Views Bangladesh Logo

হালান্ড বনাম কেইন: কার হাতে উঠছে সেমিফাইনালের টিকিট?

বিশ্বকাপের কোয়ার্টার-ফাইনালের সবচেয়ে কৌশলগত লড়াইগুলোর একটি হতে যাচ্ছে নরওয়ে ও ইংল্যান্ডের ম্যাচ (১১ জুলাই, মিয়ামি)। এটি শুধু দুই দলের মুখোমুখি লড়াই নয়; বরং দুই ভিন্ন ফুটবল দর্শনের ‘সংঘর্ষ’। একদিকে স্টালে সোলবাকেনের নরওয়ে, যারা বলের দখল ধরে রেখে প্রতিপক্ষকে ধৈর্যচ্যুত করে হঠাৎ-ই বিধ্বংসী আক্রমণে যায়। অন্যদিকে থমাস টুখেলের ইংল্যান্ড, যাদের পরিচয় উচ্চ-প্রেসিং, দ্রুত ট্রানজিশন এবং আক্রমণাত্মক ফুটবল।

নরওয়ে ইতোমধ্যেই এই বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় চমক। গ্রুপ পর্বে ইরাককে ৪-১ ও সেনেগালকে ৩-২ গোলে হারানোর পর নকআউটে আইভরি কোস্ট ও পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিলকে ২-১ ব্যবধানে বিদায় করে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে উঠেছে দলটি। অন্যদিকে ইংল্যান্ডও সহজে শেষ আটে আসেনি। ডিআর কঙ্গো ও মেক্সিকোর বিপক্ষে কঠিন লড়াই জিতে টুখেলের দল প্রমাণ করেছে, সৌন্দর্যের চেয়ে ফলই এখন তাদের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

সম্ভাব্য ফরমেশন

নরওয়ে (৪-৩-৩)

গোলরক্ষক: অরইয়ান নিল্যান্ড

রক্ষণ: জুলিয়ান রাইয়ারসন, ক্রিস্টোফার আজের, লিও অস্টিগার্ড, (ডেভিড মোলার উলফ না খেললে বিকল্প)

মিডফিল্ড: প্যাট্রিক বার্গ, সান্দার বের্গে, মার্টিন ওডেগার্ড

আক্রমণ: আলেকজান্ডার সরলথ, আর্লিং হালান্ড, আন্দ্রেয়াস শেলদেরুপ (নুসা ফিট না হলে)

ইংল্যান্ড (৪-২-৩-১)

গোলরক্ষক: জেমস ট্র্যাফোর্ড

রক্ষণ: জেড স্পেন্স, এজরি কনসা, মার্ক গেহি (ফিট থাকলে), নিকো ও'রেইলি

ডাবল পিভট: ডেকলান রাইস (ফিট থাকলে), এলিয়ট অ্যান্ডারসন

আক্রমণাত্মক মিডফিল্ড: জুড বেলিংহাম

উইং: বুকায়ো সাকা, অ্যান্থনি গর্ডন/মার্কাস রাশফোর্ড

স্ট্রাইকার: হ্যারি কেইন

নরওয়ের ট্যাকটিকস: বলের দখল, ধৈর্য, তারপর হালান্ড
নরওয়ের আক্রমণের শুরু গোলরক্ষক অরইয়ান নিল্যান্ডের পা থেকে। গোল-কিকের সময় তারা ছোট ছোট পাসে বিল্ড-আপ গড়ে তোলে। দুই হোল্ডিং মিডফিল্ডার নিচে নেমে এসে বল গ্রহণ করেন, ফুল-ব্যাকরা চওড়া হয়ে যায় এবং নিল্যান্ড নিজেই অতিরিক্ত একজন পাসিং অপশন হয়ে ওঠেন।

প্রতিপক্ষ প্রেস করলে নিল্যান্ডের বিকল্প পরিকল্পনা হলো ডানদিকে থাকা ৬ ফুট ৫ ইঞ্চি লম্বা আলেকজান্ডার সরলথের উদ্দেশে দীর্ঘ ডায়াগোনাল বল। সরলথ বল নামিয়ে দিলে দ্বিতীয় বল সংগ্রহ করে ওডেগার্ড কিংবা উইঙ্গাররা দ্রুত আক্রমণ গড়ে তোলেন।

আক্রমণে নরওয়ের মূল পরিকল্পনা তিনটি: ওডেগার্ডের থ্রু বলে হালান্ড কর্তৃক প্রতিপক্ষের সেন্টার-ব্যাকদের চাপে ফেলা; উইং থেকে প্রতিপক্ষের বক্সে ক্রস তুলে হালান্ডকে খুঁজে নেওয়া এবং কাট-ব্যাক থেকে দ্রুত ফিনিশিংয়ের সুযোগ তৈরি করা।

ইংল্যান্ডের ট্যাকটিকস: হাই-প্রেস, মিডফিল্ড নিয়ন্ত্রণ ও দ্রুত ট্রানজিশন
টুখেলের দল সম্ভবত ৪-২-৩-১ ফরমেশনে খেললেও বল ছাড়া অবস্থায় সেটি অনেক সময় ৪-৪-২ কিংবা ৪-৫-১-এ রূপ নেবে।

হ্যারি কেইন ও বেলিংহাম শুরুতেই নরওয়ের বিল্ড-আপে চাপ সৃষ্টি করবেন। প্রয়োজনে ডেকলান রাইসও উপরে উঠে এসে তিনজন মিলে প্রেস করবেন, যাতে নিল্যান্ড সহজে ছোট পাসে খেলা গড়ে তুলতে না পারেন।

আক্রমণে ইংল্যান্ডের পরিকল্পনা হবে: বলের দখল ধরে রাখা; দুই উইং দিয়ে আক্রমণ বিস্তৃত করা; নিকো ও'রেইলি ও উইঙ্গারদের ওভারল্যাপ ব্যবহার করা; কেইনের নিচে নেমে বল ধরে বেলিংহাম ও গর্ডনের জন্য জায়গা তৈরি করা এবং নরওয়ে বল হারালেই দ্রুত কাউন্টার অ্যাটাকে যাওয়া।

আর্লিং হালান্ড বনাম ইংল্যান্ডের সেন্টার-ব্যাক
এই টুর্নামেন্টে এজরি কনসা ও মার্ক গেহি দুর্দান্ত খেললেও হালান্ডের মতো শক্তিশালী স্ট্রাইকারের মুখোমুখি তারা এখনও হননি।

তাদের কাজ হবে: ব্যাক-পোস্টের ক্রস আটকানো; সরলথের লে-অফ থেকে তৈরি হওয়া আক্রমণ নষ্ট করা এবং ওডেগার্ডের থ্রু বলের আগে হালান্ডকে শরীর দিয়ে আটকে রাখা।

যদি হালান্ডকে বক্সে স্বাধীনভাবে নড়াচড়া করতে দেওয়া হয়, তাহলে ইংল্যান্ড বড় বিপদে পড়বে।

জুড বেলিংহাম বনাম নরওয়ের মিড ব্লক
মেক্সিকোর বিপক্ষে বেলিংহামের দুই গোলই এসেছে মাঝমাঠ থেকে দেরিতে বক্সে ঢুকে।

নরওয়ের প্যাট্রিক বার্গ ও সান্দার বের্গে মিডফিল্ডে ব্লক তৈরি করেন, ফলে বেলিংহামের দেরিতে বক্সে ঢোকার লড়াই ম্যাচের অন্যতম উপভোগ্য দিক হবে।

ইংল্যান্ড কীভাবে হালান্ডকে থামাতে পারে?
হালান্ডকে থামানোর দুটি পথ। প্রথমত, তাঁর কাছে বলই পৌঁছাতে না দেওয়া, অর্থাৎ ওডেগার্ডকে চাপে রাখা।

দ্বিতীয়ত, হালান্ডকে সবসময় দুইজন ডিফেন্ডারের মাঝে রাখা।

টুখেল সম্ভবত মাঝারি মাত্রার প্রেসিং ব্যবহার করবেন। তিনি নিল্যান্ডকে দীর্ঘ বল খেলতে বাধ্য করতে চাইবেন এবং দ্বিতীয় বল জিতে দ্রুত আক্রমণে যাবেন।

ইংল্যান্ড কোথায় সুযোগ পাবে?
নরওয়ে আক্রমণে অনেক খেলোয়াড় তুলে আনে, ফলে বল হারানোর পর তাদের রক্ষণে বড় ফাঁকা জায়গা তৈরি হয়।

এই স্পেস কাজে লাগাতে পারেন অ্যান্থনি গর্ডন, বুকায়ো সাকা, ননি মাদুয়েকে ও জুড বেলিংহাম।

হ্যারি কেইনের নিচে নেমে খেলার ক্ষমতা এই আক্রমণগুলোকে আরও কার্যকর করে তুলবে।

সেট-পিসেও হতে পারে ম্যাচের পার্থক্য

নরওয়ের কর্নার ও ফ্রি-কিকের মূল ভরসা মার্টিন ওডেগার্ড। এছাড়া জুলিয়ান রাইয়ারসন ও প্যাট্রিক বার্গও দায়িত্ব নিতে পারেন। পেনাল্টিতে থাকবেন আর্লিং হালান্ড।

ইংল্যান্ডের সেট-পিস পরিচালনার প্রধান দায়িত্ব ডেকলান রাইসের। বুকায়ো সাকা, এলিয়ট অ্যান্ডারসন, মার্কাস রাশফোর্ড ও অ্যান্থনি গর্ডনও বিকল্প হিসেবে রয়েছেন। পেনাল্টির প্রথম পছন্দ হ্যারি কেইন।

ইনজুরি ও সাসপেনশন
নরওয়ের ডেভিড মোলার উলফ ইনজুরিতে। আন্তোনিও নুসার খেলাও অনিশ্চিত।

ইংল্যান্ডের জ্যারেল কোয়ানসা নিষিদ্ধ। জর্ডান হেন্ডারসন টুর্নামেন্ট থেকে ছিটকে গেছেন। রিস জেমস ও মার্ক গেহি পুরোপুরি ফিট নন। ডেকলান রাইস অসুস্থতা কাটিয়ে ফিরতে পারেন।

ম্যাচ পূর্বাভাস
কাগজে-কলমে ইংল্যান্ডের স্কোয়াড গভীরতা ও বড় ম্যাচের অভিজ্ঞতা বেশি। কিন্তু বর্তমান ফর্মে নরওয়ে টুর্নামেন্টের সবচেয়ে আত্মবিশ্বাসী দলগুলোর একটি। ওডেগার্ড যদি ম্যাচের গতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন এবং হালান্ড এক-দুটি পরিষ্কার সুযোগ পান, তাহলে নরওয়ে সেমিফাইনালে উঠতেই পারে।

তবে টুখেলের প্রেসিং, কেইন-বেলিংহামের সমন্বয় এবং ইংল্যান্ডের দ্রুত ট্রানজিশন শেষ পর্যন্ত পার্থক্য গড়ে দিতে পারে।

সম্ভাব্য ফলাফল: ইংল্যান্ড ২-১ নরওয়ে। তবে এটি এমন একটি ম্যাচ, যেখানে একটি মুহূর্তের ভুল, একটি সেট-পিস কিংবা হালান্ডের একটি স্পর্শই পুরো ম্যাচের গল্প বদলে দিতে পারে।

মতামত দিন

Avatar

ট্রেন্ডিং ভিউজ