'জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করতে ব্যর্থ হলে নতুন করে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করতে পারে'
বাংলাদেশের নতুন সরকার জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করতে ব্যর্থ হলে নতুন করে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করতে পারে বলে সতর্কবার্তা দিয়েছে ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপ (আইসিজি)।
সংস্থাটির সর্বশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি মাইলফলক হলেও, নতুন সরকারের সামনের পথটি অত্যন্ত কঠিন। যদিও সরকারের প্রতি জনগণের শক্তিশালী সমর্থন বা ম্যান্ডেট রয়েছে, তবুও বিএনপির অতীতের কর্মকাণ্ডের কারণে তাদের দায়িত্ব পালনের সক্ষমতা নিয়ে বাংলাদেশের অনেকের মধ্যেই সংশয় রয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) নেতৃত্বাধীন নতুন সরকারের সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জগুলোর মধ্যে রয়েছে—অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করা, সুশাসন নিশ্চিত করা এবং ঝুঁকিপূর্ণ আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির মোকাবিলা করা।
বৃহস্পতিবার (২৩ এপ্রিল) প্রকাশিত ‘বাংলাদেশের নতুন সরকার কাজে নেমে পড়েছে’ শীর্ষক প্রতিবেদনে আইসিজি বলেছে, সরকারকে বিরোধী দলগুলোর সঙ্গে সংঘাত এড়িয়ে রাজনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে।
আইসিজি বলেছে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, বিশেষ করে ইরানকে ঘিরে উত্তেজনার কারণে জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, যা বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর অর্থনীতির জন্য বড় ঝুঁকি। এতে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমে যাওয়া, মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি এবং প্রবৃদ্ধি হ্রাসের আশঙ্কা রয়েছে। এই পরিস্থিতি মোকাবেলা করে অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখা সরকারের জন্য বড় পরীক্ষা হবে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ক্ষমতায় এসে সংস্কারের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করা বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের জন্য জরুরি। তবে এ ক্ষেত্রে বিরোধী দলগুলোর সঙ্গে সংঘাত এড়ানো এবং রাজনৈতিক প্রতিহিংসার বদলে অন্তর্ভুক্তিমূলক নীতি গ্রহণ করা গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষ করে পরিস্থিতি যা-ই হোক, অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জগুলোর ওপর মনোযোগ দিতে সরকারের উচিত হবে ‘জুলাই সনদ’ নিয়ে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের সঙ্গে বড় ধরনের সংঘাত এড়ানোর সর্বোচ্চ চেষ্টা করা।
প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-র উচিত আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলাগুলো পর্যালোচনা করা।
দেশের অন্যতম বড় রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে আইসিজি। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দলটির ওপর নিষেধাজ্ঞা দীর্ঘায়িত করা রাজনৈতিকভাবে আকর্ষণীয় মনে হলেও বাস্তবে তা অস্থিতিশীলতা বাড়াতে পারে। দলটির পুনর্বাসনের ক্ষেত্রে নেতৃত্ব পরিবর্তন একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, সজীব ওয়াজেদ জয়-এর মতো সম্ভাব্য উত্তরসূরি সামনে এলে দলটির সমর্থকদের জন্য পরিবর্তন মেনে নেওয়া সহজ হতে পারে। তবে শুধু নেতৃত্ব পরিবর্তন নয়, অতীত কর্মকাণ্ডের জন্য দায় স্বীকার করাও জরুরি।
আইসিজি বলেছে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ছিল একটি বড় অভিযোগ। নতুন সরকারের জন্য এটি পুনরুদ্ধার করা বড় চ্যালেঞ্জ। একই সঙ্গে বিচারব্যবস্থাকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার না করার আহ্বান জানানো হয়েছে। প্রতিবেদনে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি চীন ও যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্যান্য আন্তর্জাতিক অংশীদারের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি বজায় রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।
সব মিলিয়ে ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপ মনে করছে, সরকারের সামনে একটি সীমিত সময়ের সুযোগ রয়েছে, এই সময়ের মধ্যেই কার্যকর সংস্কার পদক্ষেপ নিয়ে জনগণের আস্থা ধরে রাখতে না পারলে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অস্থিরতা আবারও তীব্র হয়ে উঠতে পারে।

মতামত দিন
মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে