Views Bangladesh Logo

জ্বালানি সরবরাহ না মেলায় রূপসা ৮০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্র বসে থাকবে দেড় বছর

* কেন্দ্র নির্মাণ শেষ হবে ২০২৫-এর জুনে

* গ্যাস সরবরাহের আশ্বাস মিলেছে ২০২৭-এ

* বিপুল লোকসানের শঙ্কা

* এডিবির ঋণের অন্য প্রকল্পে বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে

জ্বালানি সরবরাহ না পাওয়াতে নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার পরও দেড় বছর বসে থাকবে রূপসা ৮০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্র। ৮ হাজার ৪৮৯ কোটি টাকা ব্যয়ের এই প্রকল্প নির্মাণ শুরুর আগেই পেট্রোবাংলা জ্বালানি সরবরাহের নিশ্চয়তা দিয়েছিল। এখন কেন বিপুল বিনিয়োগের এই প্রকল্প গ্যাসের অভাবে বসে থাকবে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। কেন্দ্রটির নির্মাণকাজ ২০২৫ সালের মাঝামাঝি শেষ হলেও ২০২৭-এর আগে জ্বালানি সরবরাহ সম্ভব নয় বলে জানিয়েছে আরেক রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান সুন্দরবন গ্যাস কোম্পানি লিমিটেড।

দুই রাষ্ট্রীয় কোম্পানির সমন্বয়হীতায় বিপুল পরিমাণ লোকসানের শঙ্কা করা হচ্ছে। কেন্দ্রটি চালু করা সম্ভব না হলে দু'দিক দিয়ে লোকসান গুনতে হবে। প্রথমত তরল জ্বালানি-ভিত্তিক কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে হবে। এতে ইউনিট প্রতি অতিরিক্ত খরচ হবে সাত টাকার মতো। অন্যদিকে, কেন্দ্রটি উৎপাদন শুরু করুক বা না করুক ঋণের কিস্তি পরিশোধ করার পাশাপাশি পরিচলন খরচ বাবদ ব্যয় শুরু হবে।

হিসেব বলছে, একটি ৮০০ মেগাওয়াটের বিদ্যুৎকেন্দ্র যদি দৈনিক ৮০ ভাগ উৎপাদন ক্ষমতায়ও চলানো হয়, সেক্ষেত্রে দৈনিক (২৪ ঘণ্টায়) এক কোটি ৫৩ লাখ ৬০ হাজার ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব। যদি এলএনজি বা আমদানি করা গ্যাস দিয়েও বিদ্যুৎ উৎপাদন করে, সেক্ষেত্রে উৎপাদন ব্যয় দাঁড়ায় ইউনিটপ্রতি সর্বোচ্চ সাত টাকা। অর্থাৎ, মোট উৎপাদন ব্যয় হয় ১০ কোটি ৭৫ লাখ টাকা। একই বিদ্যুৎ যদি ফার্নেস অয়েল দিয়ে উৎপাদন করা হয় তবে ব্যয় হবে এর দ্বিগুণ, অর্থাৎ ২১ কোটি ৫০ লাখ টাকা। ডিজেল দিয়ে উৎপাদন করতে গেলে এই খরচ বেড়ে তিনগুণে গিয়ে ঠেকবে। অর্থাৎ, ৩২ কোটি ২৫ লাখ টাকার মতো গ্যাস-ভিত্তিক এ ধরনের কেন্দ্র বানাতে চাইলে ডিজেল দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব। কিন্তু এত বড় একটি কেন্দ্র ডিজেল দিয়ে চালাতে গেলে যে পরিমাণ ব্যয় বৃদ্ধি পাবে তা পিডিবির পক্ষে বহন করা কঠিন। অতিরিক্ত ব্যয়ের কারণে সরকার ২০১৯ সাল থেকে ডিজেলচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে খুব বেশি প্রয়োজন না হলে ডিজেল দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয় না।

বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করছে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান নর্থ ওয়েস্ট পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানি (এনডব্লিউপিজিসিএল)। এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (এডিবি), জাপান ফান্ড ফর পোভার্টি রিডাকশন (জেএফপিআর), বাংলাদেশ সরকার এবং এনডব্লিউপিজিসিএল যৌথ বিনিয়োগে কেন্দ্রটি নির্মাণ করছে।

জানা গেছে, কেন্দ্রটির ভৌত অগ্রগতি হয়েছে ৮৩ ভাগ। চাইলে আগামী বছরের মাঝামাঝি কেন্দ্রটি উৎপাদনে নিয়ে আসা সম্ভব; কিন্তু কেন্দ্রটির নির্মাণ পর্যায়ে দুই দফা সময় বৃদ্ধির পর ২০২৫-এর জুনে উৎপাদনে আসার সময় নির্ধারণ করা হয়েছে; কিন্তু এর পরও কেন্দ্রটিতে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য গ্যাস সরবরাহে অপারগতা জানিয়েছে পেট্রোবাংলা। কেন্দ্রটির নির্মাণ শেষ হওয়ার দেড় বছর পর ২০২৭-এ গ্যাস সরবরাহের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে পেট্রোবাংলা। চলতি মাসের মাঝামাঝি সময়ে সংকট সমাধানে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ বিভাগ বৈঠকে বসে। ওই বৈঠকে বিদ্যুৎ, জ্বালানি এবং খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ সভাপতিত্ব করেন। তবে ওই বৈঠকেও সমস্যার সমাধান দিতে পারেনি পেট্রোবাংলা।

এনডব্লিউপিজিসিএল সূত্র বলছে, বিদ্যুৎ কেন্দ্রটির প্রি-কমিশনিংয়ের জন্য ২০২৪ সালের জুনেই গ্যাসের প্রয়োজন। প্রি-কমিশনিং অর্থ হচ্ছে, কেন্দ্রটি পুরোপুরি উৎপাদনে আসার কয়েক মাস আগে থেকেই পরীক্ষামূলকভাবে উৎপাদন শুরু করা হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রি-কমিশনিং শেষ করতে তিন থেকে ছয় মাস পর্যন্ত সময় লেগে যায়।

এনডব্লিউপিজিসিএল-এর একজন কর্মকর্তা বলেন, আমরা বারবার বলার পরও সুন্দরবন গ্যাস কোম্পানি আমাদের সঙ্গে গ্যাস সরবরাহের চুক্তি করছে না। এমনকি এখনও তারা চুক্তি করেনি। বিষয়টি পেট্রোবাংলা হয়ে জ্বালানি বিভাগে পৌঁছানোর পর বিদ্যুৎ ও জ্বালানি উভয় বিভাগ মিলে বৈঠকের আয়োজন করে। কিন্তু সেখানেও ফলপ্রসূ কোনো সিদ্ধান্ত আসেনি।

এনডব্লিপিজিসিএল-এর একটি বৈঠকের কার্যপত্র থেকে জানা যায়, গত ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে গ্যাস সরবরাহ চুক্তি করতে সুন্দরবন গ্যাস কোম্পানি এবং পেট্রোবাংলাকে সময় বেঁধে দেওয়া হয়। প্রকল্পের লিড পার্টনার বা সর্বোচ্চ ঋণ প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান এডিবি গ্যাস সরবরাহ চুক্তি সই করার বিষয়ে চাপ প্রয়োগ করে। এডিবি'র শর্ত না মানলে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হবে এবং এডিবি'র ঋণে বাস্তবায়নাধীন অন্যান্য প্রকল্পেও বিরূপ প্রভাব পড়বে বলে ওই কার্যপত্রে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়।

জানতে চাইলে এনডব্লিপিজিসিএল-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী কাজী আবসার উদ্দিন আহমদ বলেন, আমরা এখনও গ্যাস সরবরাহ চুক্তি করতে পারিনি। গ্যাস সরবরাহ না পেলে কেন্দ্রটি বসে থাকবে কি- জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমরা বিকল্প অনুসন্ধানের চেষ্টা করছি। পেট্রোবাংলা ২০২৭-এ গ্যাস সরবরাহ করতে চেয়েছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমরা তো এখনও গ্যাস সরবরাহ চুক্তি করতে পারিনি। চুক্তি না হওয়া পর্যন্ত বলতে পারবো না কবে নাগাদ তারা গ্যাস সরবরাহ করতে পারবে।

রূপসা ৮০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্রে ২০২৭ সালে গ্যাস সরবরাহ করা হবে কি না- এমনটি জানতে চাইলে সুন্দরবন গ্যাস কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক তোফায়েল আহমেদ বলেন, সেরকমই কথা হয়েছে। মন্ত্রণালয়ে সাম্প্রতিক বৈঠকে তিনি উপস্থিত ছিলেন জানিয়ে বলেন, এখনও বৈঠকের সিদ্ধান্ত আমাদের কাছে এসে পৌঁছায়নি। কেন্দ্রটির নির্মাণকাজ শেষ হবে ২০২৫-এ। সুন্দরবন গ্যাস কোম্পানি যদি ২০২৭ সালে গ্যাস সরবরাহ করে তাহলে দু’বছর বসে থাকতে হবে- এমন প্রশ্নে তোফায়েল আহমেদ বলেন, চাইলে তারা ডিজেল দিয়ে চালাতে পারে। কেন্দ্রটি তো 'ডুয়েল ফুয়েল'।

জানতে চাইলে পাওয়ার সেলের সাবেক মহাপরিচালক বিডি রহমত উল্লাহ বলেন, কোনো কিছুতে সমন্বয় না থাকার কারণে এ ধরনের কাজ হচ্ছে। এখন যে বিপুল পরিমাণ লোকসান হবে তার দায় কে নেবে! এর দায় তো আমাদের নিতে হবে।

মতামত দিন

মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে

ট্রেন্ডিং ভিউজ