বর্ষা উদযাপন ও বন্যার্তদের সহায়তায় চারুকলায় ‘ঘনঘটা ২’
বর্ষা মানেই জলাবদ্ধতা, যানজট কিংবা ভোগান্তি—এমন প্রচলিত ধারণার বাইরে গিয়ে ঋতুটির সাংস্কৃতিক সৌন্দর্য উদযাপনের লক্ষ্যে শুক্রবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের বকুলতলায় অনুষ্ঠিত হয়েছে নৃত্যানুষ্ঠান 'ঘনঘটা ২'। বর্ষার আবহ, রবীন্দ্রসংগীতের সুর আর তিন শতাধিক নৃত্যশিল্পীর প্রাণবন্ত পরিবেশনায় মুখর হয়ে ওঠে পুরো আয়োজনস্থল। সকাল ১১টা থেকে দুপুর সাড়ে ১২টা পর্যন্ত চলে এই অনুষ্ঠান।
একুশে পদকপ্রাপ্ত নৃত্যশিল্পী ও কোরিওগ্রাফার অর্থী আহমেদের উদ্যোগে তার ড্যান্স একাডেমি এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের যৌথ আয়োজনে অনুষ্ঠিত এই উৎসবে ৩ থেকে ৭০ বছর বয়সী ৩০০-এর বেশি নৃত্যশিল্পী অংশ নেন। শিশু থেকে প্রবীণ—বিভিন্ন বয়স ও পেশার অংশগ্রহণকারীদের উপস্থিতিতে বকুলতলা পরিণত হয় এক প্রাণবন্ত সাংস্কৃতিক মিলনমেলায়। ৯০ মিনিটের এই আয়োজনে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম ও বাংলার লোকঐতিহ্য থেকে অনুপ্রাণিত মোট ১৬টি নৃত্য পরিবেশনা উপস্থাপন করা হয়। খোলা আকাশের নিচে বর্ষার আবহে একের পর এক পরিবেশনায় মুগ্ধ হন উপস্থিত দর্শকেরা, যাঁদের অনেকেই আয়োজকদের আহ্বানে সাড়া দিয়ে সাদা, নীল ও সবুজ রঙের পোশাকে অনুষ্ঠানে অংশ নেন।
অর্থী আহমেদ বলেন, প্রায় চার মাস আগে থেকেই অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি শুরু হয়েছিল, তবে সাম্প্রতিক বন্যার পর আয়োজকেরা মনে করেন এমন দুর্যোগকে উপেক্ষা করা যায় না। শিল্পী হিসেবে সমাজের প্রতি নিজেদের একটি দায়িত্ব আছে বলে মন্তব্য করে তিনি জানান, বর্ষা উদযাপনের পাশাপাশি বন্যাকবলিত মানুষের পাশে দাঁড়ানোরও চেষ্টা করছেন তারা।
এবারের আয়োজনের একটি বিশেষ দিক ছিল পার্বত্য চট্টগ্রামের সাম্প্রতিক বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য তহবিল সংগ্রহ। জাগো ফাউন্ডেশনের সহযোগিতায় ভেন্যুতে দুটি অনুদান বুথ স্থাপন করা হয়, যেখানে দর্শনার্থীরা স্বেচ্ছায় অনুদান দিয়ে বন্যার্ত মানুষের পাশে দাঁড়ান। এ ছাড়া অর্থী আহমেদ ড্যান্স একাডেমির সদস্যরাও ব্যক্তিগতভাবে অনুদান দেবেন বলে জানা গেছে।
নগরজীবনে বর্ষা এখন অনেকের কাছে জলাবদ্ধতা ও যানজটের প্রতীক হয়ে উঠলেও বাংলার সংস্কৃতিতে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এই ঋতু উৎসবেরই অংশ—সেই সাংস্কৃতিক চেতনাকে নতুন করে সামনে আনতেই এই আয়োজন বলে জানান অর্থী আহমেদ। তহবিল সংগ্রহের পরিমাণ হয়তো খুব বেশি হবে না উল্লেখ করে তিনি বলেন, সংকটের সময়ে শিল্পীদের নির্লিপ্ত থাকার সুযোগ নেই, শেষ পর্যন্ত কতটা সহায়তা করা যাবে তা নিশ্চিত না জানলেও উদাসীন থাকা কোনো বিকল্প হতে পারে না।
'ঘনঘটা শুধু একটি নৃত্যানুষ্ঠান নয়; এটি মানুষের মনের ভেতরে লালিত স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার একটি মঞ্চ। এখানে বয়স কোনো বাধা নয়,' বলেন অর্থী আহমেদ। বর্ষাকে বাংলার সংস্কৃতি ও মানুষের মিলনের উৎসব হিসেবে উদযাপন করতেই এই আয়োজন বলে জানান তিনি।
'ঘনঘটা ২' একুশে পদক পাওয়ার পর অর্থী আহমেদের একাডেমির প্রথম বড় আয়োজন। গত বছরের প্রথম 'ঘনঘটা' অনুষ্ঠানের বিপুল সাড়াই এবার আরও বড় পরিসরে আয়োজনের অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে বলে জানান তিনি।
আয়োজকদের তথ্য অনুযায়ী, এবারের উৎসবে চিকিৎসক, প্রকৌশলী, শিক্ষক, সাংবাদিক, গবেষক, বিজ্ঞানী, সমাজকর্মী, গৃহিণীসহ বিভিন্ন পেশার মানুষ নৃত্যশিল্পী হিসেবে অংশ নেন, যাঁদের অনেকেই জীবনে প্রথমবারের মতো বড় মঞ্চে নৃত্য পরিবেশন করেন।
মতামত দিন