গ্রুপ-‘সি’
হেক্সা' জয়ের মিশনে নামবে পাঁচ বারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ান ব্রাজিল
বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে সফল ও জনপ্রিয় দল হিসেবে আবারও বিশ্বমঞ্চে নামছে ব্রাজিল। পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন এই দলটি ঐতিহ্যগতভাবেই আক্রমণাত্মক, নান্দনিক ও সৃজনশীল ফুটবলের জন্য পরিচিত। তরুণ প্রতিভা ও অভিজ্ঞ খেলোয়াড়দের সমন্বয়ে এবারের দলটি গড়ে উঠেছে ভারসাম্যপূর্ণভাবে। শৈল্পিক ড্রিবলিং, দ্রুত পাসিং এবং ব্যক্তিগত দক্ষতার মাধ্যমে প্রতিপক্ষকে ছাপিয়ে যাওয়াই তাদের মূল শক্তি।
ব্রাজিল সাধারণত ৪-৩-৩ বা ৪-২-৩-১ ফরমেশনে খেলতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। আক্রমণভাগে গতি ও ফ্লেয়ার, মাঝমাঠে বল নিয়ন্ত্রণ এবং রক্ষণে সংগঠিত কাঠামোর সমন্বয়ে তারা একটি পূর্ণাঙ্গ দল হিসেবে নিজেদের তুলে ধরে। লাতিন আমেরিকার বাছাইপর্বে ধারাবাহিক ভালো পারফরম্যান্সের মাধ্যমে তারা বিশ্বকাপের টিকিট নিশ্চিত করে, যেখানে তাদের আক্রমণভাগের ধারাবাহিকতা ছিল চোখে পড়ার মতো।
বিশ্বকাপে অতীত রেকর্ড ও অংশগ্রহণ
ব্রাজিল বিশ্বকাপ ইতিহাসের সবচেয়ে সফল দল। তারা ১৯৫৮, ১৯৬২, ১৯৭০, ১৯৯৪ ও ২০০২ সালে বিশ্বকাপ জিতেছে। এছাড়া একমাত্র দল হিসেবে তারা প্রতিটি বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ করেছে। পেলে, গারিঞ্চা, জিকো, কারেকা, রোনালদো নাজারিও, রবার্তো কার্লোস, কাফু ও রোনালদিনিয়ো মতো বহু কিংবদন্তিদের হাত ধরে বিশ্ব ফুটবলে আধিপত্য বিস্তার করেছে দলটি। সাম্প্রতিক আসরগুলোতে তারা নিয়মিত নকআউট পর্বে উঠলেও ২০০২ সালের পর থেকে শিরোপা জয়ের স্বপ্ন পূরণ করতে পারেনি।
শক্তিমত্তা
ব্রাজিলের সবচেয়ে বড় শক্তি তাদের আক্রমণভাগ। দ্রুতগতির উইঙ্গার, দক্ষ ফরোয়ার্ড এবং সৃজনশীল মিডফিল্ডারদের কারণে যেকোনো মুহূর্তে ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে তারা। ব্যক্তিগত দক্ষতা, ড্রিবলিং এবং এক-অন-এক পরিস্থিতিতে এগিয়ে থাকার ক্ষমতা তাদের আলাদা করে। পাশাপাশি মাঝমাঠে বল দখল ও পাসিংয়ের দক্ষতা তাদের খেলাকে নিয়ন্ত্রণে রাখে। রক্ষণভাগেও সাম্প্রতিক সময়ে উন্নতি হয়েছে, যা দলটিকে আরও ভারসাম্যপূর্ণ করেছে।
দুর্বলতা
তবে কিছু সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। অনেক সময় অতিরিক্ত আক্রমণাত্মক খেলার কারণে রক্ষণে ফাঁক তৈরি হয়। শক্তিশালী ইউরোপীয় দলগুলোর বিপক্ষে মাঝমাঠে চাপের মুখে পড়তে দেখা যায়। এছাড়া গোলের সুযোগ তৈরি করলেও কখনো কখনো ফিনিশিংয়ে ধারাবাহিকতা থাকে না। বড় ম্যাচে মানসিক চাপও তাদের পারফরম্যান্সে প্রভাব ফেলতে পারে।
গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়
বর্তমান দলে আক্রমণভাগে বর্তমানে সৌদি আরবের ক্লাব আল হিলালে খেলা নেইমার জুনিয়র সবচেয়ে বড় তারকা, যিনি সৃজনশীলতা ও গোল-দুই ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। তরুণ প্রতিভা হিসেবে স্পেনের ক্লাব রিয়াল মাদ্রিদে খেলা ভিনিসিয়ুস জুনিয়র গতি ও ড্রিবলিংয়ে প্রতিপক্ষকে ভোগাতে পারেন। মাঝমাঠে ইংল্যান্ডের ক্লাব ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের কাসেমিরো দলের ভারসাম্য রক্ষা করেন এবং রক্ষণে সহায়তা দেন। ডিফেন্সে ফ্রান্সের ক্লাব পিএসজি’র হয়ে খেলা মারকিনিয়োস স্থিতিশীলতা এনে দেন। গোলপোস্টে ইংলিশ ক্লাব লিভারপুলের তারকা অ্যালিসন বেকার ব্রাজিল দলের নির্ভরতার প্রতীক হতে পারেন।
গ্রুপ প্রতিপক্ষ
সি গ্রুপে ব্রাজিলের প্রতিপক্ষ মরক্কো, হাইতি এবং স্কটল্যান্ড। মরক্কো সাম্প্রতিক সময়ে শৃঙ্খলাবদ্ধ রক্ষণ ও দ্রুত পাল্টা আক্রমণে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে নিজেদের প্রমাণ করেছে, যা ব্রাজিলের জন্য কঠিন চ্যালেঞ্জ হতে পারে। স্কটল্যান্ড শারীরিক শক্তি ও লড়াকু মানসিকতার জন্য পরিচিত, ফলে ম্যাচগুলো হবে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ। অন্যদিকে হাইতি তুলনামূলক দুর্বল হলেও তাদের গতি ও আত্মবিশ্বাস অবহেলার সুযোগ দেবে না। সামগ্রিকভাবে ব্রাজিল এগিয়ে থাকলেও প্রতিটি ম্যাচেই সর্বোচ্চ মনোযোগ ও পরিকল্পনা প্রয়োজন হবে।
এবারের বিশ্বকাপে সম্ভাবনা
ব্রাজিলের লক্ষ্য একটাই- শিরোপা পুনরুদ্ধার। যদি তারা আক্রমণভাগের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে পারে এবং রক্ষণে আরও দৃঢ়তা দেখাতে পারে, তবে ষষ্ঠবারের মতো বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়ে ‘হেক্সা’ জয়ের সম্ভাবনা অত্যন্ত উজ্জ্বল। প্রতিভা, অভিজ্ঞতা ও ঐতিহ্যের সমন্বয়ে ব্রাজিল আবারও বিশ্ব ফুটবলে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করতে উন্মুখ।

মতামত দিন
মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে