সোনালী ব্যাংক কর্মকর্তাকে হয়রানি: এধরণের সাংবাদিকতা নৈতিকতার কোন মাপকাঠিতে পড়ে?
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকজুড়ে সোনালী ব্যাংকে কর্মরত এক তরুণীর ভয়ার্ত ও কান্নামাখা চেহারার একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে। ভিডিওতে একজন তাকে পুলিশি কায়দায় জেরা করছেন। শুধু জেরাই করছেন না, কথার মারপ্যাঁচে তাকে দোষারোপ কিংবা কোনো অভিযোগ স্বীকার করিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছেন। যিনি জেরা করছেন, তিনি নিজেকে সাংবাদিক হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন। তিনি কোটালীপাড়া প্রেস ক্লাবের সভাপতি এবং দৈনিক যুগান্তরের প্রতিনিধি এইচ এম মেহেদী হাসনাত। আর যাকে জেরা করা হচ্ছে, তিনি সোনালী ব্যাংক পিএলসির কোটালীপাড়া উপজেলার ঘাঘর শাখার ক্যাশ অফিসার ফৌজিয়া হক।
মাত্র ৪ হাজার ৫০০ টাকার হিসাবে গড়মিলকে কেন্দ্র করে ভিডিওটি ভাইরাল হওয়ার পর এ ঘটনার সূত্রপাত। ফৌজিয়া হককে কেন্দ্র করে সৃষ্ট ঘটনায় তাকে জনসমক্ষে প্রশ্নবাণে জর্জরিত ও মানসিকভাবে হেনস্তা করার অভিযোগ তুলে প্রতিবাদ জানিয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক কর্মকর্তা ঐক্য পরিষদ, বাংলাদেশ। একই সঙ্গে ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্তের দাবিও জানিয়েছে সংগঠনটি। এ বিষয়ে ভিউজ বাংলাদেশের কথা হয় সোনালী ব্যাংকের সাবেক কর্মকর্তা ও অবসরপ্রাপ্ত ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার (ডিজিএম) তোফায়েল আহমেদের সঙ্গে।
তিনি জানান, ভুলক্রমে হোক বা ইচ্ছাকৃত—বিষয়টি দেখভাল করার জন্য যথাযথ কর্তৃপক্ষ রয়েছে, দেশে আইনও রয়েছে। কিন্তু অপরাধ প্রমাণিত হওয়ার আগেই, এমনকি প্রমাণের সুযোগ না দিয়েই মিডিয়া ট্রায়ালের মাধ্যমে একজন মানুষের, বিশেষ করে একজন নারী বা তরুণীর সামাজিক সম্মান, মর্যাদা এবং মানসিক হেনস্তা করার পন্থাটি সাংবাদিকতার নৈতিকতার কোন মাপকাঠির আওতায় পড়ে, সেটি একটি বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তিনি বলেন, সাংবাদিকতার মাপকাঠি জেনেও, না জেনে কিংবা বুঝেও না বুঝে যিনি এই অপকর্ম করেছেন, তাকে কী বলা উচিত? হলুদ সাংবাদিক, নাকি ভিউ-ব্যবসায়ী? সেই সিদ্ধান্ত দেশের বিশিষ্ট সাংবাদিকদের ওপরই ছেড়ে দিলাম। তবে যা হয়েছে, তা অপসাংবাদিকতা—এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই।
একজন ক্যাশ অফিসার বা ক্যাশিয়ারের ব্যাংকিং কার্যক্রম কীভাবে চলে—এ বিষয়ে তোফায়েল আহমেদ জানান, নিয়ম অনুযায়ী একজন ক্যাশিয়ার নতুন টাকার ক্ষেত্রে দৈনিক ২০ হাজার পিস টাকা গুনবেন। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, আমাদের দেশের ব্যাংকগুলোতে একজন ক্যাশিয়ার গড়পড়তা লাখ পিস টাকাও গুনে থাকেন। ফলে এ ক্ষেত্রে ভুল হওয়া একেবারেই অস্বাভাবিক নয়।
তবে আইনের দৃষ্টিতে ব্যাংকে একটি টাকার হিসাবেও অজ্ঞতা, ভুল বা গড়মিলের অজুহাত দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। ক্যাশ না মিললে ছুটি নেই। হিসাবে টাকা কম হলে নিজের পকেট থেকে টাকা দিয়ে হিসাব মিলাতে হবে। আবার টাকা বেশি হলেও কেন বেশি হয়েছে, তা নির্ণয় না করে অফিস ত্যাগ করার সুযোগ নেই। ভুল করে হিসাবে গড়মিল হয়েছে—এমন দাবি করেও পার পাওয়ার সুযোগ নেই। ভুল হোক বা ইচ্ছাকৃত, দুটিই শাস্তিযোগ্য হতে পারে।
এ ক্ষেত্রে তিনটি বিষয় মনে রাখা জরুরি—অপরাধ হয়েছে কি না, তা নির্ণয় করা হবে তদন্ত, সাক্ষ্য ও প্রমাণের ভিত্তিতে। অপরাধ নির্ণয় ও প্রমাণিত হলে এর ধরন ও মাত্রা অনুযায়ী শাস্তি নির্ধারণ করা হবে। ভুলের ক্ষেত্রে লঘুদণ্ড হিসেবে কারণ দর্শানোর নোটিশ প্রদান থেকে শুরু করে গুরুদণ্ড হিসেবে শাস্তিস্বরূপ বদলি, সাময়িক বরখাস্ত, পদোন্নতি স্থগিত বা পদাবনতি করা হতে পারে। প্রয়োজনে আদালতের দ্বারস্থ হয়ে আইন অনুযায়ী শাস্তির ব্যবস্থাও করা যেতে পারে। তবে এসবই হবে প্রতিষ্ঠানের বিভাগীয় বিচারব্যবস্থার আওতায়। প্রতিষ্ঠানের বাইরের কারও উপযাচক হয়ে ক্ষমতা প্রয়োগ বা অনধিকার চর্চার কোনো সুযোগ নেই। আর মিডিয়া ট্রায়ালের তো প্রশ্নই আসে না।
মিডিয়া ট্রায়ালের বিষয়ে সাবেক এই ব্যাংক কর্মকর্তা বলেন, ব্যাংকের অভ্যন্তরে অনুমতি ছাড়া ভিডিও ধারণ করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ এবং আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। সাংবাদিকতা বা বিশেষ কোনো প্রয়োজনে ব্যাংকের ভেতরে ভিডিও বা ছবি তুলতে হলে অবশ্যই শাখা ব্যবস্থাপক বা প্রধান কার্যালয়ের যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে লিখিত অনুমতি নিতে হয়। কোনো ব্যাংকে লিখিত অনুমতি ছাড়া ভিডিও ধারণ করা বা কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাজে বাধা সৃষ্টি করা হলে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ তাৎক্ষণিকভাবে আইনগত ব্যবস্থা নিতে পারে।
তবে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক কর্মকর্তা ঐক্য পরিষদসহ বিভিন্ন ব্যাংকিং ফোরামের ঘোষণাপত্র অনুযায়ী, সাংবাদিক বা সাধারণ নাগরিক—কোনো পরিচয়েই ব্যাংকের সংবেদনশীল এলাকায় অনুমতিহীন প্রবেশ বা ভিডিও ধারণের অবাধ অধিকার কারও নেই।
এখন প্রশ্ন আসে, যিনি তথাকথিত সাংবাদিক পরিচয়ে ব্যাংকের অভ্যন্তরে মোবাইল ফোনে ভিডিও ধারণ করলেন, তিনি কি যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে লিখিত অনুমতি নিয়েছিলেন? নাকি সাংবাদিকতার নামে অপসাংবাদিকতার ভয় দেখিয়ে একজনকে জিম্মি করে প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তির সম্মানহানি করা হয়েছে? এখন ব্যাংক যদি এ বিষয়ে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়, তাহলে তিনি সাংবাদিকতার কোন নীতিমালার দোহাই দেবেন? নাগরিক সাংবাদিকতার কথাও যদি বলা হয়, তাহলে আদৌ কি বিষয়টি নাগরিক সাংবাদিকতার পর্যায়ে পড়ে?
এ বিষয়ে সাবেক এই কর্মকর্তা ভিউজ বাংলাদেশের কাছে প্রশ্ন রেখে বলেন, এখন যদি এই তরুণী সম্মানহানির শিকার হয়ে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন এবং কোনো দুর্ঘটনা ঘটিয়ে ফেলেন, তাহলে সেই দায় কি ওই সাংবাদিক নেবেন?
ভাইরাল হওয়া সেই কর্মকর্তাকে ব্যক্তিগতভাবে না চিনলেও তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগটি বেশ অসংলগ্ন বলে মনে করেন অবসরপ্রাপ্ত ডিজিএম। তিনি বলেন, ক্যাশ কাউন্টারে মাথার ওপর এতগুলো সিসিটিভি ক্যামেরা থাকা অবস্থায় বসে থেকে কেউ সুস্থ মস্তিষ্কে গ্রাহকের ১০ টাকাও চুরির চেষ্টা করবেন—এটা রীতিমতো অবাস্তব।
তবে বিষয়টি কেবল ব্যাংকপাড়াতেই নয়, আলোচনা-সমালোচনা চলছে গণমাধ্যম অঙ্গনেও। খোদ সাংবাদিকরাই এ ঘটনায় আক্ষেপ প্রকাশ করে তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছেন। কেউ কেউ ওই সাংবাদিককেও আইনের আওতায় আনার পরামর্শ দিয়েছেন।
মতামত দিন