চট্টগ্রামে ‘গুপ্ত’ মন্তব্য নিয়ে সংসদে উত্তপ্ত বিতর্ক
চট্টগ্রাম সরকারি সিটি কলেজে ‘গুপ্ত’ শব্দের ব্যবহার নিয়ে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল এবং ইসলামী ছাত্রশিবিরের মধ্যে সাম্প্রতিক সংঘর্ষের ঘটনাটি জাতীয় সংসদে এক উত্তপ্ত বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। বুধবার (২২ এপ্রিল) রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর ধন্যবাদ প্রস্তাবের আলোচনায় অংশ নিয়ে সরকারি দল ও বিরোধী দলের সদস্যদের মধ্যে এ নিয়ে তুমুল বাগ্বিতণ্ডা হয়।
সংসদে আলোচনার সময় সরকারি দলের সংসদ সদস্য আবদুল ওয়াদুদ ভূঁইয়া চট্টগ্রামের এই প্রসঙ্গটি উত্থাপন করেন। তিনি অভিযোগ করেন যে, দেওয়ালে ‘গুপ্ত’ শব্দটি লেখার কারণে ছাত্রদল কর্মীদের ওপর হামলা করেছে শিবির।
আবদুল ওয়াদুদ ভূঁইয়া বলেন, ছাত্রদলের অপরাধ কী ছিল? তারা শুধু 'গুপ্ত' বলেছে, ‘গুপ্ত’ লিখেছে। এই একটি শব্দের জন্য তারা ছাত্রদলের ওপর হামলা করেছে এবং বাংলাদেশের গণতন্ত্রের ওপর আঘাত হেনেছে। তিনি বিরোধী পক্ষকে নবগঠিত সরকারকে অস্থিতিশীল করার পরিকল্পিত ষড়যন্ত্রে লিপ্ত থাকার অভিযোগে অভিযুক্ত করেন এবং সতর্ক করে বলেন, ‘যারা আমাদের ভোট দিয়েছে তারা আঙুল চুষবে না। তারা প্রতিবাদ করবে।’
বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান তাৎক্ষণিকভাবে এই বক্তব্যের প্রতিবাদ জানিয়ে একে একটি হুমকি হিসেবে বর্ণনা করেন। তিনি সংসদীয় কার্যবিবরণী থেকে এই হুমকিমূলক ভাষা প্রত্যাহারের দাবি জানান। তিনি বলেন, ‘একজন সংসদ সদস্য সংসদে দাঁড়িয়ে হুমকিমূলক স্বরে কথা বলছেন। ‘জনগণ চুপ করে থাকবে না’—এর মানে কী? তিনি কি জনগণকে নৈরাজ্যের দিকে উস্কানি দিচ্ছেন? এটি সংসদীয় আচরণ নয়।’
স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমেদ এ পর্যায়ে হস্তক্ষেপ করেন এবং জানান যে, বক্তব্যটি পর্যালোচনা করা হবে এবং কোনো অসংসদীয় শব্দ থাকলে তা রেকর্ড থেকে বাদ দেওয়া হবে। তিনি সদস্যদের প্রতি এই বক্তব্যটিকে একটি রাজনৈতিক বক্তব্য হিসেবে বিবেচনা করার আহ্বান জানান।
পরবর্তীতে জামায়াতের সংসদ সদস্য মিজানুর রহমান (চাঁপাইনবাবগঞ্জ-২) স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে কোনো নির্দিষ্ট দলের ওপর দোষারোপ না করে বিষয়টি সুষ্ঠু তদন্তের দাবি জানান। এর আগে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ সংসদকে জানিয়েছিলেন যে, তিনি প্রাথমিক রিপোর্ট পেয়েছেন তবে আঙুল তোলার আগে একটি পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্তের প্রয়োজন রয়েছে।
বিএনপি দলীয় সংসদ সদস্য এ কে এম সেলিম রেজা হাবিব (পাবনা-২)-ও বিরোধী দলের সমালোচনা করেন এবং অসহিষ্ণু ও আক্রমণাত্মক আচরণের মাধ্যমে গণতন্ত্রকে বিপন্ন করার অভিযোগ তোলেন। তিনি বলেন, ‘শুধুমাত্র বিরোধিতার খাতিরে বিরোধিতা করবেন না। আসুন, আমরা গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করি, ভোটাধিকার নিশ্চিত করি এবং দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা করি।’
সংসদের এই উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় মূলত মাঠপর্যায়ের ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক উত্তেজনারই প্রতিফলন, যেখানে ‘গুপ্ত’ শব্দটি এখন একটি রাজনৈতিক অস্ত্রে পরিণত হয়েছে। ডেইলি স্টার বাংলার এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই শব্দটি এখন প্রধানত ইসলামী ছাত্রশিবিরকে উদ্দেশ্য করে ব্যবহার করা হচ্ছে; সমালোচকদের দাবি, শিবিরের কর্মীরা তাদের রাজনৈতিক পরিচয় লুকিয়ে এর আগে বিভিন্ন ব্যানারে ছাত্র রাজনীতিতে লিপ্ত ছিল।
সর্বশেষ এই সংঘর্ষের সূত্রপাত হয় সিটি কলেজ ক্যাম্পাসের একটি দেয়াল লিখনকে কেন্দ্র করে, যেখানে শিবির কর্মীরা ‘ছাত্র রাজনীতি ও ছাত্রলীগ মুক্ত ক্যাম্পাস’ লিখেছিল। পরে ছাত্রদল সেই লেখাটি কেটে 'ছাত্র' শব্দের ওপর 'গুপ্ত' লিখে দেয়। এর জের ধরে অনলাইনে উস্কানি এবং পরবর্তীতে মঙ্গলবার এক রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে, যাতে অন্তত ১০ জন আহত হন। বর্তমানে ক্যাম্পাসে পুলিশ মোতায়েন রয়েছে।

মতামত দিন
মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে