মহাকাশে ডেটা সেন্টারের পথে গুগল, ১ অক্টোবর কক্ষপথে যাচ্ছে এআই চিপবাহী স্যাটেলাইট
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই চালাতে পৃথিবীতে বিদ্যুতের যে তীব্র চাহিদা তৈরি হয়েছে, তার সমাধান খুঁজতে এবার মহাকাশের দিকে হাত বাড়িয়েছে প্রযুক্তি জায়ান্ট গুগল। প্রতিষ্ঠানটির “প্রজেক্ট সানক্যাচার”-এর প্রথম প্রোটোটাইপ স্যাটেলাইট আগামী ১ অক্টোবর যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার ভ্যান্ডেনবার্গ স্পেস ফোর্স বেস থেকে স্পেসএক্সের Transporter-18 মিশনে কক্ষপথে পাঠানোর কথা রয়েছে।
২৪ সেপ্টেম্বর এ ঘোষণা দেন গুগলের প্রধান নির্বাহী সুন্দর পিচাই। পুরো প্রকল্পকে তিনি একটি প্রশ্নে বেঁধে দিয়েছেন: গুগলের এআই চিপ মহাকাশে টিকে থেকে কাজ করতে পারবে কি-না।
ফ্রিজ আকারের স্যাটেলাইটে চারটি এআই চিপ
মার্কিন স্যাটেলাইট নির্মাতা প্রতিষ্ঠান প্ল্যানেট (Planet)-এর সঙ্গে যৌথভাবে তৈরি প্রোটোটাইপটি আকারে মোটামুটি একটি রেফ্রিজারেটরের সমান। এতে রয়েছে গুগলের নিজস্ব নকশার চারটি ট্রিলিয়াম (Trillium) প্রজন্মের টেনসর প্রসেসিং ইউনিট (TPU)। স্যাটেলাইটটির অভ্যন্তরীণ নাম দেওয়া হয়েছে “MVP” বা মিনিমাম ভায়াবল প্রোডাক্ট।
এর সম্মিলিত কম্পিউটিং সক্ষমতা পৃথিবীর একটি ডেটা সেন্টার সার্ভারের সমান। সৌর প্যানেল থেকে এটি প্রায় ১ কিলোওয়াট বিদ্যুৎ পাবে। স্যাটেলাইটটির কার্যকাল ধরা হয়েছে প্রায় এক বছর। তবে বায়ুমণ্ডলে ফিরে আসার আগে এটি ছয় বছর পর্যন্ত কক্ষপথে থাকতে পারে।
গুগল স্পষ্ট করে জানিয়েছে, এটি কোনো পূর্ণাঙ্গ কক্ষপথ-ডেটা সেন্টার নয়, বরং প্রযুক্তিগত সক্ষমতার প্রাথমিক পরীক্ষা।
কেন মহাকাশে
এআই ডেটা সেন্টারের বিদ্যুৎ চাহিদা যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়া থেকে আয়ারল্যান্ড পর্যন্ত বিভিন্ন দেশের বিদ্যুৎ গ্রিডে চাপ সৃষ্টি করছে। বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো ২০২৬ সালজুড়ে গিগাওয়াট মাত্রার বিদ্যুৎ নিশ্চিত করার প্রতিযোগিতায় রয়েছে।
গুগলের যুক্তি, কক্ষপথে থাকা স্যাটেলাইট প্রায় নিরবচ্ছিন্ন সূর্যালোক পায় এবং পৃথিবীর তুলনায় আট গুণ পর্যন্ত বেশি সৌরশক্তি উৎপাদন করতে পারে। এ কারণে স্যাটেলাইটটি পাঠানো হচ্ছে “ভোর-সন্ধ্যা” সূর্য-সমলয় নিম্ন কক্ষপথে, যেখানে এটি প্রায় সব সময় সূর্যের আলোয় থাকবে।
তিন বড় চ্যালেঞ্জ
প্রকল্পটির সামনে প্রথম পরীক্ষা উৎক্ষেপণের ধাক্কা সামলানো। নিম্ন কক্ষপথে পৌঁছাতে প্রায় ১০ মিনিট সময় লাগে। এ সময় ত্বরণ মাধ্যাকর্ষণের ১০ গুণ পর্যন্ত পৌঁছায়, আর চিপের মতো আলাদা যন্ত্রাংশে ৫০ থেকে ১০০ গুণ পর্যন্ত চাপ পড়তে পারে। গুগল জানিয়েছে, তিন অক্ষে কম্পন পরীক্ষায় স্যাটেলাইটটি সফলভাবে টিকে গেছে।
দ্বিতীয় চ্যালেঞ্জ বিকিরণ। সৌরঝড় ও মহাজাগতিক রশ্মি কম্পিউটারের তথ্য বদলে দিয়ে হিসাব নষ্ট করতে পারে। এটি যাচাইয়ে গুগল যুক্তরাষ্ট্রের ইউসি ডেভিসের ক্রকার নিউক্লিয়ার ল্যাবরেটরিতে প্রোটন বিমের মধ্যে চিপগুলোতে এআই কাজ চালিয়েছে। পরীক্ষায় দেখা গেছে, পাঁচ বছরের মহাকাশ মিশনে যে মাত্রার বিকিরণ হয়, তার চেয়েও বেশি সহ্য করেছে ট্রিলিয়াম (Trillium) চিপ।
তৃতীয় চ্যালেঞ্জ তাপ ব্যবস্থাপনা। মহাকাশে বাতাস না থাকায় চিপের তাপ বাইরে বের করে দেওয়ার প্রচলিত পদ্ধতি সেখানে কাজ করে না।
দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা
গুগল প্রজেক্ট সানক্যাচার প্রথম ঘোষণা করে ২০২৫ সালের ৪ নভেম্বর। প্রাথমিক পরিকল্পনা ছিল ২০২৭ সালের শুরুতে দুটি প্রোটোটাইপ স্যাটেলাইট পাঠানো। সেই সময়সূচির আগেই এখন প্রথম পরীক্ষা হচ্ছে।
প্রকল্পের দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য প্রায় ৮১টি স্যাটেলাইটের একটি সমন্বিত নেটওয়ার্ক, যেগুলো নিজেদের মধ্যে লেজারভিত্তিক উচ্চগতির যোগাযোগে যুক্ত থাকবে। এই লেজার সংযোগ পরীক্ষার জন্য ২০২৭ সালে দুটি স্যাটেলাইটের একটি মিশনও পরিকল্পনায় রয়েছে।
তবে কক্ষপথের এআই কম্পিউটিং কবে বাস্তব কাজে ব্যবহার হবে, তার কোনো সময়সীমা এখনো নির্ধারিত হয়নি। Transporter-18 মিশনের উদ্দেশ্য মৌলিক কিছু প্রশ্নের উত্তর খোঁজা: চিপগুলো উৎক্ষেপণের ধাক্কা সইতে পারবে কি-না, মাসের পর মাস বিকিরণের মধ্যে নির্ভরযোগ্যভাবে কাজ করবে কি-না এবং কার্যকরভাবে ঠান্ডা রাখা যাবে কি না।
প্রযুক্তি বিশ্লেষকদের মতে, এই উড্ডয়ন সফল হলেও তা প্রমাণ করবে না যে মহাকাশে এআই কম্পিউটিং খরচের দিক থেকে পৃথিবীর ডেটা সেন্টারের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে পারবে।
মতামত দিন