অবৈধ মীমাংসা থেকে হত্যা: রাষ্ট্রকে দেখাতে হবে বিচারের দৃষ্টান্ত
নরসিংদীতে ধর্ষণের বিচার চাওয়ার সাহস দেখিয়েছিল ১৫ বছর বয়সী এক কিশোরী। কিন্তু ন্যায়বিচারের পথেই তার জীবন থেমে গেল। অভিযোগ অনুযায়ী, বাবার সঙ্গে নিরাপদ স্থানে যাওয়ার পথে তাকে প্রকাশ্যে অপহরণ করা হয় এবং পরদিন উদ্ধার হয় তার নিথর দেহ।
এই ঘটনা কেবল একটি হত্যাকাণ্ড নয়; এটি আমাদের আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা, মানবাধিকার সুরক্ষা ও সামাজিক ন্যায়বোধের গভীর সংকটের প্রতিচ্ছবি। যখন বিচারপ্রার্থীই প্রাণ হারায়, তখন প্রশ্ন ওঠে—রাষ্ট্রের আইনি কাঠামো কি সত্যিই নাগরিকের জন্য নিরাপদ আশ্রয়?
এই ঘটনার কেন্দ্রে রয়েছে আরেকটি ভয়াবহ বাস্তবতা— ধর্ষণের মতো জঘন্য অপরাধকে অবৈধ সালিশের মাধ্যমে ‘মীমাংসা’ করার সংস্কৃতি। ধর্ষণ কোনো ব্যক্তিগত বিরোধ নয়, যা স্থানীয় বৈঠকে আপস করে শেষ করা যায়। এটি ব্যক্তির শরীর, সম্মান, মানসিক নিরাপত্তা এবং সাংবিধানিক অধিকারের ওপর সরাসরি আঘাত।
রাষ্ট্রীয় আইনে এটি অমীমাংসাযোগ্য অপরাধ; এর বিচার একমাত্র আদালতেই হতে পারে। তবুও বাস্তবে আমরা দেখি, প্রভাবশালী ব্যক্তি বা স্থানীয় রাজনৈতিক বলয়ের মাধ্যমে গুরুতর অভিযোগও কখনও ‘মীমাংসা’র টেবিলে তোলা হয়। এই প্রবণতা কেবল বেআইনি নয়, ন্যায়বিচারের ধারণাকেই দুর্বল করে।
নরসিংদীর ঘটনায় প্রথমে ধর্ষণের অভিযোগ, তারপর বিচার চাওয়ার চেষ্টা, এরপর হুমকি এবং শেষ পর্যন্ত অপহরণ ও হত্যা। প্রতিটি ধাপই দণ্ডহীনতার সংস্কৃতির ইঙ্গিত বহন করে। অপরাধীরা যখন বিশ্বাস করে যে প্রভাব, ভয় বা রাজনৈতিক আশ্রয়ে তারা পার পেয়ে যাবে, তখন তাদের দুঃসাহস বাড়ে। বিচারহীনতার এই সংস্কৃতি একদিনে তৈরি হয় না; এটি দীর্ঘদিনের অবহেলা, আপস ও নীরবতার ফল।
অবৈধ সালিশের পেছনে সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা কাজ করে। অনেক পরিবার থানায় যেতে ভয় পায়। তারা মনে করে, মামলা নিতে বিলম্ব হবে, হয়রানি হবে বা প্রভাবশালীদের চাপ আসবে। সামাজিক লজ্জা ও কলঙ্কের ভয়ও বড় কারণ। ধর্ষণের শিকার মেয়েটির পরিবার অনেক সময় ভাবে মামলা করলে সমাজে তাদের অবস্থান আরও নাজুক হবে। এই মানসিকতার সুযোগ নেয় অপরাধীচক্র।
তারা জানে, ভয় দেখিয়ে বা প্রভাব খাটিয়ে অভিযোগ চাপা দেওয়া সম্ভব। কিন্তু প্রশ্ন হলো—কেন মানুষ থানার চেয়ে প্রভাবশালীর দ্বারস্থ হয়? এর উত্তর আমাদের আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার প্রতি আস্থাহীনতাই প্রমাণ। যদি মানুষ নিশ্চিত হতো যে থানায় গেলে দ্রুত মামলা নেওয়া হবে, ভুক্তভোগী সুরক্ষা পাবে এবং তদন্ত নিরপেক্ষ হবে, তবে তারা অবৈধ শালিসের পথে যেত না। সুতরাং অবৈধ মীমাংসা শুধু সামাজিক ব্যর্থতা নয়; এটি প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার প্রতিফলনও।
তবে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতাই ধর্ষণের মতো অপরাধকে সালিশে তোলার বৈধতা দেয় না। সালিশের পরিসর থাকতে পারে ছোটখাটো বিরোধে। কিন্তু ধর্ষণ, অপহরণ ও হত্যা রাষ্ট্রদণ্ডযোগ্য অপরাধ। এগুলোতে আপস মানে অপরাধীকে সময় দেওয়া, প্রমাণ নষ্টের সুযোগ দেওয়া এবং সাক্ষীদের ভয় দেখানোর সুযোগ দেওয়া। সবচেয়ে বড় কথা, ভুক্তভোগীকে দ্বিতীয়বার অপমান করা।
বাবার সামনে থেকে মেয়েকে ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনা রাষ্ট্রের প্রতি এক প্রকাশ্য চ্যালেঞ্জ। এটি দেখায়, অপরাধীরা কতটা নির্ভীক হয়ে উঠেছে। এমন দুঃসাহস তখনই জন্ম নেয়, যখন আইন প্রয়োগের দৃঢ়তা প্রশ্নবিদ্ধ হয়। রাষ্ট্রের দায়িত্ব কেবল ঘটনার পর তদন্ত করা নয়; বরং এমন পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে কেউ অপরাধ করার সাহসই না পায়। এখানে পুলিশের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গুরুতর অপরাধের অভিযোগ প্রকাশ্যে এলে পুলিশের স্বপ্রণোদিত হয়ে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। আইন তাদের সেই ক্ষমতা দিয়েছে। অভিযোগপত্রের অপেক্ষায় নিষ্ক্রিয় থাকা সক্রিয়তার ঘাটতির ইঙ্গিত দেয়।
একই সঙ্গে খতিয়ে দেখা দরকার, প্রথম অভিযোগ ওঠার পর কোনো নজরদারি বা প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল কি না। ছোট এলাকায় এমন ঘটনা সাধারণত লোকমুখে ছড়িয়ে পড়ে; সম্পূর্ণ অজ্ঞ থাকা প্রশাসনিক দুর্বলতার লক্ষণ।
রাজনৈতিক প্রভাবের প্রশ্নও এখানে অনিবার্য। স্থানীয় পর্যায়ে দলীয় পরিচয় প্রায়ই সামাজিক ক্ষমতার উৎসে পরিণত হয়। যদি কোনো জনপ্রতিনিধি বা প্রভাবশালী ব্যক্তি গুরুতর অপরাধকে আইনি প্রক্রিয়ার বাইরে ‘মীমাংসা’ করতে চান, তবে তা আইনের শাসনের পরিপন্থী।
রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত স্পষ্ট বার্তা দেওয়া—ধর্ষণ ও হত্যার মতো অপরাধে কোনো আপস নয়, কোনো সালিশ নয়। দলীয় পরিচয় কখনও অপরাধ ঢাকার ঢাল হতে পারে না। সামাজিক মানসিকতার পরিবর্তনও অপরিহার্য। কেন এখনও ভুক্তভোগী পরিবারকে এলাকা ছাড়ার পরামর্শ দেওয়া হয়? কেন অপরাধীর বদলে ভুক্তভোগীর চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন ওঠে? এই সংস্কৃতি বদলাতে না পারলে আইনি সংস্কারও যথেষ্ট হবে না। সম্মান রক্ষার নামে অপরাধ চাপা দেওয়া সমাজের সম্মানকে ধ্বংস করে।
আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থায় কাঠামোগত সংস্কার জরুরি। থানায় জেন্ডার সংবেদনশীল সেল, নারী ও শিশু সহায়তা ডেস্ক, দ্রুত তদন্তের সময়সীমা এবং সাক্ষী-ভুক্তভোগী সুরক্ষা কর্মসূচি কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। পুলিশ সদস্যদের মানবাধিকার ও নারী-শিশু সুরক্ষা বিষয়ে প্রশিক্ষণ বাড়াতে হবে। মামলার দীর্ঘসূত্রতা কমাতে বিশেষ ট্রাইব্যুনালের কার্যকারিতা জোরদার করা প্রয়োজন।
দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি প্রতিশোধ নয়; এটি সামাজিক বার্তা। যখন মানুষ দেখে অপরাধীর শাস্তি হয়েছে, তখন আইনের প্রতি আস্থা ফিরে আসে। সম্ভাব্য অপরাধীর মনে ভয় সৃষ্টি হয়। কিন্তু বিচার বিলম্বিত হলে বা প্রভাবের কারণে ব্যাহত হলে দণ্ডহীনতার সংস্কৃতি আরও শক্তিশালী হয়।
গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ। অবৈধ সালিশের ঘটনা প্রকাশ্যে আনতে হবে, জনমত গড়ে তুলতে হবে। একই সঙ্গে ভুক্তভোগীর পরিচয় ও মর্যাদা রক্ষা করতে হবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব ও চরিত্রহনন বন্ধে সচেতনতা প্রয়োজন। আমরা যেন ভুক্তভোগীকে দ্বিতীয়বার শাস্তি না দিই।
সবচেয়ে বড় কথা—এই ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তিকে আমাদের সম্মিলিতভাবে ‘না’ বলতে হবে। না অবৈধ মীমাংসাকে। না রাজনৈতিক প্রভাবকে। না দণ্ডহীনতাকে। না ভুক্তভোগীকে দোষারোপের সংস্কৃতিকে। রাষ্ট্রকে দেখাতে হবে বিচারের দৃষ্টান্ত—দ্রুত, নিরপেক্ষ ও দৃশ্যমান বিচার। প্রশাসনকে সক্রিয় হতে হবে, রাজনৈতিক দলগুলোকে জবাবদিহির সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে, সমাজকে মানবিক হতে হবে।
একটি রাষ্ট্রের শক্তি তার দুর্বলতম নাগরিকের সুরক্ষায়। নরসিংদীর সেই কিশোরীর মৃত্যু আমাদের কাছে একটি কঠিন বার্তা রেখে গেছে—বিচারের পথ নিরাপদ না হলে গণতন্ত্র ও আইনের শাসন কাগুজে হয়ে যায়। এখন সময় প্রমাণ করার, রাষ্ট্র সত্যিই নাগরিকের পাশে আছে।
তাই ধর্ষণ ও হত্যার মতো অপরাধে কোনো আপস নয়, কোনো অবৈধ সালিশ নয়, শুধু প্রয়োগ করতে হবে আইনের সবটুকু। রাষ্ট্রকে দেখাতে হবে বিচারের দৃষ্টান্ত, যাতে ভবিষ্যতে কেউ ধর্ষণের বিচার না পেয়ে উল্টো প্রাণ না হারায়। এ ধরনের জঘণ্য ঘটনার পুনরাবৃত্তিকে দৃঢ়ভাবে বলি—না, না, না। এখনই পরিবর্তন, এখনই ন্যায়বিচার।
অ্যাডভোকেট ফাওজিয়া করিম ফিরোজ, মানবাধিকার নেত্রী ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী

মতামত দিন
মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে