ফরাসি দাপটে থেমে গেল অ্যাটলাস লায়ন্সের গর্জন
প্রথম কোয়ার্টার ফাইনাল যেন পরিণত হয়েছিল ফরাসি ফুটবলের শক্তিমত্তার প্রদর্শনীতে। স্পষ্ট ফেভারিটের তকমা নিয়েই কোয়ার্টার ফাইনালে মরক্কোর বিপক্ষে মাঠে নেমেছিল ফ্রান্স, সেই প্রভাবও ছিল একেবারে স্পষ্ট। তারকাসমৃদ্ধ ফরাসি দলটির বিপক্ষে তেমন কোনো কার্যকর প্রতিরোধ গড়তে পারেননি আফকন চ্যাম্পিয়নরা। বৃহস্পতিবার রাতে যুক্তরাষ্ট্রের বোস্টন স্টেডিয়ামে মরক্কোকে ২-০ গোলে হারিয়ে চলতি বিশ্বকাপের প্রথম দল হিসেবে সেমিফাইনাল নিশ্চিত করেছে দিদিয়ের দেশমের দল।
ম্যাচের শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলার ইঙ্গিত দেয় দুই দল। দ্বিতীয় মিনিটেই মাঝমাঠে ইসমাইল এল আইনাউইর চ্যালেঞ্জে ফাউলের শিকার হন ফ্রান্সের এক খেলোয়াড়, যদিও সেই ফ্রি কিক থেকে কোনো বিপদ তৈরি হয়নি। চতুর্থ মিনিটেই অবশ্য প্রায় জাল খুঁজে নিচ্ছিলেন কিলিয়ান এমবাপ্পে, তবে মরক্কো গোলরক্ষক ইয়াসিন বুনু ডানদিকে ঝাঁপিয়ে তাঁর নিচু শট কর্নার করে দেন। সেই কর্নার থেকে দায়ো উপামেকানোর হেডেও আরেকবার নিশ্চিতপ্রায় গোল ঠেকান বুনু। ১৪ মিনিটে লুকাস দিগনের ফাউলে মরক্কো ফ্রি কিক পেলেও তা থেকে কাজে লাগাতে পারেনি। ১৮ মিনিটে দেম্বেলের হেড অল্পের জন্য পোস্টের ওপর দিয়ে বাইরে চলে যায়।
ম্যাচের সবচেয়ে আলোচিত মুহূর্ত আসে ২৫তম মিনিটে। বাঁ পাশ ধরে প্রতি-আক্রমণে ওঠা এমবাপ্পেকে বক্সের ভেতরে ফেলে দেন মরক্কোর ডিফেন্ডার নুসাইর মাজরাউই, সঙ্গে সঙ্গে পেনাল্টির বাঁশি বাজান রেফারি। তিন মিনিট পর, ২৮তম মিনিটে স্পট কিক নিতে যান দলের অধিনায়ক এমবাপ্পে। পোস্টের ডান দিকের নিচের কোনা দিয়ে নেওয়া তাঁর জোরালো শট দুর্দান্ত দক্ষতায় ঠেকিয়ে দেন বুনু। এই সেভের মধ্য দিয়ে ব্যক্তিগত এক অনন্য কীর্তি গড়েন ৩১ বছর বয়সী এই গোলরক্ষক; বিশ্বকাপের ইতিহাসে তাঁর ঠেকানো পেনাল্টির সংখ্যা দাঁড়ায় মোট ৪টিতে, যা ১৯৬৬ সালের পর যেকোনো গোলরক্ষকের জন্য সর্বোচ্চ।
পেনাল্টি মিসের ধাক্কা সামলে ৩৫ মিনিটে আবারও সুযোগ তৈরি করে ফ্রান্স। মাঝমাঠে বুয়াদ্দির কাছ থেকে বল কেড়ে নিয়ে কয়েকজনকে কাটিয়ে বক্সে ঢুকে দারুণ শট নেন দেজিরে দোয়ে, কিন্তু আরও একবার অবিশ্বাস্য দক্ষতায় ফ্রান্সকে গোলবঞ্চিত রাখেন বুনু। প্রথমার্ধের যোগ করা সময়ের প্রথম মিনিটে ফ্রান্স ডিফেন্ডার লুকাস দিগনের দূরপাল্লার গতিময় শট ক্রসবারে লেগে বাইরে চলে যায়। শেষ পর্যন্ত একাধিক নিশ্চিত সুযোগ নষ্ট করে গোলশূন্য অবস্থাতেই বিরতিতে যেতে হয় ফ্রান্সকে। প্রথমার্ধজুড়ে বল দখল ও আক্রমণে স্পষ্ট আধিপত্য ছিল ফরাসিদের, তবে বুনুর অসাধারণ গোলরক্ষণ আর মরক্কোর শৃঙ্খলাবদ্ধ রক্ষণভাগের কারণে কাঙ্ক্ষিত গোলের দেখা পায়নি তারা।
বিরতির পর মাঠে ফিরে প্রথম ১০ মিনিট কোনো দলই তেমন সুযোগ তৈরি করতে পারেনি। ৫৫ মিনিটে দোয়ের একটি শট বুনুর শরীর বরাবর থাকায় সহজেই তা গ্লাভসবন্দি করেন মরক্কোর গোলরক্ষক। এর কিছুক্ষণ পর গোলমুখের সামনে বল পেয়েও উড়িয়ে মারেন এমবাপ্পে। একাধিক সুযোগ হাতছাড়া করলেও দমে যাননি ফরাসি তারকা। অবশেষে ৬০তম মিনিটে দোয়ের কাছ থেকে বল পেয়ে বক্সের সামনে দিয়ে ঢুকে গতিময় দূরপাল্লার শটে টপ কর্নার দিয়ে জাল খুঁজে নেন তিনি। প্রথমার্ধে দুর্দান্ত সেভ দেওয়া বুনু এবার আর কিছুই করতে পারেননি। পেনাল্টি মিসের হতাশা ঘুচিয়ে এই গোলে ফ্রান্সকে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে দেন এমবাপ্পে।
এগিয়ে যাওয়ার ৬ মিনিটের মাথায়, ৬৬তম মিনিটে ব্যবধান দ্বিগুণ করেন উসমান দেম্বেলে। এবারও গোলের কারিগর সেই এমবাপ্পে; তাঁর কাছ থেকে বল পেয়ে বক্সের সামনে থেকে নিচু শট নেন দেম্বেলে, বুনুর হাতে লেগে বল জালে জড়িয়ে যায়। প্রথমার্ধে বেশ কিছু সেভ দিলেও এই মুহূর্তে হতাশ করেন মরক্কোর এই গোলরক্ষক। এই গোলের মধ্য দিয়ে চলতি বিশ্বকাপে দেম্বেলের গোলসংখ্যা দাঁড়ায় ৫টিতে, আর এমবাপ্পের হয়ে যায় ৮ গোল; যা লিওনেল মেসির সমান। বিশ্বকাপের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতার তালিকায় ২০ গোল নিয়ে বর্তমানে দুই নম্বরে এমবাপ্পে, শীর্ষে থাকা মেসির চেয়ে পিছিয়ে আছেন মাত্র এক গোলে।
২-০ ব্যবধানে পিছিয়ে পড়ার পর ম্যাচে ফেরার মরিয়া চেষ্টা চালায় মরক্কো। এরই অংশ হিসেবে ৬৩ মিনিটে একসঙ্গে দুটি পরিবর্তন আনেন কোচ; নতুন উদ্যমে আক্রমণ সাজাতে মাঠে নামানো হয় সোফিয়ান আমরাবাত ও সোফিয়ান রহিমিকে। একই সময়ে ফাউলের দায়ে হলুদ কার্ড দেখেন ফ্রান্স ডিফেন্ডার ইসা দিয়প। এর আগে ৩৯ মিনিটে প্রতিপক্ষের বিপজ্জনক আক্রমণ রুখতে গিয়ে ফাউল করেন উইলিয়াম সালিবাও। তবে কার্ড ছাড়া আর কোনো শাস্তির মুখে পড়তে হয়নি তাঁকে। সব মিলিয়ে পুরো ম্যাচে একটি মাত্র হলুদ কার্ড দেখেছে ফ্রান্স, আর কোনো দলই লাল কার্ডের মুখোমুখি হয়নি।
৭৭ মিনিটে কৌশলগত পরিবর্তন আনে ফ্রান্সও। দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের পর মাঠ থেকে তুলে নেওয়া হয় এমবাপ্পেকে, মাঠ ছাড়ার সময় গ্যালারিজুড়ে করতালিতে সিক্ত হন তিনি। তাঁর পরিবর্তে নামেন জাঁ ফিলিপ মাতেতা, যাঁর মূল দায়িত্ব ছিল শেষ কয়েক মিনিটে তাজা শক্তি নিয়ে আক্রমণভাগকে সচল রাখা। এরপর ৭৯ মিনিটে আরেকটি কর্নার আদায় করে নেয় ফ্রান্স, আর ৮৭ মিনিটে ব্যবধান ৩-০ করার সুবর্ণ সুযোগ পান মাইকেল অলিসে, তবে শেষ মুহূর্তের ফিনিশিংয়ে নিখুঁততার অভাবে গোলের দেখা পাননি তিনি।
শেষদিকে মরিয়া হয়ে আক্রমণে ওঠে মরক্কোও। ৮৩ মিনিটে বক্সের সামনে থেকে নেওয়া আজজেদিন উনাহির শট রুখে দেন ফ্রান্স গোলরক্ষক মাইক মাইনান। তিন মিনিট পর দূরের পোস্টে নেওয়া ওলিসের শট চলে যায় অনেকটা বাইরে দিয়ে। নির্ধারিত ৯০ মিনিট শেষে দ্বিতীয়ার্ধে অতিরিক্ত ৬ মিনিট যোগ করেন চতুর্থ রেফারি। সেই যোগ করা সময়ের চতুর্থ মিনিটে উপামেকানোর শট হাঁটু দিয়ে রুখে দেন বুনু, কিন্তু তাঁর দল শেষ পর্যন্ত পরাজয় এড়াতে পারেনি।
ম্যাচ শেষে সংগৃহীত পরিসংখ্যান অনুযায়ী আক্রমণে সম্পূর্ণ আধিপত্য ছিল ফ্রান্সের। পুরো ম্যাচে ফ্রান্সের এক্সপেক্টেড গোল (এক্সজি) ছিল ৩.০৪, যেখানে মরক্কোর মাত্র ০.১৪। শট সংখ্যাতেও বিশাল ব্যবধান; ফ্রান্স মোট ১৭টি শট নিলেও মরক্কো নিতে পেরেছে মাত্র ২টি, আর তার একটিও ছিল না লক্ষ্যে। অর্থাৎ পুরো ৯০ মিনিট প্লাস অতিরিক্ত সময়ে মরক্কোর কোনো শটই লক্ষ্যভেদ করতে পারেনি, যা প্রতিপক্ষের রক্ষণে ফ্রান্সের চাপের তীব্রতাই স্পষ্ট করে।
রেফারির শেষ বাঁশির সঙ্গে সঙ্গে উল্লাসে মেতে ওঠে ফ্রান্স। প্রথমার্ধে গোলশূন্য থাকার পর বিরতির পর ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি নিজেদের হাতে তুলে নেয় ফরাসিরা, আর এমবাপ্পে-দেম্বেলের গোলে বিশ্বকাপের শেষ আটেই থেমে যায় মরক্কোর যাত্রা। শুরু থেকে শৃঙ্খলাবদ্ধ রক্ষণে ভর করে লড়াই চালিয়ে গেলেও দ্বিতীয়ার্ধে ফ্রান্সের আক্রমণের তীব্রতা সামাল দিতে পারেনি আফ্রিকার দলটি।
ফ্রান্স ও মরক্কো এ পর্যন্ত মোট ছয়বার মুখোমুখি হয়েছে, যেখানে ফ্রান্সের জয় ৪টি, ড্র ২টি, আর মরক্কোর জয় নেই একটিও। ২০২২ কাতার বিশ্বকাপের সেমিফাইনালেও এই মরক্কোকে ২-০ গোলেই হারিয়ে ফাইনালে উঠেছিল ফ্রান্স। বোস্টনে সেই হারের প্রতিশোধ নেওয়ার সুযোগ পেয়েও তা কাজে লাগাতে পারেনি আফ্রিকার জায়ান্টরা। উল্টো আরও একবার ফ্রান্সের কাছে হেরে শেষ আটেই স্বপ্নভঙ্গ হলো আটলাস লায়ন্সদের, যদিও সাহসী ও লড়াকু পারফরম্যান্স উপহার দিয়ে মাথা উঁচু করেই টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় নিল তারা।
ম্যাচ শেষে চূড়ান্ত ফলাফল দাঁড়ায় ফ্রান্স ২-০ মরক্কো। ৬০ মিনিটে দেজিরে দোয়ের সহায়তায় প্রথম গোলটি করেন কিলিয়ান এমবাপ্পে, আর ৬৬ মিনিটে এমবাপ্পের সহায়তায় ব্যবধান দ্বিগুণ করেন উসমান দেম্বেলে। যদিও প্রথমার্ধে একটি পেনাল্টি আদায় করেছিল ফ্রান্স, তবে এমবাপ্পের সেই স্পট কিক দক্ষতার সঙ্গে ঠেকিয়ে দেন মরক্কোর গোলরক্ষক ইয়াসিন বুনু। শৃঙ্খলাগত দিক থেকে ম্যাচটি ছিল তুলনামূলক শান্ত। পুরো ৯০ মিনিট প্লাস অতিরিক্ত সময়ে কেবল একটি হলুদ কার্ড দেখেছেন ফ্রান্সের ইসা দিয়প। এছাড়া আর কোন দলই লাল কার্ডের মুখোমুখি হয়নি।
খেলোয়াড় বদলের দিক থেকে ৬৩ মিনিটে একসঙ্গে দুটি পরিবর্তন আনে মরক্কো, মাঠে নামান সোফিয়ান আমরাবাত ও সোফিয়ান রহিমিকে। অন্যদিকে, ফ্রান্স ৭৭ মিনিটে এমবাপ্পের পরিবর্তে নামায় জাঁ ফিলিপ মাতেতাকে। এই ম্যাচে দুটি উল্লেখযোগ্য রেকর্ডও তৈরি হয়েছে; ইয়াসিন বুনু তাঁর বিশ্বকাপ-ক্যারিয়ারে মোট ৪টি পেনাল্টি ঠেকিয়েছেন, যা ১৯৬৬ সালের পর যেকোনো গোলরক্ষকের জন্য সর্বোচ্চ; আর এমবাপ্পে বিশ্বকাপের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতার তালিকায় ২০ গোল নিয়ে উঠে এসেছেন দ্বিতীয় স্থানে, শীর্ষে থাকা লিওনেল মেসির চেয়ে পিছিয়ে আছেন মাত্র এক গোলে।
মতামত দিন