Views Bangladesh Logo

খুলনায় বাবা-মেয়ে হত্যা মামলায় হাইকোর্টে ৫ আসামির মৃত্যুদণ্ড বহাল

খুলনার লবণচরায় ব্যাংক কর্মকর্তা পারভীন সুলতানা ও তার বাবা ইলিয়াস চৌধুরীকে হত্যার মামলায় পাঁচ আসামির মৃত্যুদণ্ড বহাল রেখেছেন হাইকোর্ট। তবে একই ঘটনায় দায়ের হওয়া দলবদ্ধ ধর্ষণ মামলায় মৃত্যুদণ্ড কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) বিচারপতি ভীষ্মদেব চক্রবর্তী ও বিচারপতি কে এম রাশেদুজ্জামান রাজার সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্টের একটি বিশেষ বেঞ্চ এই রায় দেন। দণ্ডপ্রাপ্ত পাঁচ আসামি হলেন—মো. লিটন, সাইফুল ইসলাম পিটিল, আবু সাঈদ, আজিজুর রহমান ওরফে পলাশ এবং শরিফুল আলম।

আদালত বলেছেন, দস্যুতাকালে হত্যার অভিযোগে দণ্ডবিধির ৩৯৬ ধারায় নিম্ন আদালতের দেওয়া মৃত্যুদণ্ড বহাল থাকবে। অন্যদিকে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ৯(৩) ধারায় (ধর্ষণ ও হত্যা) দেওয়া দণ্ড পরিবর্তন করে ৯(১) ধারায় রূপান্তর করা হয়েছে, যার ফলে পাঁচ আসামিকেই যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

বাদীপক্ষে আদালতে উপস্থিত ছিলেন সিনিয়র আইনজীবী মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম, তাকে সহযোগিতা করেন আইনজীবী সৈয়দ আল আসাফুর আলী রাজা, মো. নাজিমউদ্দিন ও মাহমুদুল ইসলাম।

রায়ের পর তাজুল ইসলাম বলেন, অন্তত একটি বিষয়ে তারা সন্তুষ্ট যে আসামিদের মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখা হয়েছে। ধর্ষণ মামলায় পাঁচ আসামিকে যাবজ্জীবন দেওয়া হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, তারা পূর্ণাঙ্গ রায়ের অপেক্ষায় আছেন। বিচারকদের পর্যবেক্ষণে যদি এই মামলাতেও দণ্ড বাড়ানোর আপিলের সুযোগ থাকে, তা পর্যালোচনা করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।

তিনি আরও বলেন, ভুক্তভোগীর পরিবারের পক্ষ থেকে অন্তত এটুকু বলা যায় যে, বাবা ও মেয়ের এমন নির্মম হত্যাকাণ্ড বিচারহীন থেকে যায়নি—তারা আদালতে প্রতিকার পেয়েছেন। এতে পরিবারটির মধ্যে একধরনের স্বস্তি ও কৃতজ্ঞতাবোধ তৈরি হবে বলে তিনি মনে করেন, তবে দণ্ড কার্যকর হলেই প্রকৃত শান্তি আসবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

মামলার নথি অনুযায়ী, ২০১৫ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর রাতে খুলনার লবণচরা এলাকার বুড়ি মৌলভীর দরগাহ পাড়ার ‘ঢাকাইয়া বাড়িতে’ এই নৃশংস ঘটনা ঘটে। দুর্বৃত্তরা বাড়িতে ঢুকে প্রথমে পারভীন সুলতানাকে দলবদ্ধভাবে ধর্ষণ করে, এরপর তাকে ও তার বাবা ইলিয়াস চৌধুরীকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে। পরে লাশ দুটি বাড়ির সেপটিক ট্যাংকে ফেলে পালিয়ে যায় তারা।

ঘটনার পরদিন ১৯ সেপ্টেম্বর পারভীনের ভাই ও ইলিয়াস চৌধুরীর ছেলে রেজাউল আলম চৌধুরী বিপ্লব বাদী হয়ে লবণচরা থানায় দণ্ডবিধির ৩০২ ধারায় হত্যা মামলা দায়ের করেন। তদন্তকালে পুলিশ মো. লিটন ও সাঈদকে সন্দেহভাজন হিসেবে গ্রেপ্তার করে। আসামিরা আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়ে ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ দেন। এর চার দিন পর ২২ সেপ্টেম্বর ধর্ষণ ও হত্যার অভিযোগে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ৯(৩) ধারায় আরেকটি মামলা দায়ের করা হয়।

২০১৯ সালের ১৬ জুলাই খুলনার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-৩ দুটি পৃথক মামলায় পাঁচ আসামি লিটন, পিটিল, সাঈদ, পলাশ ও শরিফুলকে দুবার মৃত্যুদণ্ড দেন।মৃত্যুদণ্ড অনুমোদনের জন্য পাঠানো ডেথ রেফারেন্স এবং আসামিপক্ষের আপিল হাইকোর্টে আসার পর একটি বিশেষ বেঞ্চে শুনানি নির্ধারণের সময় বিচারিক এখতিয়ার নিয়ে জটিলতা দেখা দেয়।

একই ঘটনা হলেও দুটি মামলায় ভিন্ন আইনি ধারা প্রযোজ্য ছিল। যেহেতু বিশেষ বেঞ্চটি কেবল নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের মামলা নিষ্পত্তির এখতিয়ারপ্রাপ্ত ছিল, তাই দণ্ডবিধির আওতাধীন ইলিয়াস চৌধুরী হত্যা মামলাটি তালিকা থেকে বাদ পড়ে যায়। একই ঘটনা ও একই সাক্ষ্যপ্রমাণ সত্ত্বেও দুটি মামলা ভিন্ন বেঞ্চে শুনানির ফলে যাতে ন্যায়বিচার ব্যাহত না হয়, সে জন্য বাদী রেজাউল আলম চৌধুরী প্রধান বিচারপতির কাছে একটি বিশেষ আবেদন করেন।

সে সময় বাদীপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট সৈয়দ আল আসাফুর আলী রাজা এবং রাষ্ট্রপক্ষের ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল ইমাম হোসেন তারেক, উভয়েই যুক্তি দেন যে ন্যায়বিচারের স্বার্থে দুটি মামলার ডেথ রেফারেন্সই একই বেঞ্চে শুনানি হওয়া উচিত। প্রধান বিচারপতির নির্দেশনা অনুযায়ী একই বিশেষ বেঞ্চে ধারাবাহিক শুনানির পর আজ চূড়ান্ত রায় দেন বিচারকরা।

মতামত দিন

Avatar

ট্রেন্ডিং ভিউজ