তীব্র গরমে দক্ষিণ এশিয়ায় বছরে ক্ষতি ৩ কোটি ১০ লাখ পূর্ণকালীন চাকরির সমান: বিশ্বব্যাংক
তীব্র গরমের কারণে দক্ষিণ এশিয়ায় প্রতিবছর প্রায় ৩ কোটি ১০ লাখ পূর্ণকালীন চাকরির সমপরিমাণ ক্ষতি হচ্ছে এবং এই ধারা অব্যাহত থাকলে ২০৫০ সাল নাগাদ অঞ্চলটির অর্থনীতি প্রায় ৭ শতাংশ সংকুচিত হবে। বিশ্বব্যাংকের নতুন এক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।
‘এ লিভেবল ফিউচার: প্রোটেক্টিং জবস অ্যান্ড গ্রোথ ফ্রম এক্সট্রিম হিট ইন সাউথ এশিয়াস সিটিজ’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০৭০ সাল নাগাদ দক্ষিণ এশিয়ার প্রায় ৫২ কোটি মানুষ বছরে অন্তত এক মাস বিপজ্জনক মাত্রার গরমের মুখোমুখি হতে পারে, যা বর্তমানের চার গুণ। বিশ্বব্যাংকের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানানো হয়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০৫০ সাল নাগাদ দক্ষিণ এশিয়ায় কর্মক্ষম বয়সী আরও ২৮ কোটি মানুষ যুক্ত হতে যাচ্ছে। এমন সময়ে বাড়তি তাপমাত্রা অঞ্চলটির কর্মসংস্থান, উৎপাদনশীলতা ও দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য সবচেয়ে বড় হুমকিগুলোর একটি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তীব্র গরম এখনই শ্রমের উৎপাদনশীলতা কমিয়ে দিচ্ছে, ব্যবসা-বাণিজ্যে বিঘ্ন ঘটাচ্ছে এবং দক্ষিণ এশিয়ার শহরগুলোর প্রতিযোগিতা-সক্ষমতাকে ঝুঁকিতে ফেলছে। একই সঙ্গে এটি স্বাস্থ্যব্যবস্থা ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর ওপর চাপ বাড়াচ্ছে। এর সবচেয়ে বড় ধাক্কা পড়ছে নিম্ন আয়ের পরিবার, অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমিক, নারী, প্রবীণ ও শিশুদের ওপর।
বিশ্বব্যাংকের দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক ভাইস প্রেসিডেন্ট ইয়োহানেস জুট বলেন, ‘দক্ষিণ এশিয়ার শহরগুলো এই অঞ্চলের ভবিষ্যতের কেন্দ্রবিন্দু, কিন্তু বাড়তি তাপমাত্রা কর্মসংস্থান, জীবিকা ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে ঝুঁকিতে ফেলছে।’ তিনি বলেন, ‘তাপসহনশীল শহর গড়ে তোলার বিষয়টি কেবল বাড়তি তাপমাত্রা থেকে মানুষকে রক্ষা করা নয়। এটি কর্মসংস্থান সুরক্ষা, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং শহরগুলোকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির চালিকাশক্তি হিসেবে টিকিয়ে রাখার বিষয়। এখনই পদক্ষেপ নিলে দেশগুলো আরও সহনশীল, প্রতিযোগিতা-সক্ষম ও বাসযোগ্য শহর গড়ে তুলতে পারবে, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সুযোগ তৈরি করবে।’
কর্মসংস্থান, উৎপাদনশীলতা ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির দৃষ্টিকোণ থেকে তীব্র গরমের প্রভাব পরীক্ষা করা হয়েছে প্রতিবেদনটিতে। এতে দেখানো হয়েছে, বাড়তি তাপমাত্রা কীভাবে শ্রমিক, ব্যবসা, অবকাঠামো, সরকারি সেবা ও নগর-অর্থনীতিকে প্রভাবিত করে। প্রতিবেদনের যুক্তি, তীব্র গরমকে আর মৌসুমি দুর্যোগ হিসেবে দেখা চলবে না; বরং এটিকে উন্নয়নের একটি কেন্দ্রীয় অগ্রাধিকার হিসেবে নগর পরিকল্পনা, অবকাঠামো বিনিয়োগ, সরকারি নীতি ও বেসরকারি খাতের বিকাশে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
নীতিনির্ধারকদের জন্য একটি বাস্তবসম্মত রূপরেখাও দেওয়া হয়েছে প্রতিবেদনে, যা বিদ্যমান প্রতিষ্ঠান ও অর্থায়ন ব্যবস্থার মাধ্যমেই বাস্তবায়ন করা সম্ভব। সুপারিশগুলোর মধ্যে রয়েছে তাপসহনশীল অবকাঠামোয় বিনিয়োগ, হিট অ্যাকশন প্ল্যান শক্তিশালী করা, ঝুঁকিপূর্ণ শ্রমিকদের সুরক্ষা, টেকসই শীতলীকরণ ব্যবস্থার বিস্তার, আগাম সতর্কতা ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং সরকারি-বেসরকারি বিনিয়োগ সংগ্রহ।
যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্র, কমনওয়েলথ ও উন্নয়ন দপ্তরের এশিয়া-প্যাসিফিকবিষয়ক ক্লাইমেট রেজিলিয়েন্স লিড জন ওয়ারবার্টন বলেন, ‘দক্ষিণ এশিয়াজুড়ে তীব্র গরম জীবিকা ধ্বংস করছে, জনস্বাস্থ্যে প্রভাব ফেলছে, উৎপাদনশীলতা কমিয়ে দিচ্ছে এবং সবচেয়ে অসহায় মানুষকে আরও দারিদ্র্যের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।’ তিনি বলেন, ‘এটি একটি উন্নয়ন সংকট, যার মোকাবিলায় সব খাতে ধারাবাহিক পদক্ষেপ প্রয়োজন।’
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সমাধানের অনেক উপায় ইতিমধ্যেই বিদ্যমান। দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন শহর দেখিয়ে দিচ্ছে, হিট অ্যাকশন প্ল্যান, সহনশীল অবকাঠামো, নগর-সবুজায়ন, আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা ও দক্ষ শীতলীকরণ কীভাবে প্রাণ বাঁচাতে, শ্রমিকদের সুরক্ষা দিতে এবং অর্থনৈতিক ক্ষতি কমাতে পারে। তবে এসব উদ্যোগের পরিধি বাড়াতে দরকার আরও শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, উন্নত সমন্বয় এবং বেশি সরকারি-বেসরকারি বিনিয়োগ।
দক্ষিণ এশিয়ায় নগরায়ণ যত বাড়ছে, সরকারগুলো আজ যে সিদ্ধান্ত নেবে তা-ই নির্ধারণ করবে শহরগুলো কর্মসংস্থান, উদ্ভাবন ও প্রবৃদ্ধির চালিকাশক্তি হয়ে থাকবে, নাকি বাড়তি তাপমাত্রার কারণে ক্রমেই সংকুচিত হয়ে পড়বে—প্রতিবেদনে এমন সতর্কবার্তাও দেওয়া হয়েছে।
যুক্তরাজ্য সরকারের পররাষ্ট্র, কমনওয়েলথ ও উন্নয়ন দপ্তরের ‘ক্লাইমেট অ্যাকশন ফর আ রেজিলিয়েন্ট এশিয়া’ কর্মসূচির অর্থায়নে পরিচালিত ‘রেজিলিয়েন্ট এশিয়া প্রোগ্রাম’-এর সহায়তায় প্রতিবেদনটি প্রস্তুত করা হয়েছে। এ ছাড়া বিশ্বব্যাংকের ‘গ্লোবাল ফ্যাসিলিটি ফর ডিজাস্টার রিডাকশন অ্যান্ড রিকভারি’ ও ‘সিটি রেজিলিয়েন্স প্রোগ্রাম’ও সহায়তা দিয়েছে।
মতামত দিন