Views Bangladesh Logo

বিশ্বকাপের স্বত্ব বিক্রি বিতর্কে নড়বড়ে ইনফান্তিনো, ফিফার আসবে নতুন নেতৃত্ব?

বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফার ইতিহাসে এমন রাজনৈতিক চাপ, সাংগঠনিক প্রতিরোধ এবং নেতৃত্বের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন খুব কমই দেখা গেছে। বিশ্বকাপের বাণিজ্যিক স্বত্ব বা শেয়ারের একটি অংশ বেসরকারি খাতে বিক্রির বিতর্কিত পরিকল্পনা ঘিরে যে সংকট তৈরি হয়েছিল, সেটি শেষ পর্যন্ত শুধু একটি প্রস্তাব প্রত্যাহারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর রাজনৈতিক কর্তৃত্ব, আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা এবং আগামী নির্বাচনে তার জয়ের সম্ভাবনাকেও বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে ঠেলে দিয়েছে।

প্রবল সমালোচনা, ইউরোপীয় ফুটবলের বিশ্বকাপ বয়কটের প্রকাশ্য হুমকি এবং ফিফার ভেতরকার অসন্তোষের মুখে শেষ পর্যন্ত পরিকল্পনা থেকে সরে আসতে বাধ্য হন ইনফান্তিনো। এরপর থেকেই আন্তর্জাতিক ফুটবল অঙ্গনে একটি প্রশ্নই সবচেয়ে বেশি আলোচিত বিষয় হচ্ছে- ২০২৭ সালের মার্চে ফিফা কংগ্রেসে তিনি কি সত্যিই চতুর্থ মেয়াদ নিশ্চিত করতে পারবেন, নাকি দীর্ঘদিন পর সংস্থাটি নতুন নেতৃত্বের পথে হাঁটবে?

৫৬ বছর বয়সী সুইস এই প্রশাসকের সামনে সংকটের গভীরতা বোঝা যায় সদস্য দেশগুলোর অভূতপূর্ব অবস্থান থেকে। জানা গেছে, বিতর্কিত প্রস্তাবের পক্ষে সমর্থন আদায় করতে সদস্য দেশগুলোর জন্য প্রায় চার কোটি ডলার, বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৪৭২ কোটি টাকার অনুদানের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। উদ্দেশ্য ছিল প্রয়োজনীয় ভোট নিশ্চিত করা। কিন্তু সেই কৌশলও শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয়।

সবচেয়ে বড় ধাক্কা আসে ইউরোপ থেকে। উয়েফার ৫৫টি সদস্য ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন স্পষ্ট জানিয়ে দেয়, বিশ্বকাপের স্বত্ব বেসরকারি খাতে বিক্রির সিদ্ধান্ত অনুমোদন পেলে তারা পরবর্তী বিশ্বকাপ বয়কট করবে। ফুটবল ইতিহাসে এটি ছিল নজিরবিহীন সতর্কবার্তা।

এরপর পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। উয়েফার অবস্থানের প্রতি সমর্থন জানিয়ে একই কাতারে দাঁড়ায় উত্তর, মধ্য আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চলের ফুটবল সংস্থা কনকাকাফ এবং এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশন (এএফসি)। তিন মহাদেশের এই ঐক্যবদ্ধ অবস্থান কার্যত ফিফা সভাপতির রাজনৈতিক ভিত্তিকেই প্রশ্নের মুখে ফেলে দেয়।

ফিফার সংবিধান অনুযায়ী এমন একটি প্রস্তাব পাস করাতে প্রয়োজন ছিল ১০৬ ভোট। কিন্তু উয়েফা, কনকাকাফ ও এএফসি একসঙ্গে বিরোধিতা করায় মোট ১৩৬টি ভোট কার্যত ইনফান্তিনোর বিপক্ষে অবস্থান নেয়। অর্থাৎ ভোটাভুটিতে যাওয়ার আগেই তিনি বুঝতে পারেন, এই লড়াইয়ে জয়ের কোনো বাস্তব সম্ভাবনা নেই। শেষ পর্যন্ত প্রস্তাব প্রত্যাহারই হয়ে ওঠে তার একমাত্র পথ।

পর্যবেক্ষকদের মতে, এটি কেবল একটি নীতিগত পরাজয় নয়; বরং নেতৃত্বের ওপর আস্থার বড় সংকেত। দীর্ঘদিন ধরে ইনফান্তিনো ফিফার বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প, আর্থিক সহায়তা এবং বৈশ্বিক সম্প্রসারণের মাধ্যমে সদস্য দেশগুলোর সমর্থন ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছিলেন। কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনায় দেখা গেল, প্রয়োজনের মুহূর্তে বিশ্বের তিনটি বড় ফুটবল জোট একই অবস্থানে দাঁড়িয়ে তার সিদ্ধান্তকে প্রত্যাখ্যান করেছে।

সংকটের পর ইনফান্তিনো অবশ্য সমঝোতার পথেই হাঁটার বার্তা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, সব পক্ষকে এক টেবিলে বসিয়ে আলোচনার মাধ্যমে সমাধান খোঁজা হবে এবং বিশ্ব ফুটবলের ঐক্য অক্ষুণ্ন রাখাই এখন প্রধান লক্ষ্য। তবে বিশ্লেষকদের মতে, এই অবস্থান অনেকটাই প্রতিরক্ষামূলক এবং পরিস্থিতির চাপে নেওয়া সিদ্ধান্ত।

এমন বাস্তবতায় আগামী ২০২৭ সালের ফিফা সভাপতি নির্বাচন নতুন মাত্রা পেতে পারে বলে মনে করছেন ফুটবল বিশ্লেষকরা। গত কয়েকটি নির্বাচনে ইনফান্তিনোর বিরুদ্ধে শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে ওঠেনি। কিন্তু এবার পরিস্থিতি ভিন্ন। ইউরোপ, উত্তর ও মধ্য আমেরিকা এবং এশিয়ার অভিন্ন অবস্থান প্রমাণ করেছে, প্রয়োজনে তারা একসঙ্গে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম।

এই প্রেক্ষাপটে বিভিন্ন কনফেডারেশনের সমর্থনে নতুন কোনো প্রার্থী সামনে আসার সম্ভাবনাও এখন গুরুত্বের সঙ্গে আলোচিত হচ্ছে। যদিও এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো নাম ঘোষণা করা হয়নি, তবু ইউরোপীয় ফুটবল প্রশাসনের অভিজ্ঞ কোনো কর্মকর্তা কিংবা অন্য কোনো কনফেডারেশনের গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিকে প্রার্থী হিসেবে সামনে আনার আলোচনা পর্দার আড়ালে শুরু হয়েছে বলে কূটনৈতিক সূত্রগুলোর দাবি। লক্ষ্য হবে এমন একজনকে তুলে ধরা, যিনি বাণিজ্যিক স্বার্থের চেয়ে সদস্য দেশগুলোর আস্থা ও ফিফার প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতাকে অগ্রাধিকার দেবেন।

ফলে ২০২৭ সালের নির্বাচন এখন আর কেবল একজন সভাপতির পুনর্নির্বাচনের প্রশ্ন নয়; এটি বিশ্ব ফুটবলের ভবিষ্যৎ পরিচালনার দর্শন, ক্ষমতার ভারসাম্য এবং ফিফার শাসনব্যবস্থার ওপর আস্থার এক বড় পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে। বিশ্বকাপের স্বত্ব বিক্রির পরিকল্পনা থেকে সরে এসে ইনফান্তিনো হয়তো তাৎক্ষণিক সংকট এড়াতে পেরেছেন। কিন্তু এই ঘটনায় যে রাজনৈতিক ক্ষয় তৈরি হয়েছে, তা আগামী নির্বাচনের আগেই পূরণ করা তার জন্য সহজ হবে না। বরং প্রথমবারের মতো তার নেতৃত্বের বিপরীতে একটি শক্তিশালী বিকল্প নেতৃত্বের সম্ভাবনা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

মতামত দিন

Avatar

ট্রেন্ডিং ভিউজ