Views Bangladesh Logo

গোলাম সারওয়ারঃ আলোর পথযাত্রী এক সম্পাদক

Rahat  Minhaz

রাহাত মিনহাজ

রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ (Fourth Estate or fourth power) হিসেবে সংবাদপত্র বা সংবাদমাধ্যমের দায়িত্ব অপরিসীম। সংবাদমাধ্যম যেমন কোনো ঘটনাকে বস্তুনিষ্ঠভাবে পাঠকের সামনে তুলে ধরে, আবার তেমনি কোনো আন্দোলন-সংগ্রাম বা সন্ধিক্ষণে নৈতিক অবস্থানের প্রেক্ষাপটে জনমত তৈরি করতে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। যার মাধ্যমে অনেক সময় গণমাধ্যম গণমানুষের কণ্ঠস্বরে পরিণত হয়।

১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের খবর প্রকাশে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল ইংরেজি দৈনিক দ্যা পিপল। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণের পরদিন দৈনিক ইত্তেফাক শিরোনাম করেছিল—‘পরিষদে যাওয়ার প্রশ্ন বিবেচনা করিতে পারি, যদি..’। আর দ্যা পিপল-এর শিরোনাম ছিল—‘Withdraw this barbarous alien army’.

এ ছাড়াও ২৫ মার্চের ক্র্যাকডাউনের আগ পর্যন্ত পত্রিকাটির শিরোনাম ও কার্টুনে বাঙালি জাতির আকাঙ্ক্ষার পরিপূর্ণ প্রতিফলন ছিল। যে কারণেই দ্যা পিপল-এর এই ভূমিকা আজও আলোচিত হয় শ্রদ্ধার সাথে। সেই সময়ে দ্যা পিপল-এর মূল ব্যক্তি ছিলেন বার্তা সম্পাদক আনোয়ার জাহিদ। তাঁর পরিকল্পনা ও তত্ত্বাবধানেই পত্রিকাটি প্রকাশিত হতো। যে কারণে বার্তা সম্পাদক আনোয়ার জাহিদ আজও শ্রদ্ধার সাথে আলোচিত হন সাংবাদিকতা পরিসরে।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে গণজাগরণ মঞ্চের উত্থান এক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। নির্দলীয় এই আন্দোলন সারাদেশে ব্যাপক সাড়া ফেলেছিল। যার প্রভাব বাংলাদেশের রাজনীতিতে এখনও বিদ্যমান। ২০১৩ সালের পাঁচ ফেব্রুয়ারি জামায়াত নেতা যুদ্ধাপরাধী কাদের মোল্লাকে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের রায়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন আদালত। মিরপুর এলাকায় গণহত্যার অভিযোগসহ মোট ৬টি অভিযোগের মধ্যে পাঁচটিতে তাকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছিল। কিন্তু সাজা হয়েছিল যাবজ্জীবন! এই রায় বাংলাদেশের মানুষ মেনে নিতে পারেনি।

বিশেষ করে পরের দিন পত্রিকাতে কাদের মোল্লার ‘বিজয় চিহ্ন প্রদর্শন’ ছবি প্রকাশিত হলে সারাদেশে ক্ষোভের আগুন ছড়িয়ে পড়ে। একদল তরুণ অনলাইন অ্যাকটিভিস্ট রাজধানীর শাহবাগে রাস্তায় অবরোধ করে এর প্রতিবাদ জানাতে শুরু করেন। মুহূর্তেই দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে এই আন্দোলন। মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে এই আন্দোলনে বিশেষ ভূমিকা রেখেছিল দেশের গণমাধ্যম। যার অগ্রভাগে ছিল সর্বজন শ্রদ্ধেয় সমকাল সম্পাদক গোলাম সারওয়ার। যিনি অসংকোচ প্রকাশে দুরন্ত সাহস দেখিয়েছিলেন।

‘এই রায় মানি না’
সাংবাদিকতা নীতিমালার অন্যতম প্রধান অনুষঙ্গ হলো আদালতের উপর আস্থা রাখা। আদালতের রায়কে সম্মান জানানো। তাই এ-সংক্রান্ত সংবাদ প্রকাশের ক্ষেত্রে সংবাদমাধ্যমকে বিশেষভাবে সতর্ক থাকতে হয়। শুধু তাই নয়, গণমাধ্যমের ভাষায় আদালতকে উত্তম পুরুষে ‘আপনি’ বলে সম্বোধন করা হয়ে থাকে। মোদ্দা কথা, রাষ্ট্রকাঠামোয় সংবিধান অনুযায়ী আদালতের অবস্থান সবার উপর। তাই আদালতকে বা আদালতের রায়কে সম্মান জানানো অবশ্য কর্তব্য।

যুদ্ধাপরাধী কাদের মোল্লার প্রথম রায় ঘোষণার পর দ্রুতই তীব্র জনরোষ তৈরি হয়েছিল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুরু হয় তীব্র প্রতিবাদ। সচেতন মানুষ ব্যথিত হন, ক্ষুব্ধ হন। এমনই এক সময়ে দেশের প্রথম সারির দৈনিক সমকাল ছাপে সবচেয়ে সাহসী শিরোনাম—‘এই রায় মানি না’। একেবারে সরাসরি নাকচ!

যদিও অন্য প্রথম সারির সংবাদপত্রগুলোর শিরোনাম ছিল অনেকটা সাদামাটা। দৈনিক প্রথম আলোর শিরোনাম—‘মৃত্যুদণ্ড না হওয়ায় হতাশা, ক্ষোভ’। The Daily Star ছাপে ‘Qader Mollaha Get Life Term’ ও ‘Disappointment’ শিরোনামে খবর। এছাড়া অন্যান্য পত্রিকাও তাদের মতো করে অনেকটা সাবধানী ঢঙে সংবাদ প্রকাশ করে। কিন্তু ওই দিন সবার নজর কাড়ে কাদের মোল্লার রায় ঘিরে সমকালের ব্যানার শিরোনামটি। যা পাঠককে বিশেষভাবে আকৃষ্ট করে।

আদালতের এই একটি রায় ঘিরে এমন একটি কালোত্তীর্ণ শিরোনামের পেছনের কাহিনী শুনেছিলাম দৈনিক সমকালের জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক, পত্রিকাটির ডেপুটি এডিটর অজয় দাশগুপ্তের কাছ থেকে। ওই দিনের ঘটনা উল্লেখ করতে গিয়ে তিনি জানান, সারওয়ার ভাই সাধারণত দীর্ঘ সময় অফিসে থাকতেন। পত্রিকা প্রেসে যাওয়ার আগ পর্যন্ত সবকিছু দেখভাল করতেন।

ওই দিন সমকালের প্রস্তাবিত শিরোনাম ছিল অনেকটা সাদামাটাই। কিন্তু সময় যতই গড়িয়েছে, রাজনৈতিক গতিপ্রকৃতিও পরিবর্তিত হয়েছে দ্রুত। সম্পাদক গোলাম সারওয়ার এই শিরোনাম চূড়ান্ত করেন অনেক রাতে, একেবারে শেষ সময়ে। এর আগে তিনি কাদের মোল্লার রায় নিয়ে জনসাধারণের মনোভাব ও রাজনৈতিক গতিপ্রকৃতি নিয়ে খোঁজখবর নেন। সবশেষ পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে তিনি চূড়ান্ত করেন সেই কালোত্তীর্ণ শিরোনাম—‘এই রায় মানি না’।

বাংলাদেশের গণমাধ্যমে গোলাম সারওয়ারের বিশেষত্ব ছিল যুতসই শিরোনাম লেখায়। সাংবাদিক জীবনে তিনি অসাধারণ সব শিরোনাম লিখেছেন। কার্যকর, পাঠকনন্দিত শিরোনাম কেমন হতে পারে, তার নমুনা পাওয়া যায় গণজাগরণ মঞ্চ পরবর্তী সমকাল শিরোনামে। কখনও সম্পাদক গোলাম সারওয়ার একেবারে নিজে এসব লিখেছেন। অথবা কখনও সহকর্মী বার্তা সম্পাদকদের লেখা শিরোনাম ঠিকঠাক করে দিয়েছেন।

দৈনিক সমকালে গণজাগরণ মঞ্চ সংক্রান্ত সংবাদের শিরোনাম
৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৩ ‘এই রায় মানি না’
৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৩ ‘শাহবাগ যেন তাহরির স্কয়ার’
৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৩ ‘উত্তাল শাহবাগ উত্তাল দেশ’
৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৩ ‘চরম হুঁশিয়ারি’
১০ ফেব্রুয়ারি ২০১৩ ‘শাহবাগে জাগ্রত জনতা’
১১ ফেব্রুয়ারি ২০১৩ ‘শাহবাগ বাংলাদেশের হৃদয়’
১২ ফেব্রুয়ারি ২০১৩ ‘জেগে থাকো বন্ধুরা’
১৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৩ ‘নিরবতায় বজ্রশপথ’
১৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৩ ‘ফাগুনে প্রতিবাদের আগুন’
১৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৩ ‘আলোর পথযাত্রী’ ‘আলোর পথযাত্রী’

যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবির প্রেক্ষাপটে শহীদ জননী জাহানারা ইমামের অবদান অনস্বীকার্য। তাঁর নেতৃত্বে পরিচালিত আন্দোলনের ফল হিসেবে ১৯৯২ সালের ২৬ মার্চ গঠিত হয়েছিল গণআদালত। যে আদালত শীর্ষ জামায়াত নেতা গোলাম আযমকে দোষী সাব্যস্ত করে তার মৃত্যুদণ্ডের রায় দিয়েছিল।

গণজাগরণ মঞ্চের নানা কার্যক্রমের মধ্যে শাহবাগে শহীদ জননীর এক বিশাল প্রতিকৃতি স্থাপিত হয় ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৩। এরপর ১৪ ফেব্রুয়ারি গণজাগরণ মঞ্চের মোমবাতি প্রজ্বলন কর্মসূচি ছিল।

দৈনিক সমকাল এই মোমবাতি প্রজ্বলন নিয়ে একটি ভিন্ন ধরনের কাভার করে। পুরো প্রথম পাতাজুড়ে শুধুই একটা ছবি। জ্বলন্ত প্রদীপ আর তার মাঝে আলোকউজ্জ্বল শহীদ জননী জাহানারা ইমাম। অসাধারণ একটি পৃষ্ঠাসজ্জা। যে মেকআপ হয়েছিল গোলাম সারওয়ারের নির্দেশে। গণজাগরণ মঞ্চ নিয়ে এই মেকআপ বা পৃষ্ঠাসজ্জা নিঃসন্দেহে বেশ সাড়া ফেলেছিল। সমকাল যার টাইটেল দিয়েছিল ‘আলোর পথযাত্রী’।

দৈনিক সমকালের তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মুস্তাফিজ শফি বাংলাদেশ প্রেস ইন্সটিটিউট আয়োজিত গোলাম সারওয়ারের এক স্মরণসভায় বলেছিলেন আলোর পথযাত্রী কাভারের পেছনের কাহিনী।

মোস্তাফিজ শফি জানান, এক ছবিতে পুরো প্রথম পাতা করার ধারণা তারা পেয়েছিলেন লন্ডনভিত্তিক গার্ডিয়ান পত্রিকার একটি কাভার থেকে। লন্ডন অলিম্পিক উপলক্ষ্যে গার্ডিয়ান শুধু আলোকসজ্জা দিয়ে একটি দুর্দান্ত কাভার করেছিল। যাতে ছিল শুধুই বাতির ছবি। আলোর খেলা। আর কিছু নয়। ওই ধারণাটিই সমকালে কার্যকর করেন গোলাম সারওয়ার। যার ফলাফল—‘আলোর পথযাত্রী’।

একজন বর্ষীয়ান সম্পাদক গোলাম সারওয়ার গণজাগরণ মঞ্চের এই আন্দোলনের সাথে নিজেকে একাত্ম করেছিলেন। পত্রিকায় যথাযথ প্রতিবেদন ও ছবি প্রকাশ করে জনমত তৈরির পাশাপাশি তিনি নিজেও কলম ধরেছেন। ২০১৩ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি সমকালে প্রকাশিত হয় তাঁর বিশেষ কলাম ‘অভিবাদন বন্ধুরা’। যাতে অভূতপূর্ব এই গণআন্দোলনের জন্য তিনি তরুণ প্রজন্মকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন। প্রজন্মের নতুন যোদ্ধাদের প্রতি জানিয়েছেন অকুণ্ঠ সমর্থন।

একজন ভালো সম্পাদক, একজন সংবেদনশীল সম্পাদক হিসেবে গণজাগরণ মঞ্চের ঘটনাপ্রবাহ তিনি যেভাবে প্রকাশ ও মূল্যায়ন করেছেন, তা এক কথায় অসাধারণ। কালোত্তীর্ণ।

বিনম্র শ্রদ্ধা গোলাম সারওয়ারের প্রতি।
শেষ।
(লেখক: প্রভাষক, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়)

মতামত দিন

Avatar

ট্রেন্ডিং ভিউজ