ত্রাণবাহী জাহাজ আটকে দিল ইসরায়েল, দুর্ভিক্ষে মৃত্যুমুখে ৫ লাখ ফিলিস্তিনি
অবরুদ্ধ গাজাবাসীর জন্য ত্রাণসামগ্রী নিয়ে যাওয়া ফ্রিডম ফ্লোটিলা কোয়ালিশনের (এফএফসি) জাহাজ ‘হান্ডালা’ জব্দ এবং এর ২১ জন ক্রু সদস্যকে আটক করেছে ইসরায়েল। অন্যদিকে ইসরায়েলি হামলা ও খাদ্য সরবরাহে অবরোধের মুখে গাজায় অনাহার ও অপুষ্টিতে এ পর্যন্ত মারা গেছেন ১২৭ জন ফিলিস্তিনি, যাদের ৮৫ জনই শিশু।
অবরুদ্ধ উপত্যকাটির আরও প্রায় ৫ লাখ মানুষ ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের মুখোমুখি। আর ১৭ হাজারেরও বেশি শিশু তীব্র অপুষ্টিতে ভুগে মূমুর্ষু অবস্থায় ধুঁকছে। এ অবস্থায় হামলা শুরুর পর ২১ মাসেরও বেশি সময় ধরে ইসরায়েল ‘অনাহার সৃষ্টির মাধ্যমে জাতিগত নিধন’ চালাচ্ছে বলে অভিযোগ তুলে দেশটিকে তাৎক্ষণিক যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানিয়েছে জাতিসংঘসহ বিশ্ব সম্প্রদায়। আসন্ন মারাত্মক দুর্ভিক্ষের খবরে জরুরি পদক্ষেপ হিসেবে বেসামরিক দুর্ভোগ লাঘব এবং সাহায্য সরবরাহ নিশ্চিতেরও আহ্বান তাদের।
কাতারভিত্তিক গণমাধ্যম আল জাজিরা জানায়, শনিবার (২৫ জুলাই) স্থানীয় সময় রাত পৌনে ১২টার দিকে আন্তর্জাতিক অলাভজনক সংস্থা ফ্রিডম ফ্লোটিলার ত্রাণবাহী জাহাজ হান্দালাকে জব্দের পর জাহাজটিতে থাকা সব ক্যামেরা বন্ধ করে দিয়েছে ইসরায়েলি বাহিনী। এর পর থেকে জাহাজটির সঙ্গে সংস্থাটির আর কোনো যোগাযোগ নেই। বিবৃতিতে ফ্রিডম ফ্লোটিলা জানিয়েছে, জাহাজটির আরোহীদের ‘অপহরণ’ করে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। ওই সময় জাহাজটি গাজা উপকূল থেকে প্রায় ৪০ নটিক্যাল মাইল দূরে আন্তর্জাতিক জলসীমায় ছিল।
আলজাজিরার খবরে বলা হয়েছে, শুধু অনাহারেই এ পর্যন্ত মারা গেছেন ৮৫ জন শিশুসহ ১২৭ জন গাজাবাসী। ২৭ মে থেকে বিতর্কিত গাজা হিউম্যানিটারিয়ান ফাউন্ডেশনের (জিএইচএফ) ত্রাণকেন্দ্র থেকে খাবার সংগ্রহ করতে গিয়ে হত্যার শিকার হয়েছেন আরও এক হাজার ১২৫ জন এবং আহত হয়েছেন সাড়ে সাত হাজার জনেরও বেশি।
সর্বশেষ রোববার (২৭ জুলাই) খান ইউনিসের একটি সাহায্য কেন্দ্রের কাছে ইসরায়েলি বাহিনীর গুলিতে একজন ফিলিস্তিনি শিশু নিহত এবং বেশ কয়েকজন আহত হয়েছে। আগের (শনিবার) রাতভর উত্তর গাজার জিকিম ক্রসিংয়ের কাছে খাদ্যের সন্ধানে মরিয়া হয়ে ইসরায়েলি বাহিনীর গুলিতে নিহত হন কমপক্ষে ৪২ জন ফিলিস্তিনি। হাসপাতালগুলো জানিয়েছে, জিএইচএফের ত্রাণকেন্দ্রের আশেপাশের এই হামলায় আহত হন ১৫০ জনেরও বেশি মানুষ। ইসরায়েলি বাহিনী এর আগেও খাদ্য ট্রাকের জন্য অপেক্ষার সময় এই এলাকার লোকজনকে লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে। একই স্থানে শুক্রবার (২৫ জুলাই) ১২ জন এবং ২০ জুলাই নিহত হন আরও ২৬ জন ফিলিস্তিনি।
সব মিলিয়ে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর যুদ্ধ শুরুর পর থেকে কমপক্ষে ৫৯ হাজার ৭৩৩ জন ফিলিস্তিনি নিহত এবং এক লাখ ৪৪ হাজার ৯৬৫ জন আহত হয়েছেন বলে জানিয়ে ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর এই ধারাবাহিক আগ্রাসনকে ‘গণহত্যামূলক আক্রমণ’ বলে আখ্যা দিয়েছে হামাস নিয়ন্ত্রিত গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। বলেছে, এই সহিংসতা একদিকে যেমন প্রতিদিন অসংখ্য প্রাণ কেড়ে নিচ্ছে, তেমনি মানবিক সহায়তা পৌঁছানোও হয়ে উঠেছে প্রায় অসম্ভব।
গাজার সিভিল ডিফেন্স সংস্থা জানিয়েছে, জ্বালানি ও যন্ত্রাংশের অভাবে তারা শিগগিরই জরুরি সেবা কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ করতে বাধ্য হবে। বিবৃতিতে তারা বলেছে, জরুরি ভিত্তিতে আন্তর্জাতিক মহলকে হস্তক্ষেপ করতে হবে এবং দখলদার কর্তৃপক্ষের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে হবে, যেন অন্তত জীবনরক্ষাকারী সরঞ্জাম প্রবেশ করতে পারে।
চিকিৎসা সূত্রগুলো সতর্ক করে বলছে, গাজায় গণহারে অপুষ্টিজনিত মৃত্যুর আশঙ্কা এখন কেবল অনুমান নয়, বরং বাস্তবতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সংঘর্ষের পাশাপাশি অনাহারে মৃত্যু যেন দ্বিতীয় যুদ্ধ হয়ে দেখা দিয়েছে। শিশুদের মধ্যে চরম অপুষ্টির বিষয়ে সতর্কবার্তা দিয়ে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোও বলেছে, ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে সম্প্রতি মানবিক পরিস্থিতি ভীষণভাবে খারাপ হয়ে পড়েছে।
গাজায় জিএইচএফের ত্রাণকেন্দ্রগুলো পরিচালনা করছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। উপত্যকাটিতে টানা ১১ সপ্তাহের অবরোধের পর ২৬ মে ত্রান ও খাদ্য সরবরাহের একতরফা কর্তৃত্ব নিয়েছে সংস্থাটি। শুরু থেকেই সংস্থাটির কার্যক্রমের সমালোচনা করে আসছে জাতিসংঘসহ বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা। জিএইচএফের দেয়া খাবারের মান ও পরিমাণ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বরাতে গণমাধ্যম আনাদোলু এজেন্সি রোববার জানায়, গত ২৪ ঘন্টায় হাসপাতালগুলোতে অনাহার ও অপুষ্টিতে নতুন করে মারা গেছেন পাঁচজন। অনাহারে মারা যাওয়া সর্বশেষ শিশু হলেন জয়নব আবু হালিব। তার পরিবার জানিয়েছে, সে অপুষ্টিতে ভুগছিল এবং ফর্মুলা দুধ জোগাড় করতে না পারায় তার মৃত্যু হয়েছে। তারা খাবার ও চিকিৎসার অভাবে প্রতিদিন শিশুটিকে ধীরে ধীরে মারা যেতে দেখেছিলেন। হাসপাতালেও তার জন্য কোনো চিকিৎসা ব্যবস্থা ছিল না।
গাজায় ইসরায়েল ‘অনাহার তৈরি করে জাতিগত নিধন’ চালাচ্ছে বলে অভিযোগ তুলে খ্যাতনামা দুর্ভিক্ষ–বিশেষজ্ঞ ওয়ার্ল্ড পিস ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক অ্যালেক্স ডি ওয়াল বলেছেন, উপত্যকাটিতে অবরোধের মাধ্যমে এ পরিস্থিতির সৃষ্টি করা হয়েছে। প্রায় ৫ লাখ মানুষ ‘ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের’ মুখোমুখি বলে জানিয়ে গাজার মেডিকেল রিলিফের পরিচালক ডা. মোহাম্মদ আবু আফাশ বলেছেন, ইসরায়েল অবরুদ্ধ অঞ্চলে মানবিক অবরোধ অব্যাহত রাখায় উপত্যকার মোট ১৭ হাজার শিশু তীব্র অপুষ্টিতে ভুগছে।
আল জাজিরাকে তিনি বলেন, ‘কোনো খাবার বা পানীয় নেই এবং গত পাঁচ মাস ধরে কোনো সাহায্য সরবরাহ করা হয়নি।পরিস্থিতির দিন দিন অবনতি হচ্ছে এবং আমরা দুর্ভিক্ষের পঞ্চম পর্যায়ে আছি। বিশেষত, দুধের অভাব শিশুদের গুরুতর স্বাস্থ্য সমস্যা তৈরি করছে’। ‘যদি ওষুধ এবং চিকিৎসা সরবরাহ অবিলম্বে সরবরাহ না করা হয়, তাহলে মৃত্যুর হার আরও বাড়বে’- বলেন ডা. আফাশ। এদিকে চলমান ইসরায়েলি অবরোধে পর্যাপ্ত খাবার পেতে তাদের সংগ্রামের মর্মষ্পর্শী বর্ণনা দিয়েছেন গাজা শহরের একটি দাতব্য রান্নাঘরে খাবারের জন্য অপেক্ষারত ফিলিস্তিনিরাও।
সেখানকার নারী বাসিন্দা উম্মে আবদুল্লাহ বলেন, ‘এই আমার পাত্র, এতে এক টুকরোও নেই। আমার দুই বছরের একটি মেয়ে আছে। আমি একটি খালি পাত্র নিয়ে বাড়ি ফিরে এসে দেখি, আমার মেয়ে খাবার বা রুটি না থাকায় চিৎকার করছে’। আরেক নারী রিহাম দ্বাস বলেন, ‘কখনও কখনও আমি খাবার পাই এবং কখনও কখনও পাই না। যদি কোনো দাতব্য রান্নাঘর চালু থাকে, তবে আমার বাচ্চারা খায়। কিন্তু যদি না থাকে, তবে তারা খায় না’। জাতিসংঘের খাদ্য সহায়তা কর্মসূচিও (ডব্লিউএফপি) সতর্ক করে বলেছে, ‘গাজা উপত্যকায় প্রতি তিনজনের একজন না খেয়ে দিন পার করছেন। সেখানে পুষ্টিহীনতা বাড়ছে। ৯০ হাজার নারী ও শিশুর জরুরি চিকিৎসা প্রয়োজন’।
ইসরায়েলি হামলায় গাজা দুর্ভিক্ষের কবলে পড়ার শঙ্কা প্রকাশ করে জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস বলেছেন, ‘আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উদাসীনতা ও নিষ্ক্রিয়তা ব্যাখ্যা করার মতো না। কোনো করুণা নেই, সত্য নেই, নেই কোনো মানবতা’। জাতিসংঘের ফিলিস্তিনি শরণার্থী সংস্থা (ইউএনআরডব্লিউএ) জানিয়েছে, ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ অবরুদ্ধ অঞ্চলটিতে ফিলিস্তিনিদের ‘আবারও বাস্তুচ্যুত হতে বাধ্য করছে’। এক্স-এ পোস্ট করা বিবৃতিতে সংস্থাটি বলেছে, ‘তাদের কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই। গাজায় কেউ নিরাপদ নয়। সাহায্যকর্মী, চিকিৎসাকর্মী, জাতিসংঘের কর্মীরাও নিরাপদ নয়’। কাউকে রেহাই দেওয়া হয়নি’। ইসরায়েলের প্রতি তাৎক্ষণিকভাবে যুদ্ধবিরতিরও আহ্বান জানিয়েছে ইউএনআরডব্লিউএ।
যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কাইর স্টারমার গাজায় মানবিক সংকট নিরসনে অবিলম্বে পদক্ষেপ নেয়ার আহ্বান জানিয়ে সেখানে নিজ দেশের সাহায্যের প্রচেষ্টার কথাও তুলে ধরেছেন। ডেইলি মিররের কলামে শনিবার যুক্তরাজ্যের নেতা লিখেছেন, ‘গাজায় অনাহার এবং হতাশার চিত্রগুলি অত্যন্ত ভয়াবহ। ফিলিস্তিনি জনগণ, বিশেষত শিশুদের মানবিক সাহায্যের অস্বীকৃতি সম্পূর্ণরূপে অযৌক্তি। এটি মানবিক বিপর্যয় এবং এটি এখনই শেষ হওয়া উচিত’।
আগেরদিনও জার্মানি, ফ্রান্স এবং যুক্তরাজ্যের নেতারা ক্ষুধার্ত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে প্রবেশকারী ত্রাণ সরবরাহের ওপর থেকে অবিলম্বে অবরোধ তুলে নিতে ইসরায়েলের প্রতি আহ্বান জানিয়েছিলেন। মারাত্মক দুর্ভিক্ষের খবরের মধ্যেই গাজায় বেসামরিক দুর্ভোগ লাঘব এবং সাহায্য সরবরাহ নিশ্চিতে জরুরি পদক্ষেপের আহ্বান জানিয়েছে নিউ ইয়র্কভিত্তিক রক্ষণশীল ইহুদি পণ্ডিতদের আন্তর্জাতিক সংগঠন রাব্বিনিক্যাল অ্যাসেম্বলিও।
তাদের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘সহায়তা সংস্থা, জাতিসংঘ এবং ইসরায়েলি সরকারকে সীমান্তে আটকে থাকা সরবরাহ বিতরণে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে। যেন, তারা এমন বেসামরিক নাগরিকদের কাছে পৌঁছাতে পারে, যাদের অত্যন্ত প্রয়োজন’। অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে অক্সফামের নীতিনির্ধারণী বুশরা খালিদী বলেন, ‘যখন গাজার পুরো জনগণ দুর্ভিক্ষের মুখোমুখি এবং ৮৪ জনেরও বেশি শিশু ক্ষুধার্ত অবস্থায় মারা গেছে, তখন সাহায্য বা জ্বালানির ওপর কোনো বিধি-নিষেধ থাকা উচিত নয়’।
অন্যদিকে জাতিসংঘের ফিলিস্তিন বিষয়ক শরণার্থী সংস্থার (ইউএনআরডব্লিউএ) কর্মকর্তারা মিডল ইস্ট আইকে জানিয়েছেন, গত চার মাসেরও বেশি সময় ধরে তারা মিশর ও জর্ডানে প্রায় ছয় হাজার ট্রাক খাদ্য ও চিকিৎসাসামগ্রী মজুত করে রেখেছেন। কিন্তু ইসরায়েলের অনুমতি না পাওয়ায় সেগুলো এখনো গাজায় প্রবেশ করতে পারেনি। ইসরায়েলের অবরোধের আগে সহায়তা সংগঠনগুলো গাজায় প্রতিদিন প্রায় ৬০০ ট্রাক ত্রাণ পাঠাতে পারত।ইউএনআরডব্লিউএর প্রধান ফিলিপ লাজ্জারিনি গত মে মাসে বলেছিলেন, এই ত্রাণ দিয়ে উপত্যকাটির বাসিন্দাদের ন্যূনতম চাহিদা পূরণ হতো।
গাজায় কুখ্যাত জিএইচএফের হয়ে কাজ করা একজন প্রাক্তন মার্কিন সৈনিকও বিবিসিকে বলেন, তিনি খাদ্য সহায়তা চাওয়া বেসামরিক নাগরিকদের হত্যার ক্ষেত্রে ‘নিঃসন্দেহে ... যুদ্ধাপরাধ প্রত্যক্ষ করেছেন’।

মতামত দিন
মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে