Views Bangladesh Logo

ফ্রেন্ডফ্লুয়েন্সিং: বন্ধুরাই এখন প্রেমের কো-পাইলট

 VB  Desk

ভিবি ডেস্ক

একটা সময় ছিল, প্রেমে পড়া ছিল নিতান্তই একান্ত এক ব্যাপার। দুজন মানুষের মধ্যকার এক গোপন অধ্যায়, যা অন্য কারও চোখে পড়ত না, পড়লেও তা জানা যেত অনেক পরে। কিন্তু আজকের প্রজন্মের কাছে প্রেম আর নিছক দুজনের গল্প নয়। এখন সেখানে তৃতীয়, চতুর্থ, এমনকি পঞ্চম চরিত্রও হাজির থাকে—আর তারা কেউ নয়, আপনার বন্ধুরাই। একে বলা হচ্ছে 'ফ্রেন্ডফ্লুয়েন্সিং'।

নামের আড়ালে গল্প

'ফ্রেন্ড' আর 'ইনফ্লুয়েন্স'—দুই শব্দের মিশেলে তৈরি এই শব্দবন্ধ প্রথম নজরে আসে ২০১৩ সালে, মনোবিজ্ঞান-বিষয়ক সাময়িকী সাইকোলজি টুডের সাবেক সম্পাদক কার্লিন ফ্লোরার লেখা একটি বইয়ের শিরোনামে। তবে শব্দটি সত্যিকার অর্থে আলোচনায় আসে সাম্প্রতিক সময়ে, যখন ডেটিং অ্যাপ টিন্ডার তাদের 'ইয়ার ইন সোয়াইপ ২০২৫' প্রতিবেদনে একে চিহ্নিত করে ২০২৬ সালের অন্যতম প্রধান ডেটিং প্রবণতা হিসেবে। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়ার হাজার হাজার তরুণ-তরুণীর ওপর চালানো এক জরিপের ভিত্তিতে উঠে আসে এই তথ্য—আজকের প্রেমিক-প্রেমিকাদের একটা বড় অংশ তাদের প্রেমের সিদ্ধান্তে বন্ধুদের মতামতকে দিচ্ছেন অসামান্য গুরুত্ব।

যেভাবে কাজ করে এই প্রবণতা

কল্পনা করুন—আপনি নতুন কারও সঙ্গে প্রথম দেখা সেরে বাড়ি ফিরেছেন। আগে হয়তো একাই বসে ভাবতেন, মানুষটা কেমন, সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়া ঠিক হবে কি না। এখন সেই ভাবনার আগেই ফোন চলে যায় বন্ধুদের গ্রুপ চ্যাটে। সঙ্গে সঙ্গে আসে একগাদা মতামত—কেউ বলে, "গ্রিন ফ্ল্যাগ, এগিয়ে যাও", কেউ বলে, "এই ছেলেটা ঠিক না, রেড ফ্ল্যাগ স্পষ্ট।"

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই প্রবণতায় বন্ধুরা যেন হয়ে ওঠেন প্রেমজীবনের 'কো-পাইলট'। লস অ্যাঞ্জেলেসের থেরাপিস্ট ক্লোয়ি বিনের ভাষায়, বন্ধুদের এই প্রভাবে সীমারেখা প্রায়ই থাকে না বললেই চলে—কার সঙ্গে দ্বিতীয়বার দেখা করা উচিত, কোনটা ঠিক আর কোনটা ভুল, সবকিছুতেই সরব থাকেন তারা।

জেন-জির চোখে দলগত সিদ্ধান্ত

আজকের তরুণ প্রজন্মের কাছে ডেটিং যেন একা লড়াই নয়, বরং এক দলীয় খেলা। সম্পর্ক-বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য, এই প্রজন্মের কাছে সিদ্ধান্তগুলো নেওয়া হয় না নিভৃতে—বরং যাদের ওপর সবচেয়ে বেশি ভরসা করা যায়, তাদের সঙ্গে মিলেই বাস্তব সময়ে তা নিয়ে আলোচনা চলে। কেউ যদি বন্ধুদের সঙ্গে মানিয়ে নিতে না পারেন, কিংবা গ্রুপ চ্যাটের 'ভাইব চেক'-এ টিকে থাকতে না পারেন, তাহলেই বোঝা যায় সেই সম্পর্কের ভবিষ্যৎ কেমন হতে পারে।

উজ্জ্বল দিক

এই প্রবণতার একটা ইতিবাচক দিকও আছে নিঃসন্দেহে। প্রেমে পড়া মানুষ প্রায়ই নিজের চোখে সঠিক-বেঠিক বিচার করতে পারেন না—আবেগের কুয়াশায় ঢাকা পড়ে যায় বিচারবুদ্ধি। এমন সময় বন্ধুরা বাইরে থেকে দেখে বলতে পারেন যা হয়তো নিজের চোখে অগোচরে থেকে যেত। দ্বৈত ডেটিং, একসঙ্গে বেরোনো কিংবা দেখা করার পর বন্ধুদের কাছে খোলাখুলি আলোচনা—এসব সম্পর্ককে করে তুলতে পারে আরও নিরাপদ ও প্রাণবন্ত।

অন্ধকার দিকও কম নয়

তবে সতর্কবার্তাও দিচ্ছেন মনোবিদরা। প্রেম বিশেষজ্ঞ ও 'দ্য লাভ ডক'-এর প্রতিষ্ঠাতা সারাহ হেনসলির মতে, দ্বৈত ডেটিং স্বাস্থ্যকর হতে পারে, কিন্তু সঙ্গীকে জোর করে বন্ধুদের 'পরীক্ষায়' পাস করানো মোটেও স্বাস্থ্যকর নয়। কারণ, প্রতিটি সম্পর্ক আসলে দুজন মানুষের—তৃতীয় কারও অনুমোদনের ওপর তার ভিত্তি নির্ভর করা উচিত নয়। অতিরিক্ত বন্ধু-প্রভাবে নিজের অন্তর্দৃষ্টি ঢাকা পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থেকেই যায়।

ফ্রেন্ডফ্লুয়েন্সিং হয়তো এই সময়ের এক নতুন বাস্তবতা—যেখানে বন্ধুত্ব আর প্রেম মিলেমিশে তৈরি করছে সিদ্ধান্তের এক নতুন সমীকরণ। তবে শেষ পর্যন্ত মনে রাখা জরুরি, প্রেম যত সামাজিক হোক, তার হৃদয়টা থেকে যায় একান্তই দুজনের—আর সেই হৃদয়ের কথা শোনার ভারটাও শেষমেশ নিজেকেই বহন করতে হয়। 

মতামত দিন

Avatar

ট্রেন্ডিং ভিউজ