাকে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও বোঝাপড়ার ভিত্তিতে। নিজে স্বাস্থ্যসচেতন জীবনযাপন করা দোষের কিছু নয়, তবে সেই পছন্দ জোর করে সঙ্গীর ওপর চাপিয়ে না দেওয়াই সম্পর্কের জন্য জরুরি।
দূরত্ব কমাতে যা করা যেতে পারে
সম্পর্কের উষ্ণতা অক্ষুণ্ন রেখেই এই ব্যবধান কমানোর কিছু বাস্তবসম্মত উপায় আছে। সবচেয়ে কার্যকর পথ হলো একটা মাঝামাঝি জায়গা খুঁজে নেওয়া—দুজনের কেউই যেন মনে না করেন তাকে নিজের গোটা জীবনধারা বদলে ফেলতে হচ্ছে। যেমন সপ্তাহের বেশির ভাগ দিন ঘরে তৈরি পুষ্টিকর খাবার খাওয়া হলো, আবার সপ্তাহান্তে দুজনে মিলে পছন্দের রেস্তোরাঁয় গিয়ে প্রিয় খাবারটাও উপভোগ করা হলো—এভাবে কড়া নিয়ম আর ছাড় দুটোর মধ্যে একটা ভারসাম্য তৈরি করা সম্ভব। এই ধরনের সমঝোতা দুজনের কাছেই গ্রহণযোগ্য মনে হয়, কারণ কেউই তখন মনে করেন না যে তাকে একতরফাভাবে ছাড় দিতে হচ্ছে।
পাশাপাশি একে অন্যের পছন্দ-অপছন্দকেও সম্মান জানানো জরুরি। একজন যদি জিমে যেতে ভালোবাসেন, তাহলে অন্যজন মাঝেমধ্যে তার সঙ্গী হতে পারেন—নিজে না করলেও অন্তত পাশে থেকে উৎসাহ দিতে পারেন। আবার যেদিন একজন সিনেমা দেখে সময় কাটাতে চান, সেদিন অন্যজনও সেই আনন্দে শামিল হতে পারেন। এভাবে একে অপরের জগতে খানিকটা প্রবেশ করলে দূরত্ব বদলে যায় নৈকট্যে। সবচেয়ে বড় কথা, জোর করে কাউকে বদলে ফেলার চেষ্টা বন্ধ করতে হবে। সঙ্গীকে বারবার খোঁচা না দিয়ে, বিচার না করে, বরং নিজের স্বাস্থ্যকর অভ্যাসের ইতিবাচক প্রভাবগুলো নিজের জীবনেই উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরাই বেশি কার্যকর। চাপ দিয়ে কাউকে বদলানো যায় না, কিন্তু ভালোবাসা আর ধৈর্য দিয়ে অনুপ্রাণিত করা গেলে পরিবর্তনটা আসে নিজের ইচ্ছাতেই—আর তখনই তা টেকসই হয়।
জীবনযাপনে অমিল থাকা কোনো অপরাধ নয়। স্বাস্থ্যসচেতনতা অবশ্যই ইতিবাচক একটি দিক, তবে তা যেন কখনো সঙ্গী বা সম্পর্কের ভালোবাসার চেয়ে বড় হয়ে না দাঁড়ায়।
মতামত দিন