সোহেল রানার স্মৃতিতে ট্রানজিস্টারের যুগে বিশ্বকাপের উত্তেজনা
অভিজ্ঞ ও গুণী মানুষের সান্নিধ্য মানেই যেন সময়ের গহিন পথে এক অজানা অধ্যায়ের দরজা খুলে যাওয়া। তাঁদের স্মৃতির ভাণ্ডারে লুকিয়ে থাকে কালের গর্ভে হারিয়ে যাওয়া সোনালি দিনের গল্প—যে সময়গুলো আজকের প্রজন্মের কাছে অনেকটা রূপকথার মতো। অথচ তাঁদের বর্ণনায় সেই বিস্মৃত মুহূর্তগুলো আবারও জীবন্ত হয়ে ওঠে, ভেসে ওঠে কল্পনার পাতায়। এমনই এক স্মৃতিমাখা জগতে হারিয়ে গিয়েছিলাম কিংবদন্তি নায়ক সোহেল রানার সঙ্গে এক বিকেলের আলাপচারিতায়। তাঁর কথার পরতে পরতে যেন ফিরে এসেছিল বাংলাদেশে ট্রানজিস্টারের সময়ে ফিফা বিশ্বকাপ ফুটবলের এক হারিয়ে যাওয়া অধ্যায়।
কথায় কথায় বিশ্বকাপ ফুটবলের প্রসঙ্গ উঠতেই তিনি বললেন, ‘রাত জাগতে বেশ কষ্ট হয় ইদানিং, তারপরেও বিশ্বকাপের ফাইনাল খেলাটা দেখলাম বুঝেছ। আসলে আগামী বিশ্বকাপ পাব কিনা জানি না, তাই এই আসরের অন্তত শেষ ম্যাচটা মিস করতে চাচ্ছিলাম না।’ শেষের বাক্যটায় যেন এক বিষণ্নতা মিশে গেল বিকেলের আলোয়।
অপ্রিয় প্রসঙ্গ পাল্টাতে দ্রুত প্রশ্ন করলাম, কেমন ছিল আপনাদের তরুণ বয়সের বিশ্বকাপ ফুটবলের সেই সময়? তাঁর ঠোঁটের কোণে সেই পরিচিত বিজ্ঞ হাসি ফুটে উঠল। পুরোনো দিনের স্মৃতির দরজা খুলে দিয়ে তিনি বললেন, ‘তোমাদের সময়ের মতো এমন চোখধাঁধানো উদযাপন ছিল না। ঘরে ঘরে টেলিভিশন, মাঠে মাঠে বড় প্রজেক্টরের সামনে হাজারো তরুণ-তরুণী, তাদের গায়ে প্রিয় দলের জার্সি, বর্ণাঢ্য পতাকার সমুদ্র, আতশবাজি বা সামাজিক মাধ্যমের উন্মাদনা—এসব কিছুই ছিল না, এসব আমাদের কল্পনাতেও ছিল না। কারণ প্রযুক্তি তখন এতটা সহজলভ্য আর উন্নত ছিল না।’
‘আমরা তখন সদ্য স্বাধীন একটা দেশের দুর্বল অর্থনীতির সঙ্গে আরেকটা যুদ্ধে ব্যস্ত, দেশ পুনর্গঠনের কাজ চলছে। তার মধ্যে বিদ্যুৎ নাই, ঘরে ঘরে টেলিভিশন নাই, আমাদের একমাত্র ভরসা রেডিও। তারপরও আমাদের একটা শ্রেণির মধ্যে বিশ্বকাপ নিয়ে আগ্রহ ছিল আশ্চর্যজনকভাবে প্রবল। আমরা প্রথম ১৯৭৪ সালের পশ্চিম জার্মানি বিশ্বকাপ নিয়ে আগ্রহী হলাম। ১৯৭৪ এবং অনেকাংশে ১৯৭৮ সালে খুব অল্প কিছু মানুষ ম্যাচের ধারাভাষ্য শুনত রেডিওতে। বাংলাদেশ বেতারই ছিল একমাত্র ভরসা। বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিস, ভয়েস অব আমেরিকা, রেডিও অস্ট্রেলিয়া বা ডয়চে ভেলের মতো বিদেশি শর্টওয়েভ রেডিও ধরতে পারা ছিল এক ধরনের যুদ্ধ। ফলে কেউ তেমন সুযোগ পেতাম না। আমাদের ভরসা ছিল দৈনিক ইত্তেফাক, দৈনিক বাংলা, সংবাদ বা অবজারভারের ম্যাচ রিপোর্ট। সেসবে যে দু-একটা ছবি ছাপা হতো, সেটাই ছিল আমাদের একমাত্র আনন্দের উৎস।’
‘আর সেসময় বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি) ছিল একমাত্র টিভি চ্যানেল। কিন্তু এখনকার মতো সব ম্যাচ সরাসরি সম্প্রচার করা হতো না। অনেক ক্ষেত্রে সংক্ষিপ্ত অংশ বা পরে রেকর্ড করা হাইলাইট দেখানো হতো। সেটাও দেখতে পেত যাদের বাড়িতে টিভি ছিল আর তাদের খুব কাছের কিছু বন্ধুবান্ধব বা আত্মীয়স্বজন। তাদের সংখ্যা একদম হাতে গোনা ছিল। বড় শহরগুলোতে কিছু ক্লাব, অফিস, সরকারি কোয়ার্টার বা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে হয়তো একটা টিভি ঘিরে কয়েক ডজন মানুষ একসঙ্গে খেলা দেখতেন। তাই আমাদের বড় একটা অংশের একমাত্র ভরসা ছিল ট্রানজিস্টর। এখান থেকে ভাসা ভাসা যেসব তথ্য পেতাম, সেটা নিয়েই আমাদের আড্ডা চলত চায়ের দোকানে।’
‘ট্রানজিস্টরে ধারাভাষ্য শুনে শুনেই বাংলাদেশের শিক্ষিত তরুণদের একদল ১৯৭৪ সালে নেদারল্যান্ডসের জোহান ক্রুইফের ভক্ত হয়ে উঠল। এরপরের বিশ্বকাপে, ১৯৭৮ সালে, মারিও কেম্পেসের আর্জেন্টিনা নতুন ভক্ত তৈরি করল। সেসময় আর্জেন্টিনার শিরোপা জয়ের পর ঢাকার কিছু এলাকায় আনন্দ মিছিল হয়েছিল বলে শুনেছি।’
তখন আপনি কোন দলের সমর্থক ছিলেন—আমি প্রবল আগ্রহ নিয়ে প্রশ্নটা করলাম। তিনি হেসে বললেন, ‘আমি বিশ্বকাপ ফুটবল নিয়ে মাথা ঘামানো শুরু করলাম মূলত আশির দশকে। তখন ঢাকায় ঘরে ঘরে টেলিভিশনের সংখ্যা বেড়ে গেল, আর বিশ্বকাপ উন্মাদনার প্রকৃত বিস্ফোরণ ঘটল ১৯৮২ সালের স্পেন বিশ্বকাপ থেকে। তবে আমি ১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপের সময় দিয়েগো ম্যারাডোনার ভক্ত হয়ে উঠলাম। সেই মেক্সিকো বিশ্বকাপের পর আর্জেন্টিনা-ব্রাজিল, দুই দলের জন্যই পাগলামি বাংলাদেশের গ্রাম পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ল। তখন জিকো, পাওলো রোসি, প্লাতিনিদের মতো তারকারাও বাংলাদেশে নতুন ভক্ত তৈরি করে ফেললেন। এরপর থেকেই রাত জেগে খেলা দেখা আর প্রিয় দল নিয়ে তর্ক-বিতর্ক শুরু হলো। একসময় ধীরে ধীরে এটাই আমাদের সাধারণ সংস্কৃতির অংশ হয়ে উঠল।’
আমি আবার প্রশ্ন করলাম, তাহলে আপনি আর্জেন্টিনার ভক্ত ছিলেন? তিনি বললেন, ‘সেরকম না ব্যাপারটা। আমি ম্যারাডোনার ভক্ত ছিলাম, এটা সত্য। তবে তখন যে দেশে যত বেশি স্টার প্লেয়ার খেলত, সে দেশকে সমর্থন করতাম। আমার ব্যক্তিগত পছন্দ বলতে গেলে তখন ব্রাজিল, কারণ ব্রাজিলেই বেশি স্টার প্লেয়ার খেলত তখন। জিকো, সক্রেটিস, ফালকাও ও জুনিয়রদের নিয়ে গড়া ব্রাজিল দলকে তখন সবচেয়ে দক্ষ মনে হতো। আর ১৯৯৪ বা ১৯৯৮ সালের বিশ্বকাপে ব্রাজিলের ছিল রোমারিও, বেবেতো, রোনালদো নাজারিও, রিভালদো, ডুংগা, রবার্তো কার্লোস আর কাফু।’
তাহলে এবারও কি আপনি ব্রাজিলের সমর্থক ছিলেন? তিনি হেসে মাথা নাড়ালেন, ‘তোমাকে আগেই বলেছি, আমরা দল দেখে না, খেলোয়াড় দেখে ভক্ত হতাম। এবার বিশ্বকাপে যদি বলি, তাহলে বলব ব্রাজিল আর সেই ব্রাজিল নাই, সেরকম কিংবদন্তি আর শিল্পী ফুটবলার আর কাউকেই মনে হয়নি। এবারের আসরে সেরকম তারকাসমৃদ্ধ একমাত্র দল স্পেন। ইয়ামাল, পেদ্রি, রুইজ, ফাবিয়ান, নিকো—এরা সবাই চোখধাঁধানো খেলা দিয়ে মন জয় করেছে। এবার সেরা খেলোয়াড় রদ্রি, তুমি দেখেছ, ফাইনালে কীভাবে দলকে সে চ্যাম্পিয়ন বানিয়েছে। দারুণ। তবে এবার স্পেনের গোলরক্ষক যে গোল্ডেন গ্লাভস পেল, সেটা আসলে আমার ঠিক মনে হয়নি। কুকুরেয়া, পেদ্রো বা পাও কুবার্সি এরা থাকতে গোলরক্ষকের কোনো প্রয়োজনই ছিল না। আমার মতে, এবার সেরা গোলরক্ষক হওয়া উচিত ছিল আর্জেন্টিনার মার্তিনেজের। কারণ এদের ডিফেন্স এত বাজে ছিল যে মূল কষ্টটা মার্তিনেজই করেছে। মার্তিনেজ না থাকলে এবার আর্জেন্টিনা কত যে গোল খেত, আল্লাহই জানেন।’
হেসে ফেলে আবার প্রশ্ন করলাম, এবার কি মার্তিনেজ আপনার সেরা খেলোয়াড়? তিনি বললেন, ‘অনেকজন আমার প্রিয় এবার। মেসি, ইয়ামাল, রদ্রি, সাদিও মানে, সালাহ, এমবাপ্পে, হালান্ড। তবে স্পেনের পুরা দলই আমার পছন্দের ছিল।’
কিছুক্ষণের জন্য তিনি থেমে গেলেন। আবার সেই বিষণ্ন কণ্ঠে বললেন, ‘জানি না সামনের বিশ্বকাপ পর্যন্ত টিকে থাকতে পারব কিনা। সে পর্যন্ত বেঁচে থাকলে আর সুস্থ থাকলে হয়তো আবার স্পেনের এই ছেলেদের খেলা দেখার আগ্রহ থাকবে।’
কিছুক্ষণ নীরব থেকে আবার সেই অতীতে হারিয়ে গেলেন তিনি। পুরোনো গল্পের ঝাঁপি খুলে বসলেন, ‘আমাদের সময়, মানে সত্তরের দশকে, ফুটবল বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলা ছিল। মোহামেডান, আবাহনী (পরবর্তী সময়ে), ওয়ারী, ব্রাদার্স ইউনিয়ন, রহমতগঞ্জ—এসব ক্লাবের খেলা নিয়েও বিপুল আগ্রহ ছিল। তখন আমরা ভাবতাম, বাংলাদেশ এশিয়ার অন্যতম শক্তিশালী ফুটবল দল হয়ে উঠবে। পর্যাপ্ত অবকাঠামো, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, আধুনিক প্রশিক্ষণ এবং পেশাদার ব্যবস্থাপনার অভাবে সেই সম্ভাবনা এখন কেবল অসম্ভব মনে হয়। সেই জৌলুস তো আর দেখি না।’
ঘরের ভেতরে সন্ধ্যার বাতাসে ভর করে একটা বিষণ্নতা নেমে এল হঠাৎ করেই। সেই হতাশার সুর কাটিয়ে কিছুটা উত্তেজিত হয়ে তিনি বললেন, ‘আসলে আমার দল যদি বলি, সেটা বাংলাদেশ। মনে একটা আশা আছে, একদিন বাংলাদেশ এভাবে স্পেনের মতো বিশ্ব আসর মাতাবে। আমাদের ছেলেদের ভক্ত থাকবে সারাবিশ্বে। সেটা হয়তো আরও পঞ্চাশ বছর পরে। আমি সেসব দেখে যেতে পারব না, তবে বাংলাদেশের জন্য প্রার্থনা থাকবে যতদিন বেঁচে আছি।’
বাইরে সন্ধ্যা আরও গাঢ় হয়ে নেমে এল। ট্রানজিস্টারের যুগের বিশ্বকাপ দিয়ে শুরু হওয়া সেই আলোচনা শেষ হলো অর্ধশতাব্দী ধরে লালন করা এক স্বপ্নের ঘোরে।
মতামত দিন