জলের গুরুত্বকে উপজীব্য করে গুলশান-বনানী পূজা ফাউন্ডেশনের মণ্ডপ
জল—জীবনের উৎস, সৃষ্টির আদি উপাদান এবং পবিত্রতার প্রতীক। এই জলের গুরুত্ব, প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক এবং জীবনের ধারাবাহিকতাকে কেন্দ্র করেই এবারের দুর্গাপূজার মণ্ডপ সাজাচ্ছে গুলশান-বনানী সার্বজনীন পূজা ফাউন্ডেশন। শারদোৎসব ১৪৩৩ উপলক্ষে তাদের এবারের প্রতিপাদ্য ‘জলজ’—অর্থাৎ জল থেকে যার জন্ম। ধর্মীয় বিশ্বাস, আধ্যাত্মিক ভাবনা ও পরিবেশসচেতনতাকে একসূত্রে গেঁথে মণ্ডপের নকশায় তুলে ধরা হচ্ছে জলের বহুমাত্রিক তাৎপর্য।
আধুনিক বিজ্ঞান পৃথিবীতে প্রাণের অস্তিত্বের জন্য জলকে অপরিহার্য বলে স্বীকৃতি দিয়েছে। প্রাচীন বৈদিক দর্শনেও জলকে সৃষ্টির আদি উপাদান হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। ঋগ্বেদের নাসদীয় সূক্তে সৃষ্টির পূর্বাবস্থার বর্ণনায় অন্ধকারে আচ্ছন্ন এক অসীম জলরাশির ধারণা উঠে এসেছে। সেই ভাবনাকেই ধারণ করে ‘জলজ’ থিমে জলকে শুধু একটি প্রাকৃতিক সম্পদ হিসেবে নয়, বরং সৃষ্টি, জীবন ও আধ্যাত্মিকতার প্রতীক হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে।
সনাতন ধর্মীয় ঐতিহ্যে জল পবিত্রতা, শুদ্ধি ও জীবনের ধারাবাহিকতার প্রতীক। জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত মানুষের জীবনচক্রের সঙ্গে জলের সম্পর্ক নিবিড়। ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান, ঘটস্থাপন, তর্পণ, হোম ও আত্মশুদ্ধির নানা প্রক্রিয়ায় জলের রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। একইভাবে, জল থেকে জন্ম নেওয়া পদ্মের প্রস্ফুটন সৃষ্টির সৌন্দর্য ও প্রাণের জাগরণের প্রতীক। এই প্রতীকী ভাবনায় পদ্মের মতো জলের গভীরতা থেকে উদ্ভাসিত হবেন আদ্যাশক্তি মা দুর্গা—এমন পরিকল্পনাই রয়েছে আয়োজকদের।
এই ভাবনাকে বাস্তব রূপ দিতে মণ্ডপের স্থাপত্য ও সাজসজ্জায় তৈরি করা হচ্ছে জলের ঢেউ ও জলজ প্রকৃতির অনুকরণে এক বৃহৎ শিল্পকাঠামো। পরিবেশবান্ধব উপকরণ হিসেবে বাঁশ, বেত, প্রাকৃতিক তন্তু ও চট ব্যবহার করা হবে। বহুস্তরীয়, ঢেউখেলানো নকশায় এমন এক আবহ তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে, যা দর্শনার্থীদের চারপাশে বিশাল জলতরঙ্গের অনুভূতি সৃষ্টি করবে।
মণ্ডপের প্রবেশপথ থেকে ভেতরের মূল উপাসনাস্থল পর্যন্ত দর্শনার্থীদের যাত্রাকে সাজানো হচ্ছে একটি বিশেষ অভিজ্ঞতা হিসেবে। প্রকৃতির উত্তাল তরঙ্গ পেরিয়ে শান্তির দিকে এগিয়ে যাওয়ার অনুভূতি তৈরি করবে এই নকশা। জলপ্রপাত, প্রতিবিম্ব সৃষ্টিকারী জলাধার ও আলোকসজ্জার সমন্বয়ে গড়ে তোলা হবে পরিবর্তনশীল এক দৃশ্যপট। মণ্ডপের কেন্দ্রে থাকবে বৃহৎ পদ্মাকৃতির স্থাপত্য, যার মধ্য দিয়ে জলের গভীরতা থেকে পদ্মের প্রস্ফুটনের মতো আবির্ভূত হবেন দেবী দুর্গা।
তবে ‘জলজ’ কেবল ধর্মীয় অনুভূতি ও নান্দনিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে পরিবেশ রক্ষার বার্তাও। জলবায়ু পরিবর্তন, নদী দখল ও দূষণের কারণে পৃথিবীর জলচক্র আজ নানা সংকটের মুখে। নদীমাতৃক বাংলাদেশের জন্য জলসম্পদের সুরক্ষা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। জলকে সম্মান করা, নদী ও জলাশয় রক্ষা করা এবং পানিদূষণ রোধ করা মানে শুধু প্রকৃতিকে রক্ষা করা নয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জীবনও সুরক্ষিত করা।
আয়োজকদের ভাবনায়, ‘জলজ’ কোনো ভীতির বার্তা নয়; বরং প্রকৃতির প্রতি ভালোবাসা, জীবনের প্রতি শ্রদ্ধা এবং পরিবেশ রক্ষায় সম্মিলিত দায়বদ্ধতার আহ্বান। জল, পদ্ম, পবিত্র বারিধারা ও মানুষের তৃষ্ণার প্রতীকী উপস্থাপনার মধ্য দিয়ে তাঁরা তুলে ধরতে চান সৃষ্টির শক্তি ও জীবনের প্রতি মমত্ববোধের কথা।
দেবী দুর্গার কাছে তাঁদের প্রার্থনা—পৃথিবীকে তৃষ্ণামুক্ত করা, জীবন ও প্রকৃতিকে রক্ষা করা এবং মানবজাতিকে ধ্বংসের পরিবর্তে সৃষ্টির শক্তিতে বলীয়ান করা।
শারদোৎসব ১৪৩৩ উপলক্ষে বনানীর কামাল আতাতুর্ক পার্কে গুলশান-বনানী সার্বজনীন পূজা ফাউন্ডেশনের আয়োজনে এই পূজায় ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সর্বস্তরের মানুষকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।
‘জলজ’—জীবন, সৃষ্টি ও প্রকৃতির প্রতি শ্রদ্ধায় এক আনন্দময় শারদোৎসব।
মতামত দিন