ফিফার বিতর্কিত ভূমিকায় কোয়ার্টার ফাইনালে আর্জেন্টিনা
বিশ্বকাপের সবচেয়ে নাটকীয় প্রত্যাবর্তনের একটি লিখল আর্জেন্টিনা। দুই গোলে পিছিয়ে থেকে, অধিনায়ক লিওনেল মেসির পেনাল্টি মিসের বিষাদ পেরিয়ে শেষ পনেরো মিনিটে টানা তিন গোল করে মিশরকে ৩-২ ব্যবধানে হারিয়ে ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে উঠেছে বর্তমান চ্যাম্পিয়নরা। মঙ্গলবার (৭ জুলাই) বাংলাদেশ সময় রাত ১০টায় আটলান্টা স্টেডিয়ামে (মার্সিডিজ-বেঞ্জ স্টেডিয়াম) শুরু হওয়া রাউন্ড অব ১৬-এর এই লড়াই শেষ হয় রাত পৌনে ১২টা নাগাদ, যখন যোগ করা সময়ের দ্বিতীয় মিনিটে এনজো ফার্নান্দেজের হেডে জয়সূচক গোল পায় আলবিসেলেস্তেরা।
বিশ্বকাপের অন্যতম নাটকীয় ম্যাচ হিসেবে জায়গা করে নেওয়া আর্জেন্টিনা–মিশর লড়াই শুধু অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তনের জন্যই নয়, রেফারিং বিতর্কের কারণেও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে। ম্যাচজুড়ে ভিএআরের ব্যবহার, একাধিক বিতর্কিত সিদ্ধান্ত, পেনাল্টির আবেদন নাকচ এবং শেষ দিকে ফ্রি কিক দেওয়ার ধারাবাহিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে মিশর শিবির। ম্যাচ শেষের পর এসব সিদ্ধান্ত ঘিরে ফুটবলপ্রেমী ও বিশ্লেষকদের মধ্যেও শুরু হয়েছে তুমুল বিতর্ক।
বিশ্বকাপের ইতিহাসে সবচেয়ে নাটকীয় প্রত্যাবর্তনের একটি উপহার দিল বর্তমান চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা। দুই গোলে পিছিয়ে পড়া, অধিনায়ক লিওনেল মেসির পেনাল্টি মিস, প্রতিপক্ষ গোলরক্ষকের অবিশ্বাস্য দৃঢ়তা; সবকিছু মিলিয়ে ম্যাচ যখন প্রায় হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছিল, তখনই শেষ ১৫ মিনিটে অবিশ্বাস্যভাবে ঘুরে দাঁড়ায় আলবিসেলেস্তেরা। টানা তিন গোল করে ৩-২ ব্যবধানে মিশরকে হারিয়ে ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে জায়গা নিশ্চিত করেছে লিওনেল স্কালোনির দল।
মঙ্গলবার (৭ জুলাই) বাংলাদেশ সময় রাত ১০টায় আটলান্টার মার্সিডিজ বেঞ্জ স্টেডিয়ামে শুরু হওয়া রাউন্ড অব ১৬-এর ম্যাচটি শেষ পর্যন্ত রূপ নেয় বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম রোমাঞ্চকর লড়াইয়ে। যোগ করা সময়ের দ্বিতীয় মিনিটে এনজো ফার্নান্দেজের হেড থেকে আসে জয়সূচক গোল, যা বিশ্বকাপ ইতিহাসের ৩০০০তম গোল হিসেবেও রেকর্ডবুকে জায়গা করে নেয়।
ম্যাচের শুরু থেকেই আর্জেন্টিনাকে বিস্মিত করে মিশর। নিজেদের স্বাভাবিক আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলতে না দিয়ে দারুণ শৃঙ্খলাবদ্ধ রক্ষণ আর দ্রুত পাল্টা আক্রমণের কৌশলে এগিয়ে যায় আফ্রিকার দলটি। ১৫ মিনিটে মারওয়ান আতিয়ার নিখুঁত ক্রস থেকে শক্তিশালী হেডে গোল করে মিশরকে এগিয়ে দেন ইয়াসের ইব্রাহিম। চলতি বিশ্বকাপে এই প্রথমবার কোনো ম্যাচে পিছিয়ে পড়ে আর্জেন্টিনা।
পিছিয়ে পড়ার পর দ্রুত সমতায় ফেরার সুযোগও পেয়ে যায় বর্তমান চ্যাম্পিয়নরা। ২১ মিনিটে নিকোলাস তালিয়াফিকোকে বক্সের ভেতর ফাউল করলে পেনাল্টি দেয় রেফারি। কিন্তু স্পট কিক থেকে লিওনেল মেসির শট অসাধারণ দক্ষতায় ঠেকিয়ে দেন মিশরের গোলরক্ষক মোস্তফা শোবেইর। বিশ্বকাপ ইতিহাসে এটি ছিল মেসির চতুর্থ পেনাল্টি মিস। এর কয়েক মিনিট পর আবারও বক্সের বাইরে থেকে মেসির শক্তিশালী বাঁ পায়ের শট পোস্টে লেগে ফিরে আসে। এরপর অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার, হুলিয়ান আলভারেজ ও থিয়াগো আলমাদার একাধিক প্রচেষ্টাও ব্যর্থ করে দেন দুর্দান্ত ছন্দে থাকা শোবেইর।
প্রথমার্ধ শেষ হওয়ার আগ পর্যন্ত আর্জেন্টিনা বলের দখল ও আক্রমণে এগিয়ে থাকলেও গোলের দেখা পায়নি। অন্যদিকে সুযোগ পেলেই পাল্টা আক্রমণে ভয়ঙ্কর হয়ে উঠছিল মিশর। দ্বিতীয়ার্ধে নেমে আরও বড় ধাক্কা খাওয়ার উপক্রম হয় আর্জেন্টিনার। ৫৬ মিনিটে মোস্তফা জিকো বল জালে পাঠালেও ভিএআর পর্যালোচনায় দেখা যায়, আক্রমণের শুরুতে মারওয়ান আতিয়া লিসান্দ্রো মার্তিনেজকে ফাউল করেছিলেন। ফলে গোলটি বাতিল হয় এবং স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে আর্জেন্টিনা।
কিন্তু সেই স্বস্তি বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি। ৬৭ মিনিটে ডান প্রান্ত দিয়ে দুর্দান্ত এক আক্রমণ গড়ে তোলেন হাইসেম হাসান। তাঁর নিখুঁত নিচু ক্রস থেকে প্রথম ছোঁয়াতেই বল জালে জড়িয়ে নিজের গোলের খাতা খোলেন মোস্তফা জিকো। মুহূর্তেই ২-০ ব্যবধানে এগিয়ে যায় মিশর। স্টেডিয়ামজুড়ে তখন উৎসবের আবহ, আর আর্জেন্টিনার সমর্থকদের মুখে নেমে আসে হতাশা।
তবে বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যাওয়ার মানসিকতা। সেই লড়াইয়ের সূচনা হয় ৭৯ মিনিটে। লিওনেল মেসির দারুণ এক ক্রসে হেডে গোল করে ব্যবধান কমান ক্রিস্তিয়ান রোমেরো। সেই গোল যেন পুরো ম্যাচের গতি বদলে দেয়। মাত্র চার মিনিট পর আবারও জ্বলে ওঠেন মেসি। গঞ্জালো মন্তিয়েলের নিখুঁত পাস থেকে বক্সের ভেতরে প্রথম ছোঁয়াতেই বাঁ পায়ের দুর্দান্ত শটে শোবেইরকে পরাস্ত করে ম্যাচে সমতা ফেরান আর্জেন্টাইন অধিনায়ক। এই গোলের মাধ্যমে চলতি বিশ্বকাপে নিজের অষ্টম গোল করেন তিনি এবং সোনার বুটের দৌড়ে এককভাবে শীর্ষে উঠে যান।
সমতায় ফেরার পর আর্জেন্টিনা থেমে থাকেনি। জয়ের জন্য মরিয়া হয়ে একের পর এক আক্রমণ চালাতে থাকে তারা। অবশেষে যোগ করা সময়ের দ্বিতীয় মিনিটে আসে কাঙ্ক্ষিত মুহূর্ত। লাউতারো মার্তিনেজের নিখুঁত ক্রসে দুর্দান্ত হেডে বল জালে পাঠান এনজো ফার্নান্দেজ। মুহূর্তেই উল্লাসে ফেটে পড়ে মার্সিডিজ বেঞ্জ স্টেডিয়াম। এই গোলই নিশ্চিত করে ৩-২ ব্যবধানের অবিশ্বাস্য জয় এবং বিশ্বকাপ ইতিহাসের ৩০০০তম গোলের স্বীকৃতি।
পরিসংখ্যানেও ছিল আর্জেন্টিনার স্পষ্ট আধিপত্য। পুরো ম্যাচে তারা ১৯টি শট নেয়, যার মধ্যে ৯টি ছিল লক্ষ্যে। বিপরীতে মিশরের শট ছিল মাত্র ৫টি। বলের দখল, পাসের সফলতা ও প্রত্যাশিত গোল (এক্সজি) সব বিভাগেই এগিয়ে ছিল স্কালোনির দল। আর্জেন্টিনার এক্সজি ছিল ২.৮, যেখানে মিশরের ছিল মাত্র ০.৯৮। তবে এই সংখ্যার ব্যবধান মাঠের লড়াইকে পুরোপুরি প্রকাশ করতে পারে না। কারণ, মিশরের সংগঠিত রক্ষণ, দ্রুত পাল্টা আক্রমণ এবং মোস্তফা শোবেইরের অসাধারণ গোলরক্ষণ দীর্ঘ সময় পর্যন্ত ম্যাচে তাদের এগিয়ে রেখেছিল।
ম্যাচ যত শেষের দিকে গড়িয়েছে, ততই উত্তেজনা বেড়েছে। হতাশা থেকে একের পর এক হলুদ কার্ড দেখে মিশরের খেলোয়াড়রা। যোগ করা সময়ের চতুর্থ মিনিটে হামদি ফাতহি, এরপর রেফারির সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ করায় গোলরক্ষক মোস্তফা শোবেইর, পরে মারওয়ান আতিয়া এবং শেষ বাঁশি বাজার পর হাইসেম হাসানও হলুদ কার্ড দেখেন। পুরো ম্যাচে কোনো লাল কার্ড না হলেও শেষ মুহূর্তে পেনাল্টির দাবিতে মিশরের তীব্র প্রতিবাদ ঘিরে কিছুটা উত্তেজনা তৈরি হয়।
কৌশলগত দিক থেকেও ম্যাচে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন দুই কোচ। দ্বিতীয়ার্ধে লিওনেল স্কালোনি নাহুয়েল মোলিনার পরিবর্তে গঞ্জালো মন্তিয়েলকে নামান। সেই পরিবর্তনই ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেয়, কারণ মন্তিয়েলের পাস থেকেই আসে মেসির সমতাসূচক গোল। পরে ফাকুন্দো মেদিনা, নিকোলাস ওতামেন্দি ও অন্যান্য পরিবর্তনের মাধ্যমে আক্রমণ ও রক্ষণে ভারসাম্য আনেন তিনি। অন্যদিকে মিশরের কোচও ত্রেজেগে, ওমর মারমুশ ও জিজোকে মাঠে নামিয়ে ম্যাচের গতি ধরে রাখার চেষ্টা করেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত আর্জেন্টিনার আক্রমণের সামনে তাদের প্রতিরোধ ভেঙে পড়ে।
এই ম্যাচে আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ রেকর্ড গড়েছেন লিওনেল মেসি। টানা ষষ্ঠ নকআউট ম্যাচে গোল করার কীর্তি গড়েছেন তিনি। চলতি বিশ্বকাপে পাঁচটি ম্যাচের প্রতিটিতেই গোল করেছেন আর্জেন্টাইন অধিনায়ক। আট গোল নিয়ে এখন সোনার বুটের লড়াইয়ে এককভাবে শীর্ষে রয়েছেন তিনি। তাঁর পেছনে সাত গোল করে আছেন ফ্রান্সের কিলিয়ান এমবাপে এবং নরওয়ের আর্লিং হলান্ড।
এদিকে, ম্যাচ শেষে রেফারিং ইস্যুতে উত্তাল ফুটবল অঙ্গন। মিশর শিবিরের অভিযোগ, ম্যাচের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি সিদ্ধান্ত তাদের বিপক্ষে গেছে। দ্বিতীয়ার্ধের ৫৯তম মিনিটে মোস্তফা জিকোর করা গোল ভিএআর পর্যালোচনার পর অফসাইডের কারণে বাতিল করা হয়, যদিও মিশরের দাবি ছিল সিদ্ধান্তটি অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও বিতর্কিত। এছাড়া আর্জেন্টিনার বক্সে একই ধরনের দুইটি ট্যাকলের ঘটনায় পেনাল্টির জোরালো আবেদন জানালেও রেফারি তা আমলে নেননি এবং ভিএআর থেকেও হস্তক্ষেপ করা হয়নি বলে ক্ষোভ প্রকাশ করে মিশর।
শেষ ১৫ মিনিটে আর্জেন্টিনার পক্ষে একের পর এক ফ্রি কিক দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। মিশরের অভিযোগ, কয়েকটি ক্ষেত্রে স্পষ্ট ফাউল না থাকলেও আর্জেন্টিনা ফ্রি কিক পেয়েছে, যা তাদের ওপর ক্রমাগত চাপ তৈরি করে এবং শেষ পর্যন্ত ম্যাচের গতিপথ বদলে দেয়। উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতিতে প্রতিবাদ জানাতে গিয়ে মিশরের কোচিং স্টাফের এক সদস্যও লাল কার্ড দেখেন। এসব সিদ্ধান্তকে ঘিরে ম্যাচ শেষের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন ফুটবল বিশ্লেষকের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে।
আর্জেন্টিনা ও মিশরের মধ্যকার এটি ছিল তৃতীয় সাক্ষাৎ এবং প্রতিযোগিতামূলক ফুটবলে প্রথম। এর আগে ১৯২৮ সালের অলিম্পিক সেমিফাইনাল এবং ২০০৮ সালের একটি প্রীতি ম্যাচেও জয় পেয়েছিল আর্জেন্টিনা। সেই ধারাবাহিকতা এবারও ধরে রাখল আলবিসেলেস্তেরা।
রাউন্ড অব ৩২-এ কেপ ভার্দের বিপক্ষে অতিরিক্ত সময়ে কষ্টার্জিত জয়ের পর এবারও বড় পরীক্ষা উতরে গেল বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা। তবে টানা দ্বিতীয় নকআউট ম্যাচে পিছিয়ে পড়ে জয় পাওয়া তাদের জন্য সতর্কবার্তাও হয়ে থাকল।
আগামী শনিবার কানসাস সিটিতে কোয়ার্টার ফাইনালে আর্জেন্টিনার প্রতিপক্ষ হবে সুইজারল্যান্ড ও কলম্বিয়ার মধ্যকার ম্যাচের বিজয়ী দল। অন্যদিকে ইতিহাসের সেরা বিশ্বকাপ অভিযানের স্বপ্ন দেখা মিশরের যাত্রা থেমে গেল শেষ ষোলোতেই। দুর্দান্ত লড়াই, সাহসী ফুটবল এবং মোহামেদ সালাহর নেতৃত্ব সত্ত্বেও আফ্রিকার প্রতিনিধিরা শেষ পর্যন্ত বিদায় নিলেও বিশ্বকাপের অন্যতম স্মরণীয় ম্যাচ উপহার দিয়ে বিদায় জানাল।
মতামত দিন