Views Bangladesh Logo

৫১৩ শিক্ষার্থীর আত্মহত্যা

মোকাবিলায় সমাধানসূত্র জরুরি

প্রবাদে আছে, মানুষ বাঁচার জন্য ভাসমান খড়কুটোও আঁকড়ে ধরে। তাহলে মানুষ কেন আত্মহত্যার মতো একটি ভয়াবহ পথ বেছে নেয়? সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, সাধারণত ডিপ্রেশন বা মানসিক চাপের কারণে আত্মহত্যার ঘটনা ঘটে? আর ডিপ্রেশন হচ্ছে সেই রোগ, যেটি মূলত চাওয়া-পাওয়ার পার্থক্যের কারণে সৃষ্টি হয়। এটা অনেকটা সামাজিক আর পারিবারিকভাবে সৃষ্ট।

গত রোববার (২৮ জানুয়ারি) প্রকাশিত একাধিক জাতীয় দৈনিকের প্রতিবেদনে জানা যায়, অভিমান, প্রেমঘটিত কারণ, পড়াশোনার চাপ, পারিবারিক দ্বন্দ্ব ও মানসিক সমস্যায় গত বছর ৫১৩ শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছেন। তাদের মধ্যে ৬০ শতাংশ নারী। সবচেয়ে বেশি আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে ঢাকা বিভাগে। বেসরকারি সংস্থা আঁচল ফাউন্ডেশন আয়োজিত এক ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য প্রকাশ করা হয়। আত্মহত্যা করেছেন এমন ৯৮ জন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীর মধ্যে ১৯ জন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের। সবচেয়ে বেশিসংখ্যক ৫ জন করে শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে।

শিক্ষার্থীদের এ আত্মহত্যার তথ্যের মধ্য দিয়ে সচেতন সমাজের কাছে বার্তা দেয়া হচ্ছে যে, শিক্ষার্থীরা ভালো নেই। এ জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এমন ব্যবস্থা থাকা দরকার, যেখানে বা যার কাছে শিক্ষার্থীরা তাদের কষ্টের কথাগুলো বলতে পারে। আত্মহত্যার আগে শিক্ষার্থীরা প্রচণ্ড মানসিক কষ্টে থাকে। ওই সময় কোনো শিক্ষকের কাছে কষ্টের কথা বলার সুযোগ পেলে আত্মহত্যার প্রবণতা কমবে। এ ছাড়া মা-বাবা হিসেবে সন্তানকে সময় দেয়া এবং তাদের চাওয়া-পাওয়ার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার প্রতিও জোর দিতে হবে।

জরিপের তথ্যমতে, স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসায় পড়ুয়া আত্মহত্যা করা শিক্ষার্থীদের বেশির ভাগই এ পথ বেছে নেয় পরিবারের সদস্যদের ওপর মান-অভিমানের কারণে। বিশেষজ্ঞরা বলেন, কেউ হয়তো মোটরসাইকেল কিনতে চেয়েছে, সেটি না পেয়ে অভিমান করে আত্মহত্যা করেছে। এ ছাড়া পারিবারিক কলহ, হতাশা, মানসিক সমস্যা, আর্থিক সমস্যা, উত্ত্যক্ত, ধর্ষণ ও যৌন হয়রানি, আপত্তিকর ছবি ফেসবুকে প্রকাশ, পরীক্ষায় অকৃতকার্য বা আশানুরূপ ফল করতে না পারা, পড়াশোনার চাপসহ নানা কারণ রয়েছে শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যার পেছনে।

স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা তাদের বয়সের কারণে একটা বয়ঃসন্ধিকাল অতিক্রম করে এবং এ সময়ে তাদের আবেগ নিয়ন্ত্রণ করাটাও কঠিন। মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ সময়টায় ছোট কোনো ঘটনাও প্রচণ্ড আবেগের জন্ম দিতে পারে। যার কারণে তারা হুটহাট নানা ধরনের মারাত্মক সিদ্ধান্ত নিয়ে নেয়। এ ক্ষেত্রে পরিবার, বিশেষ করে মা-বাবার সন্তান লালন-পালনের ধরন অনেক বড় ভূমিকা রাখে। যে পরিবারে সন্তানকে ছোট থেকে সব ধরনের আবদার মেনে নেয়া হয়, সে পরিবারের শিশুদের আবেগ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা কম থাকে। এ ধরনের শিশুরা সামাজিক মেলামেশা কম করে, কারণ তারা পারিপার্শ্বিক অবস্থার সঙ্গে খুব বেশি মানিয়ে নিতে চায় না।

এ ক্ষেত্রে সন্তানদের ছোটবেলা থেকে অতিরিক্ত প্রশ্রয় দিলে বা বড় হলে সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে, এমন মনোভাব পরোক্ষভাবে তাকে ঝুঁকির মধ্যেই ফেলে দেয়। কারণ সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তখন তাদের চাহিদাও বড় হতে থাকে। তাই মা-বাবার সচেতন হওয়া উচিত, কারণ তাদের অতিরিক্ত শাসন ও কঠোর নিয়ন্ত্রণ যেমন শিশুদের মধ্যে হীনম্মন্যতা তৈরি করে, তেমনি নিয়ন্ত্রণের রশি সন্তানের হাতে দিলেও সেটা মঙ্গলকর হয় না।

এমতাবস্থায় আত্মহত্যা মোকাবিলা করতে শিক্ষার্থীদের খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক চর্চার সুযোগ বাড়াতে হবে। সেই সঙ্গে সন্তানদের মানসিক বিকাশ এবং তাদের কথা সহানুভূতির সঙ্গে শুনতে ও বুঝতে অভিভাবকদের জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্যারেন্টিং কার্যক্রম চালু করা যেতে পারে। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যা থেকে দূরে রাখার জন্য স্কুল-কলেজসহ শিক্ষার প্রতিটি স্তরে পর্যাপ্ত কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। আসুন, আমরা আত্মহত্যাকে ‘না’ বলি, জীবনকে ভালোবাসি।

মতামত দিন

মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে

ট্রেন্ডিং ভিউজ