Views Bangladesh Logo

শখ করে হাতি পুষছে পিডিবি

থায় বলে শখের তোলা নাকি আশি টাকা। তবে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির এই বাজারে শখের দাম বেড়েছে বহুগুণ। সেই আশি টাকায় আর শখ পূরণ হয় না। এই শখ মেটাতে মানুষ কি না করে। কখনো কখনো শোনা যায় মানুষ নাকি শখ করে হাতি পোষে। রূপক অর্থে এই হাতি ব্যবহার হলেও মানুষ শখ করে এমন সব অপ্রয়োজনীয় কাজ করে, যা না করলেও চলত। তবে শুধু সৌখিন মানুষ নয় কোনো কোনো সময় সরকারি প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রেও এমন হাতি পোষার নজির দেখা যায়। বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) এমন দশটি বিদ্যুৎকেন্দ্র রয়েছে যেগুলো শখ করে অনেকটা হাতি পোষার মতোই।

বিদ্যুৎকেন্দ্র বিদ্যুৎ উৎপাদন করবে এটিই স্বাভাবিক; কিন্তু কোনো কেন্দ্র যদি বিদ্যুৎ উৎপাদন না করে নিজের চলার জন্য প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ বাইরে থেকে সরবরাহ নেয় তাহলে কেমন হয়! আশ্চর্যজনক হলেও খোদ পিডিবিরই এমন কিছু বিদ্যুৎকেন্দ্র রয়েছে যেগুলো সারা বছর এক মিনিটের জন্যও চলেনি। কেন্দ্রগুলোতে মেশিনপত্র, লোকবল সবই আছে কেবল এখান থেকে বিদ্যুৎই পাওয়া যায় না; কিন্তু বছর বছর কেন্দ্রগুলো সচল রাখতে অনেকটা হাতির খোরাকের মতোই বিপুল পরিমাণ অর্থের প্রয়োজন হয়।

প্রতিষ্ঠানটির নিজেদের ২০২২-২৩ অর্থবছরের বার্ষিক প্রতিবেদনেই এমন তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। পিডিবির মোট ৫১টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মধ্যে ১০টি বিদ্যুৎকেন্দ্র ২০২২-২৩ অর্থবছরে এক মিনিটের জন্যও চলেনি। পিডিবির মোট উৎপাদন ক্ষমতা ৬ হাজার ১৭৪ মেগাওয়াটের মধ্যে শূন্য উৎপাদনে থাকা কেন্দ্রর উৎপাদন ক্ষমতা ১ হাজার ১০৮ মেগাওয়াট। শতকরা হিসেবে এর পরিমাণ ১৭ দশমিক ৯৪ ভাগ।

এখানেই শেষ নয় পিডিবির এমন কেন্দ্র রয়েছে যেগুলো এক থেকে দুই ভাগ প্ল্যান্ট ফ্যাক্টরে চলেছে। অর্থাৎ একটি কেন্দ্র যে পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারে তার মাত্র এক থেকে দুই ভাগ বিদ্যুৎ উৎপাদন করেছে; কিন্তু আশ্চর্যজনক হলেও সত্য পিডিবি বছরের পর বছর ধরে এসব কেন্দ্র রেখে দিয়েছে। কেবলমাত্র উৎপাদন ক্ষমতা বেশি দেখানো ছাড়া এসব কেন্দ্রর আসলে কোনো কাজ নেই।

পিডিবির হিসেবে শূন্য উৎপাদনের কেন্দ্র

পিডিবির বার্ষিক প্রতিবেদন বলছে ঘোড়াশাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের ১ এবং ২ নাম্বার ইউনিট গেল বছর এক ইউনিট বিদ্যুৎও উৎপাদন করেনি। দুটি ইউনিটের মোট উৎপাদন ক্ষমতা ১১০ মেগাওয়াট। একই বিদ্যুৎকেন্দ্রের ইউনিট ৩ ২৬০ মেগাওয়াটের কেন্দ্রটিকেও উৎপাদন শূন্য দেখানো হচ্ছে। এর বাইরে শিকলবাহা দ্বৈত জ্বলানির ১৫০ মেগাওয়াট, সিদ্ধিরগঞ্জ পাওয়ার স্টেশন এর ১১৫ মেগাওয়াট, শাহাজিবাজার ৩৩০ মেগাওয়াট, শাহাজিবাজার ১০০ মেগাওয়াট, সৈয়দপুর ২০ মেগাওয়াট এবং হরিপুর ২০ মেগাওয়াট কেন্দ্রগুলো এক মিনিটের জন্যও চলেনি।

গ্রিড থেকে সারা বছর বিদ্যুৎ নিয়ে চলেছে কেন্দ্রগুলো

সিরাগঞ্জ ২ মেগাওয়াট বায়ু বিদ্যুৎকেন্দ্রটি গেল বছর গ্রিড থেকে ২৫ হাজার ৩১৭ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ নিয়ে নিজেকে সচল রেখেছে। একইভাবে ঘোড়াশাল ইউনিট ৩ গ্রিড থেকে ৮ লাখ ৬২ হাজার ৫০০ ইউনিট, শিকলবাহা ৯ লাখ ৪৬ হাজার ৬১২ ইউনিট, সিদ্ধিরগঞ্জ ১১৫ মেগাওয়াট কেন্দ্রটি ৬ লাখ ৩৪ হাজার ২৮১ ইউনিট, শাহাজিবাজার ৩৩০ মেগাওয়াট ৯ লাখ ৭১ হাজার ৭৭২ ইউনিট, শাহাজিবাজার ১০০ মেগাওয়াট কেন্দ্রটি ৯ লাখ ৯৬ হাজার ৪০২ ইউনিট হরিপুর ২ লাখ ৭৯ হাজার ৮৫১ ইউনিট গ্রিড থেকে নিয়েছে।

এসব কেন্দ্র চালাতে গেল বছর কত খরচ হলো

স্থাপনা থাকলে সেখানে কিছু হোক আর না হোক খরচ করতেই হয়। তবে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো সাধারণ কোনো স্থাপনা নয়। এখানে প্রকৌশলীদের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে লোকবল থাকায় বিপুল পরিমাণ পরিচলন ব্যয়ের প্রয়োজন হয়। তবে কোনো কোনো কেন্দ্রে কিছু কাজ করা হচ্ছে এ জন্য অতিরিক্ত ব্যয় হচ্ছে বলে পিডিবি সূত্র জানিয়েছে। বন্ধ কেন্দ্রগুলোর মধ্যে ঘোড়াশাল ইউনিট ১ এবং ২ তে ১৬৯ কোটি ৮৯ লাখ টাকা খরচ হয়েছে। ঘোড়াশাল-৩ ইউনিটের জন্য ৪১৯ কোটি ৬৮ লাখ টাকা খরচ হয়েছে। শিকলবাহা বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য খরচ হয়েছে ৫৯ কোটি ৫৭ লাখ টাকা। শাহাজিবাজার বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য খরচ হয়েছে ৫৭ কোটি ৮১ লাখ টাকা। সৈয়দপুর ২০ মেগাওয়াট কেন্দ্রে ১৫ কোটি ৬ লাখ এবং হরিপুর ২০ মেগাওয়াটের জন্য ২৫ কোটি নয় লাখ টাকা খরচ হয়েছে। এর বাইরে সোনাগাজী ৯০০ কিলোওয়াট এর বায়ু বিদ্যুৎকেন্দ্রর জন্য ৩৬ লাখ ৩৫ হাজার টাকা এবং সিরাজগঞ্জ দুই মেগাওয়াটের জন্য ১ কোটি ৪৯ লাখ টাকা খরচ হয়েছে।

পিডিবি কথা বলল না

বক্তব্য জানার জন্য পিডিবির অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (উৎপাদন) জাহাঙ্গীর আলমকে ফোন করা হলে তিনি বলেন, আমি এখানে নতুন এসেছি, না দেখে বলতে পারব না। তিনি দেখে বলতে পারবেন। তার পরামর্শে পিডিবির সংশ্লিষ্ট কাগজের ছবি তুলে হোয়াটসঅ্যাপে পাঠানোর পর তিনি আর ফোন ধরেননি।

কি বলছেন বিশেষজ্ঞরা

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ইজাজ হোসেন বলেন, কেবলমাত্র ক্যাপাসিটি অর্থাৎ উৎপাদন ক্ষমতা বেশি দেখানোর জন্য এসব বিদ্যুৎকেন্দ্র রাখা হয়েছে। আমাদের এখন অনেক বড় বড় কেন্দ্র উৎপাদনে এসেছে। এখন যে কেন্দ্রগুলো এক মিনিটের জন্যও চলে না সেগুলো বন্ধ করে দেয়া উচিত।

মতামত দিন

মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে

ট্রেন্ডিং ভিউজ