কক্সবাজারে মাথাবিহীন নারী ও খণ্ডিত পুরুষের মরদেহ, দুই হত্যায় বিপাকে পুলিশ
৫৫ কিলোমিটারের ব্যবধানে একই জেলায় দুদিনের মধ্যে দুটি নৃশংস হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। একটিতে মাথা ও হাতের কব্জিবিহীন এক নারীর অর্ধগলিত মরদেহ, অন্যটিতে টুকরো করে বস্তাবন্দি এক অজ্ঞাত পুরুষের মরদেহ। কক্সবাজারের এই দুই ঘটনা শুধু স্থানীয় জনমনে নয়, উদ্বেগ ছড়িয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মধ্যেও। তদন্তকারীরা বলছেন, ‘এগুলো কেবল হত্যাকাণ্ড নয়— ঠান্ডা মাথায় খুন করে পরিকল্পিতভাবে পরিচয় মুছে ফেলার চেষ্টা। এটি স্পষ্টতই পেশাদার খুনির সংশ্লিষ্টতার ইঙ্গিত দেয়।’
ঝিলংজায় মাথাবিহীন নারীর মরদেহ
গত শনিবার (১১ এপ্রিল) বিকেল চারটায় কক্সবাজার সদর উপজেলার ঝিলংজা ইউনিয়নের দক্ষিণ জানারঘোনা এলাকায় একটি পরিত্যক্ত পুকুরের পাড়ে কম্বলে মোড়ানো একটি অর্ধগলিত মরদেহ দেখতে পান স্থানীয়রা। দুর্গন্ধ ও অস্বাভাবিক দৃশ্যে সন্দেহ হলে তারা কক্সবাজার সদর মডেল থানায় খবর দেন।
পুলিশ গিয়ে কম্বল সরাতেই বিভৎস দৃশ্য চোখে পড়ে— মরদেহের মাথা নেই, নেই দুই হাতের কব্জিও। দ্রুত সুরতহাল শেষে মরদেহ পাঠানো হয় কক্সবাজার সদর হাসপাতালের মর্গে।
ঘটনাস্থলে উপস্থিত থাকা পুলিশের উপপরিদর্শক (এসআই) সঞ্জীব পাল কুন্ড জানান, স্থানীয়দের তথ্যের ভিত্তিতে নিহত নারীকে সাদিয়া আক্তার মুন্নি (২৮) হিসেবে প্রাথমিকভাবে শনাক্ত করা হয়েছে। তিনি মহেশখালী উপজেলার জাগিরাঘোনা এলাকার বাসিন্দা। তার স্বামী সাইফুর রহমান বর্তমানে পলাতক।
স্থানীয়রা জানান, গত রমজানের মাঝামাঝি সময়ে এ দম্পতি দক্ষিণ জানারঘোনায় একটি ভাড়া বাসায় ওঠেন। সাইফুর নিজেকে গাড়িচালক পরিচয় দিতেন, সাদিয়া ছিলেন গৃহিণী। তবে ঈদের পর থেকে দুজনের কাউকে এলাকায় দেখা যাচ্ছে না।
সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. ছমিউদ্দিন জানান, মরদেহটি অর্ধগলিত ও কম্বলে মোড়ানো অবস্থায় পাওয়া গেছে। মাথা ও কব্জি বিচ্ছিন্ন থাকায় পরিচয় শতভাগ নিশ্চিত করা এখনো সম্ভব হয়নি। স্বজন দাবিদারদের সঙ্গে ডিএনএ মিলিয়ে পরিচয় নিশ্চিত করা হবে।
সাদিয়ার পরিবার জানিয়েছে, তার সঙ্গে কারও কোনো বিরোধ ছিল না। গত ২৭ মার্চ থেকে তিনি নিখোঁজ ছিলেন।
টেকনাফে খণ্ডিত পুরুষের মরদেহ
এর দুদিন আগে বৃহস্পতিবার (৯ এপ্রিল) টেকনাফ উপজেলার বাহারছড়া ইউনিয়নের দক্ষিণ কচ্ছপিয়া এলাকায় হোছনী খালের একটি কালভার্টের নিচে রাখা বাজারের থলেগুলোর আশপাশে কুকুরের অস্বাভাবিক আচরণ লক্ষ করেন পথচারীরা। সন্দেহ হলে পুলিশ ডাকা হয়।
পুলিশ থলেগুলো খুলতেই বেরিয়ে আসে টুকরো করা মানবদেহের ছয়টি অংশ। একত্র করে নিশ্চিত হওয়া যায়, এটি একজন পুরুষের মরদেহ। তবে পরিচয় এখনো অজানা।
বাহারছড়া তদন্ত কেন্দ্রের ইনচার্জ পরিদর্শক দুর্জয় বিশ্বাস জানান, ধারালো অস্ত্র দিয়ে দেহটি টুকরো করা হয়েছে। পরিকল্পিতভাবে হত্যার পর লাশ গুম করতে বস্তায় ভরে খালে ফেলা হয়েছে, যাতে জোয়ারে ভেসে সাগরে চলে যায়।
টেকনাফ মডেল থানার ওসি মো. সাইফুল ইসলাম জানান, খণ্ডিত অংশগুলো উদ্ধার করে ময়নাতদন্তে পাঠানো হয়েছে।
পেশাদার অপরাধীর ছাপ
তদন্তকারীরা বলছেন, দুটি ঘটনাতেই খুনিরা সচেতনভাবে পরিচয় গোপনের চেষ্টা করেছে। টেকনাফের ঘটনায় নিহতের হাতের চামড়া তুলে ফেলা হয়েছে, যাতে আঙুলের ছাপ সংগ্রহ করা না যায়। ঝিলংজার ঘটনায় নারীর মাথা ও কব্জি কেটে আলাদা করে গুম করা হয়েছে।
পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনে (পিবিআই) ছয় বছরের বেশি অভিজ্ঞতাসম্পন্ন কর্মকর্তা মো. শাহেদুল্লাহ বলেন, খুনিরা এখন পুলিশের তদন্ত প্রক্রিয়া সম্পর্কে ভালোভাবেই সচেতন। এই দুটো ঘটনা সেটাই স্পষ্ট করে দিল।
পুলিশ পরিদর্শক দুর্জয় বিশ্বাস বলেন, এই প্যাটার্ন সংঘবদ্ধ পেশাদার অপরাধীচক্রের ইঙ্গিত বহন করে। আমরা সম্ভাব্য সূত্র ধরে তদন্তে আগাচ্ছি।
স্থানীয়রাও বলছেন, বাহারছড়া এলাকা দীর্ঘদিন ধরে মানব পাচার ও মুক্তিপণ আদায়ের ঘটনায় পরিচিত। ফলে এই হত্যার পেছনে সংঘবদ্ধ অপরাধচক্র জড়িত থাকার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
উদ্বেগ ও আশ্বাস
দুটি ঘটনার পর কক্সবাজারের বিভিন্ন এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে বলে জানান কক্সবাজার সিভিল সোসাইটির সভাপতি আবু মোর্শেদ চৌধুরী খোকা। তিনি বলেন, মরদেহ বিকৃত করার এই প্রবণতা মানুষের মধ্যে গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে।
কক্সবাজারের পুলিশ সুপার এ এন এম সাজেদুর রহমান বলেন, হত্যার ধরন ও নৃশংসতা আমাদের ভাবিয়ে তুলেছে, তদন্তে চ্যালেঞ্জও তৈরি করেছে। তবে কোনো অপরাধই নিখুঁত নয়— অপরাধীরা অজান্তেই কোনো না কোনো সূত্র রেখে যায়।
তিনি জানান, উভয় হত্যাকাণ্ড সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে এবং দ্রুত জড়িতদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তার করা সম্ভব হবে।

মতামত দিন
মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে