Views Bangladesh Logo

ইউরোপের ইতিহাসে ভয়াবহতম গ্রীষ্ম, দাবদাহে মৃত্যু ৫০ হাজারের বেশি

গ্রীষ্মের সূর্য যেন আগুন ঢেলেছে ইউরোপের মাটিতে। তপ্ত বাতাসে পুড়েছে জনপদ, হাঁসফাঁস করেছে নগরজীবন। বাইরে থেকে স্বাভাবিক মনে হওয়া সেই গ্রীষ্মের আড়ালে নিঃশব্দে নেমে এসেছে মৃত্যুর মিছিল। চলতি বছরের ভয়াবহ দাবদাহে ইউরোপজুড়ে ৫০ হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে বলে ধারণা করছেন বিজ্ঞানীরা। তাঁদের মতে, দাবদাহজনিত প্রাণহানির বিচারে এটি ইউরোপের ইতিহাসে অন্যতম ভয়াবহ গ্রীষ্ম।

গবেষণা সাময়িকী নেচার হেলথ-এ প্রকাশিত দুটি সহকর্মী-পর্যালোচিত গবেষণায় উঠে এসেছে এই উদ্বেগজনক চিত্র। গবেষকদের হিসাব অনুযায়ী, দাবদাহে মোট মৃত্যুর সংখ্যা ৫০ হাজার ৩৯১। এর মধ্যে ৩২ হাজার ৬০০ জনেরও বেশি মানুষের মৃত্যুর সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে জলবায়ু পরিবর্তনের। অর্থাৎ, প্রকৃতির স্বাভাবিক উত্তাপের সঙ্গে মানুষের কর্মকাণ্ডে সৃষ্ট বৈশ্বিক উষ্ণায়ন যুক্ত হয়ে মৃত্যুর ঝুঁকিকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

লন্ডনের ইম্পেরিয়াল কলেজের চরম আবহাওয়া ও জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক গবেষক এবং গবেষণাটির অন্যতম লেখক ক্লেয়ার বার্নস জানান, দাবদাহজনিত মৃত্যুর হিসাবে ২০২৬ সালের গ্রীষ্ম ইউরোপের অর্ধেকেরও বেশি অঞ্চলের ইতিহাসে সম্ভবত সবচেয়ে ভয়াবহ। তাঁর সতর্কবার্তা, জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে বিপজ্জনক পরিণতি ঠেকানোর পথ থেকে বিশ্ব অনেকটাই সরে এসেছে। দ্রুত ও সমন্বিত পদক্ষেপ ছাড়া পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে।

তাপমাত্রার রেকর্ড ভাঙল, দীর্ঘ হলো মৃত্যুর তালিকা

মে মাসের শেষ ভাগ থেকে আগস্টের শেষ পর্যন্ত ইউরোপের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে বয়ে যায় নজিরবিহীন তাপপ্রবাহ। পশ্চিম ইউরোপে গ্রীষ্মকালীন তাপমাত্রা ১৯৯১ থেকে ২০২০ সালের গড়ের চেয়ে প্রায় ২ দশমিক ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি ছিল। কোনো কোনো দেশে নির্দিষ্ট দিনে তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় ১২ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বেড়েছে।
দক্ষিণ ও পশ্চিম ইউরোপে দাবদাহের আঘাত ছিল সবচেয়ে তীব্র। তবে অপেক্ষাকৃত শীতল উত্তরাঞ্চলও রেহাই পায়নি। যুক্তরাজ্যসহ বিভিন্ন দেশে হাজার হাজার মানুষের প্রাণ গেছে। সবচেয়ে বেশি মৃত্যুর শিকার হয়েছেন ৮৫ বছর বা তার বেশি বয়সী ব্যক্তিরা। তবে বিপদের পরিধি শুধু প্রবীণদের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। ২০ থেকে ৪৪ বছর বয়সী অন্তত ৮০০ জনের মৃত্যুও দাবদাহের সঙ্গে সম্পর্কিত বলে গবেষণায় উঠে এসেছে।

প্রাণহানির হিসাব পেতে বিজ্ঞানীরা ইউরোপের ৩০টি দেশের ৮৫৪টি শহরের তাপমাত্রার তথ্য বিশ্লেষণ করেন। এরপর জলবায়ু পরিবর্তন না ঘটলে তাপমাত্রা কেমন হতে পারত, তার সঙ্গে বাস্তব পরিস্থিতির তুলনা করেন। জুনের শুরু থেকে আগস্টের শেষ পর্যন্ত তাপমাত্রা ও দৈনিক মৃত্যুর সম্পর্কের ভিত্তিতে তৈরি মডেল ব্যবহার করে তাঁরা সম্ভাব্য মৃত্যুর সংখ্যা নির্ণয় করেন।
গবেষকদের মতে, গত ২৬ বছরের মধ্যে এ বছরের প্রাণহানি সর্বোচ্চ। তা ২০২২ ও ২০০৩ সালের বড় দাবদাহগুলোকেও ছাড়িয়ে গেছে।

নীরব ঘাতকের পেছনে মানুষের হাত

ওয়ারউইক বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য ও পরিবেশ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক রাকেল নুনেসের মতে, দাবদাহের প্রভাব সব সময় তাৎক্ষণিকভাবে দৃশ্যমান হয় না। সে কারণেই একে বলা হয় ‘নীরব ঘাতক’। তাঁর উদ্বেগ, ৬৫ বছরের কম বয়সী হাজার হাজার মানুষের মৃত্যুও এই বিপর্যয়ের ভয়াবহতা তুলে ধরে।
গবেষণায় দেখা গেছে, চলতি শতাব্দীর শুরুর দিকে দাবদাহজনিত মৃত্যুর প্রায় ৪০ শতাংশের পেছনে জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহারের কারণে সৃষ্ট উষ্ণায়নের ভূমিকা ছিল। বর্তমানে সেই অনুপাত বেড়ে প্রায় দুই-তৃতীয়াংশে দাঁড়িয়েছে।

এই পরিসংখ্যান শুধু একটি গ্রীষ্মের মৃত্যুর হিসাব নয়; এটি ভবিষ্যতের জন্যও অশনিসংকেত। জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমানো এবং জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না গেলে এমন গ্রীষ্ম আরও ঘন ঘন ফিরে আসতে পারে। ক্লেয়ার বার্নসের সতর্কবার্তাও তাই স্পষ্ট—জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার থেকে সরে না এলে সামনে অপেক্ষা করছে আরও তীব্র, আরও বিপজ্জনক গ্রীষ্ম।

ইউরোপের আকাশে গ্রীষ্মের আগুন হয়তো একসময় নিভে যাবে। কিন্তু ৫০ হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যু যে প্রশ্ন রেখে যাচ্ছে, তা সহজে মিলিয়ে যাওয়ার নয়: প্রকৃতির উত্তাপ যখন মানুষের তৈরি সংকটে আরও ভয়ংকর হয়ে ওঠে, তখন পরের গ্রীষ্মে মৃত্যুর মিছিল থামানোর সত্যিই কঠিন।

মতামত দিন

Avatar

ট্রেন্ডিং ভিউজ