Views Bangladesh Logo

বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটে বাংলাদেশ: সামলাতে সরকারের ৭ পদক্ষেপ

বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটে অন্যতম ক্ষতিগ্রস্ত দেশ হতে পারে বাংলাদেশ, এমনটিই বলা হয়েছে টেলিগ্রাফের এক প্রতিবেদনে। ঢাকায় ইতোমধ্যে এ পরিস্থিতির প্রভাব স্পষ্ট। পেট্রল পাম্পে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়াতে হচ্ছে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সীমিত কার্যক্রমের পরামর্শ দেয়া হয়েছে, এবং সরকারি কর্মকর্তাদের দিনের বেলায় বিদ্যুৎ ব্যবহারে সীমাবদ্ধতা দেওয়া হয়েছে। রাজধানীতে গণপরিবহন কমে গেছে, ডেলিভারি কর্মীরা বসে থাকছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাজধানীর স্বাভাবিক জীবন প্রায় থমকে গেছে।

বাংলাদেশ তেল ও গ্যাসের চাহিদার প্রায় ৯৫ শতাংশ আমদানি করে, যার দুই-তৃতীয়াংশ আসে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ইরাকসহ উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে। টেলিগ্রাফ জানাচ্ছে, চলতি মাসে বাংলাদেশ প্রায় ১ লাখ ৭০ হাজার টন অপরিশোধিত তেল ও ডিজেল আমদানি করেছে, যেখানে গত বছরের একই সময়ে ছিল ৩ লাখ ৩২ হাজার টন। অর্থাৎ আমদানি প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে।

মার্চের শেষ দিকে রাষ্ট্রীয় পেট্রোলিয়াম রিফাইনারি ইস্টার্ন রিফাইনারিতে প্রায় ৮০ হাজার টন অপরিশোধিত তেল মজুদ ছিল, যা দিয়ে মাত্র ১৭ দিন চলা সম্ভব। ডিজেল ও পেট্রলের মজুদও একইভাবে সীমিত। ফলে নতুন জ্বালানি সংগ্রহে সরকার বিশ্বজুড়ে তৎপরতা চালাচ্ছে।

সাধারণ মানুষের ভোগান্তি
সংকটের সবচেয়ে বড় আঘাত পড়েছে সাধারণ মানুষের ওপর। রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে পেট্রল পাম্পগুলোতে ভোর থেকে দীর্ঘ লাইন লক্ষ করা যাচ্ছে। অনেক স্থানে দিনভর অপেক্ষা করেও তেল না পেয়ে খালি হাতে ফিরতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে।

চালকরা জানাচ্ছেন, স্টেশনে দীর্ঘ অপেক্ষার কারণে দিনের অর্ধেক সময় নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। আয় কমে গেছে প্রায় অর্ধেক। ছোট ব্যবসায়ীরা বলছেন, পণ্য পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় তাদের লাভের মার্জিন প্রায় শূন্যে নেমে এসেছে। কৃষি খাতেও সেচকাজ ব্যাহত হচ্ছে, কারণ ডিজেলচালিত সেচপাম্পে জ্বালানি সংকট প্রত্যন্ত অঞ্চলেও ছড়িয়ে পড়েছে।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশের এই সংকট কেবল বৈশ্বিক পরিস্থিতির প্রতিফলন নয়, বরং দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা কাঠামোগত দুর্বলতারও ফল। দেশীয় জ্বালানি উৎপাদন কার্যত নগণ্য হওয়ায় আমদানি-নির্ভরতা বাংলাদেশকে বৈশ্বিক বাজারের ওঠানামার সামনে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানে রেখেছে।

অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, ভর্তুকি দিয়ে দাম স্থিতিশীল রাখার কৌশল স্বল্পমেয়াদে কার্যকর হলেও দীর্ঘমেয়াদে সরকারের রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় চাপ তৈরি করবে। পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বিনিয়োগ না বাড়ালে ভবিষ্যতে এই ধরনের সংকট আরও ঘন ঘন আসতে পারে বলে সতর্ক করছেন তারা।

এদিকে তেলের অপচয় রোধে ভারতে লকডাউনের আলোচনা চলছে। ফিলিপাইনে জ্বালানি সংকট ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে — ৩৬৫টি পেট্রোল পাম্প বন্ধ হয়ে গেছে এবং তেলের দাম দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে। ভারত, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কাও তেল সংকটে সরকারি ছুটি বাড়িয়েছে। অস্ট্রেলিয়া প্রাইভেট গাড়ির ব্যবহার কমাতে গণপরিবহন বিনামূল্যে করে দিয়েছে।

সরকারের বয়স যখন দেড় মাস, বৈশ্বিক রাজনৈতিক সংকটে বৃহৎ অর্থনীতির দেশগুলো যখন তেল সংকটে জর্জরিত, তখন বাংলাদেশে কিছু সংকট দৃশ্যমান হলেও তা চরম আকার ধারণ করেনি। এর পেছনে রয়েছে সরকারের ৭ কার্যকর পদক্ষেপ—

১. রেশনিং পদ্ধতি চালু
সংকটকালীন সময়ে প্রতিটি যানবাহনের ধরন অনুযায়ী নির্দিষ্ট পরিমাণ তেল সরবরাহের নিয়ম চালু করা হয়েছে, যাতে সবাই কিছুটা হলেও জ্বালানি পেতে পারে।

২. 'ট্যাগ অফিসার' নিয়োগ
বিভিন্ন জেলায় পেট্রোল পাম্পে তেল সরবরাহ ও বিক্রি তদারকির জন্য সরকার ট্যাগ অফিসার নিয়োগ দিয়েছে। তাদের কাজ হলো তেল সরবরাহে অনিয়ম, অতিরিক্ত মজুত বা কালোবাজারি পর্যবেক্ষণ করা।

৩. ফুয়েল কার্ড চালুর উদ্যোগ
তেল বিতরণে স্বচ্ছতা আনতে সরকার ফুয়েল কার্ড চালুর পরিকল্পনা নিয়েছে। নির্দিষ্ট যানবাহন বা প্রতিষ্ঠানের কার্ডের মাধ্যমে কেবল নির্ধারিত পরিমাণ তেল নেওয়া যাবে।

৪. তেলের মূল্য নিয়ন্ত্রণ ও ভর্তুকি
আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লেও দেশের বাজারে হঠাৎ মূল্যবৃদ্ধি ঠেকাতে সরকার প্রতিদিন ১৬৭ কোটি টাকা ভর্তুকি দিয়ে জ্বালানির দাম স্থিতিশীল রাখার চেষ্টা করছে।

৫. চুরি ও কালোবাজারি রোধে অভিযান
তেল চুরি ও কালোবাজারি ঠেকাতে সরকার কঠোর নজরদারি শুরু করেছে। দেশজুড়ে অভিযানে অবৈধভাবে মজুত করা ২ লাখ ৮ হাজার লিটার তেল উদ্ধার করা হয়েছে এবং সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

৬. জ্বালানি সাশ্রয়ের উদ্যোগ
জ্বালানি ব্যবহার কমাতে সাপ্তাহিক ছুটি বাড়ানো, অনলাইন ক্লাস চালু এবং হোম অফিসের মতো পদক্ষেপ বিবেচনা করা হচ্ছে। এতে যানবাহনের চলাচল কমিয়ে তেলের ব্যবহার কমানো সম্ভব হবে।

৭. বিকল্প উৎস থেকে তেল আমদানি
সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশ ভারত থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ডিজেল আমদানি করেছে। পাশাপাশি তুলনামূলক কম দামে জ্বালানি সংগ্রহে রাশিয়া থেকে ছয় লাখ মেট্রিক টন ডিজেল আমদানির পরিকল্পনাও করা হচ্ছে।

টেলিগ্রাফের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নতুন চালান আসার সম্ভাবনা থাকায় পুরোপুরি জ্বালানি শেষ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি এখনই নিশ্চিত নয়। যদিও শিল্প খাতের সূত্রগুলো বলছে, কিছু অনানুষ্ঠানিক সিন্ডিকেট সরবরাহ আটকে রেখে সংকটকে আরও বাড়িয়ে তুলছে।

ভবিষ্যৎ পরিস্থিতির পূর্বাভাস
বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, আগামী কয়েক মাস বাংলাদেশের জন্য আরও কঠিন হতে পারে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম যদি আরও বাড়ে, তাহলে ভর্তুকি চালিয়ে যাওয়া সরকারের পক্ষে ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়বে।
তবে কিছুটা আশার আলোও রয়েছে। রাশিয়া থেকে তুলনামূলক কম দামে ছয় লাখ মেট্রিক টন ডিজেল আমদানির পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে স্বল্পমেয়াদে চাপ কমতে পারে। পাশাপাশি নতুন চালান আসার সম্ভাবনা থাকায় পুরোপুরি জ্বালানি ফুরিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা এখনই নিশ্চিত নয় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

তবে দীর্ঘমেয়াদী সমাধানের জন্য বিশেষজ্ঞরা সৌরশক্তি ও নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বড় বিনিয়োগ, আঞ্চলিক জ্বালানি সহযোগিতা জোরদার এবং দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে গতি আনার পরামর্শ দিচ্ছেন। না হলে প্রতিটি বৈশ্বিক সংকটে বাংলাদেশকে একই চক্রের মধ্যে ঘুরতে হবে।

টেলিগ্রাফের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, কিছু অনানুষ্ঠানিক সিন্ডিকেট সরবরাহ আটকে রেখে সংকটকে আরও বাড়িয়ে তুলছে। এই পরিস্থিতিতে সরকারের দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদী জ্বালানি নীতি প্রণয়নই পারে বাংলাদেশকে ভবিষ্যতের সংকট থেকে রক্ষা করতে।

মতামত দিন

মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে

ট্রেন্ডিং ভিউজ