Views Bangladesh Logo

মাঠে নিখুঁত, স্পট-কিকে ব্যর্থ: পেনাল্টিতে মেসির রহস্যময় দুর্বলতার নেপথ্যে

আধুনিক ফুটবলের সবচেয়ে বড় বৈপরীত্যের নাম যেন লিওনেল মেসি। যে পা দিয়ে তিনি ৩০ গজ দূর থেকে বাঁক খাওয়ানো ফ্রি-কিকে বল জালে জড়ান, প্রতিপক্ষের রক্ষণ চিরে দেন সুইয়ের ছিদ্র দিয়ে সুতো গলানোর মতো নিখুঁত পাসে। সেই একই পা যখন খেলা থমকে যাওয়া অবস্থায় গোলরক্ষকের বিপরীতে মাত্র ১২ গজ দূর থেকে বল জালে পাঠাতে ব্যর্থ হয়, তখন এই কিংবদন্তিকেও নিতান্তই মানুষ বলে মনে হয়।

মিশরের বিপক্ষে আটলান্টায় আর্জেন্টিনার হৃদকম্পন বাড়ানো ৩-২ গোলের জয়ের ম্যাচে ২০ মিনিটের মাথায় স্পট-কিক নিতে যান মেসি। নিচু ও শরীর বরাবর শট নিলেও মিশরের তরুণ ও ছয় ফুট উচ্চতার গোলরক্ষক মোস্তফা শোবেইর বলের গতিপথ আগেভাগেই আঁচ করে ঝাঁপিয়ে তা রুখে দেন।

এই একটি মুহূর্তেই এমন এক রেকর্ডের ভাগীদার হলেন মেসি, যা তিনি নিজেই হয়তো ভুলে যেতে চাইবেন। চলতি বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বে অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে একটি পেনাল্টি মিসের পর এবার মিশরের বিপক্ষেও ব্যর্থ হয়ে তিনিই প্রথম ফুটবলার, যিনি এক বিশ্বকাপ আসরে ওপেন প্লেতে দুটি পেনাল্টি মিস করলেন।

সর্বকালের অন্যতম সেরা এই ফুটবলারের ক্যারিয়ারের পরিসংখ্যান ঘাঁটলে দেখা যায়, স্পট-কিকে তার সাফল্যের হার আসলে বিস্ময়করভাবে মামুলি। মিশরের বিপক্ষের মিসটি ছিল তার ক্যারিয়ারের ১৫০তম পেনাল্টি। এর মধ্যে ১১৬টি তিনি গোলে পরিণত করেছেন, ব্যর্থ হয়েছেন ৩৪ বার; সব মিলিয়ে সাফল্যের হার দাঁড়ায় ৭৭.৩ শতাংশ।

পেশাদার ফুটবলে গড়ে পেনাল্টি সফলতার হার প্রায় ৮০ শতাংশের কাছাকাছি থাকে বলে জানা যায়। কিন্তু বিশ্বকাপ মঞ্চে এসে মেসির এই পরিসংখ্যান রীতিমতো উদ্বেগজনক রূপ নেয়। শুট-আউট বাদ দিয়ে খেলার ভেতরে নেওয়া আটটি পেনাল্টির অর্ধেকই মিস করে তিনি একদিকে যেমন বিশ্বকাপ ইতিহাসে সর্বোচ্চ পেনাল্টি নেওয়ার রেকর্ড গড়েছেন, তেমনি একই সঙ্গে সর্বোচ্চ পেনাল্টি মিসের রেকর্ডও নিজের নামে করে নিয়েছেন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এর পেছনে লুকিয়ে আছে পেনাল্টি-কিকের এক মৌলিক সত্য। এটি মূলত একটি কারিগরি দক্ষতা নয়, বরং মনস্তাত্ত্বিক পরীক্ষা। মাঠের সাধারণ খেলায় মেসির প্রতিটি সিদ্ধান্ত সহজাত, বলের গতিবিধি ও প্রতিপক্ষের অবস্থানের ওপর নির্ভর করে মুহূর্তেই তৈরি হয়। কিন্তু পেনাল্টিতে খেলা থমকে যাওয়ায় সেই সহজাত, প্রবাহমান সিদ্ধান্তগ্রহণ প্রক্রিয়া বদলে যায় দীর্ঘ, বিশ্লেষণধর্মী এক হিসাব-নিকাশে।

ক্যারিয়ারজুড়ে মেসির পেনাল্টি নেওয়ার শারীরিক কৌশল ও রান-আপের ধরন বহুবার বদলেছে। যা থেকে স্পষ্ট হয়ে ওঠে, তার কোনো স্থায়ী, স্বস্তিদায়ক নির্দিষ্ট রুটিন নেই।
সাম্প্রতিক সময়ে মেসি বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ধীরগতির, ছন্দময় রান-আপের ওপর নির্ভর করেন। এই কৌশলের উদ্দেশ্য থাকে শরীর খোলা রেখে গোলরক্ষকের পায়ের নড়াচড়া পর্যবেক্ষণ করা, এবং গোলরক্ষক আগেভাগে কোনো দিকে ঝাঁপ দিলে বিপরীত কোণে বল পাঠিয়ে দেওয়া। কিন্তু আধুনিক প্রতিপক্ষ বিশ্লেষণ দল এই কৌশল রীতিমতো নিখুঁতভাবে পড়ে ফেলেছে। শোবেইরের মতো গোলরক্ষকদের এখন শেখানো হয় শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত নিজের অবস্থানে দাঁড়িয়ে থাকতে। গোলরক্ষক আগেভাগে না ঝাঁপালে মানসিক চাপ উল্টো গিয়ে পড়ে কিক নেওয়া খেলোয়াড়ের ওপর, যা তাকে বাধ্য করে তাড়াহুড়ো করে সিদ্ধান্ত নিতে।

এছাড়া মেসির রান-আপ প্রায়ই তার উদ্দেশ্য আগেভাগে ফাঁস করে দেয়। ক্যারিয়ারজুড়ে তিনি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন নিজের বাঁ দিকে, শরীর বরাবর শট নিতে। যখনই তিনি বিপরীত দিকে অর্থাৎ ডান কোণে শট নেওয়ার চেষ্টা করেন, তখন তার নিতম্বের অবস্থান ও রান-আপের কোণ থেকেই গোলরক্ষক আঁচ পেয়ে যান। শক্তির ওপর নির্ভর করে বল জালে পাঠানো খেলোয়াড়দের বিপরীতে মেসি মূলত নির্ভর করেন প্লেসমেন্ট আর প্রতারণার ওপর—গোলরক্ষক তার শরীরী ভাষা পড়ে ফেললে শটে প্রায়ই থাকে না প্রসারিত হাত ভেদ করার মতো যথেষ্ট গতি।

মিশরের বিপক্ষেও এই কারিগরি দুর্বলতা স্পষ্ট ছিল। অস্ট্রিয়ার বিপক্ষের ধীরগতির রান-আপের বিপরীতে এবার মেসি বেশি গতিতে শট নেওয়ার চেষ্টা করেন, কিন্তু বলের উচ্চতা এমন ছিল যে সঠিক দিকে অনুমান করা গোলরক্ষকের জন্য তা সহজেই রুখে দেওয়ার মতো ছিল। এর কিছুক্ষণ পরই, যেন ডেড-বল পরিস্থিতির সরলতাকে বিদ্রুপ করেই, মেসি দূর থেকে এক অসাধারণ বাঁকানো ফ্রি-কিক নেন, যা লেগে যায় গোলপোস্টে।

স্পট-কিকে বাঁ পায়ের এই মাঝেমধ্যের বিভ্রাট সত্ত্বেও খোলা মাঠে মেসির প্রতিভা এতটুকু ম্লান হয়নি। চিরচেনা ভঙ্গিতেই তিনি প্রথমার্ধের ব্যর্থতা পুরোপুরি ঝেড়ে ফেলে ম্যাচের শেষ দিকে নিজেকে প্রমাণ করেন। ক্রিস্তিয়ান রোমেরোর গোলে গুরুত্বপূর্ণ ক্রস বাড়ান, আর নিজে করেন অবিশ্বাস্য সমতাসূচক গোলটি।

শেষ পর্যন্ত নাটকীয়তা কাটিয়ে ৩-২ ব্যবধানে জিতে শিরোপা রক্ষার লড়াই টিকিয়ে রাখে আর্জেন্টিনা। তবে টুর্নামেন্ট যতই কোয়ার্টার ফাইনালের মতো উচ্চ চাপের পর্বের দিকে এগোবে, ১২ গজের দাগ থেকে জন্ম নেওয়া এই মনস্তাত্ত্বিক ভূত মেসিকে তাড়া করতেই থাকবে।

মতামত দিন

Avatar

ট্রেন্ডিং ভিউজ