আর্লিং হালান্ড: বাবার অসমাপ্ত গল্প লিখে যাচ্ছেন ছেলে
কখনো কখনো একটি গোল শুধু ম্যাচের ফল বদলে দেয় না, বদলে দেয় একটি দেশের ফুটবল ইতিহাস। ডালাসের এটিঅ্যান্ডটি স্টেডিয়ামে ঠিক তেমনই এক মুহূর্তের জন্ম দিলেন আর্লিং হালান্ড। ৮৬ মিনিটে তার সেই ছোট্ট কিন্তু নিখুঁত স্পর্শে করা গোল শুধু আইভরি কোস্টের বিপক্ষে নরওয়েকে জয় এনে দেয়নি, ২৮ বছরের অপেক্ষারও অবসান ঘটিয়েছে। ১৯৯৮ সালের পর প্রথমবার বিশ্বকাপ খেলতে এসে নরওয়ে এবার প্রথমবারের মতো নকআউট ম্যাচ জয়ের ইতিহাস লিখল, আর সেই গল্পের কেন্দ্রে দাঁড়িয়ে আছেন তাদের গোলমেশিন আর্লিং হালান্ড।
এই বিশ্বকাপ হালান্ডের জন্য ছিল একেবারেই নতুন এক অধ্যায়। নরওয়ে যখন সর্বশেষ বিশ্বকাপে খেলেছিল ১৯৯৮ সালে, তখন হালান্ডের জন্মই হয়নি। তাই ২০২৬ বিশ্বকাপ শুধু দেশের জন্য নয়, তার নিজের ক্যারিয়ারেরও এক দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান। আর বিশ্বকাপের অভিষেকেই তিনি দেখিয়ে দিচ্ছেন কেন তাকে বিশ্বের অন্যতম ভয়ংকর স্ট্রাইকার বলা হয়।
টুর্নামেন্টের শুরু থেকেই গোলের মেশিনের মতো ছুটছেন হালান্ড। ইরাকের বিপক্ষে বিশ্বকাপ অভিষেক ম্যাচেই করেন জোড়া গোল। প্রথম গোলটি ছিল ফার পোস্টে দুর্দান্ত ফিনিশিং, আর দ্বিতীয়টি এসেছিল প্রতিপক্ষ গোলরক্ষকের ভুল কাজে লাগিয়ে। এরপর সেনেগালের বিপক্ষেও করেন আরও দুই গোল। একটি গোল ছিল অসাধারণ সাইড-ফুট ভলি, যা বার ছুঁয়ে জালে গিয়ে জমা হয়। ফ্রান্সের বিপক্ষে ম্যাচে কোচ স্টেলে সোলবাকেন তাকে বিশ্রাম দেন, কারণ নকআউটের বড় লড়াইয়ের জন্য নিজের সেরা অস্ত্রকে সতেজ রাখতে চেয়েছিলেন তিনি।
আইভরি কোস্টের বিপক্ষে ম্যাচে অবশ্য শুরুটা ছিল কঠিন। পুরো ম্যাচে অনেকটা নিষ্প্রভ ছিলেন হালান্ড। নরওয়ে যখন চাপের মধ্যে, তখনও তিনি অপেক্ষা করছিলেন নিজের মুহূর্তের জন্য। আর সেই মুহূর্ত এলো ৮৬ মিনিটে। অস্কার ববের দুর্দান্ত পাস থেকে প্যাট্রিক বার্গ বল বাড়িয়ে দেন হালান্ডের দিকে। শক্তিশালী শট নয়, বরং একজন বিশ্বমানের স্ট্রাইকারের মতো নিখুঁত এক ফ্লিকে বল জালে পাঠান তিনি। গোলটি এনে দেয় নরওয়ের ২-১ জয়, আর হালান্ডের বিশ্বকাপ গোলসংখ্যা দাঁড়ায় পাঁচে।
এই গোল শুধু জয়সূচক গোল নয়, হালান্ডের অবিশ্বাস্য ধারাবাহিকতারও প্রমাণ। ২০২৪ সালের অক্টোবর থেকে নরওয়ের জার্সিতে প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচে তিনি নিয়মিত গোল করে যাচ্ছেন। মাত্র ৫৩ ম্যাচে আন্তর্জাতিক ফুটবলে তার গোলসংখ্যা পৌঁছেছে ৬০-এ—যা তার অসাধারণ গোল করার ক্ষমতার প্রমাণ। বিশ্বকাপের গোল্ডেন বুটের দৌড়েও তিনি এখন শীর্ষদের একজন। মাত্র তিন ম্যাচে পাঁচ গোল করে তিনি লিওনেল মেসির ছয় গোলের খুব কাছাকাছি, পাশাপাশি কিলিয়ান এমবাপের সঙ্গেও চলছে তার তীব্র লড়াই।
তবে আর্লিং হালান্ডের গল্প শুধু গোলের নয়, এটি একটি ফুটবল পরিবারের গল্পও। তার পথ যেন অনেকটাই তৈরি হয়েছিল ছোটবেলা থেকেই। ২০২২ সালে বরুসিয়া ডর্টমুন্ড থেকে প্রায় ৬০ মিলিয়ন ইউরোতে ম্যানচেস্টার সিটিতে যোগ দেন তিনি। প্রথম মৌসুমেই ইতিহাস তৈরি করেন—প্রিমিয়ার লিগ, এফএ কাপ ও চ্যাম্পিয়নস লিগ জিতে ট্রেবল পূর্ণ করেন। সেই মৌসুমে প্রিমিয়ার লিগে ৩৬ গোল করে গড়েন এক মৌসুমে সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ড।
এরপর থেকে সিটির হয়ে তিনি যেন গোলের নতুন সংজ্ঞা লিখছেন। প্রিমিয়ার লিগে প্রথম ১০০ ম্যাচে ৮৮ গোল করে ভেঙেছেন অ্যালান শিয়েরারের রেকর্ড। মাত্র ১১১ ম্যাচে করেছেন ১০০ গোল, যেখানে শিয়েরারের লেগেছিল ১২৪ ম্যাচ। চ্যাম্পিয়নস লিগেও মাত্র ৪৯ ম্যাচে ৫০ গোল করে হয়েছেন দ্রুততম খেলোয়াড়। পেপ গার্দিওলার অধীনে তিনি এখন বিশ্বের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য গোলস্কোরারদের একজন।
হালান্ডের ম্যানচেস্টার সিটির গল্পের সঙ্গে জড়িয়ে আছে তার বাবার স্মৃতিও। তার বাবা আলফ-ইঙ্গে হালান্ডও খেলেছেন ম্যানচেস্টার সিটিতে। এর আগে তিনি নটিংহাম ফরেস্ট ও লিডস ইউনাইটেডের হয়েও খেলেছেন এবং নরওয়ের হয়ে প্রতিনিধিত্ব করেছেন। মজার বিষয়, আর্লিং হালান্ডের জন্মই ইংল্যান্ডের লিডসে, যখন তার বাবা লিডসের হয়ে খেলছিলেন। ছোটবেলায় তিনি ছিলেন লিডসের সমর্থক।
হালান্ড পরিবারের সঙ্গে ফুটবল ইতিহাসের আরেক আলোচিত অধ্যায় জড়িয়ে আছে রয় কিনের সঙ্গে। ১৯৯৭ সালে আলফ-ইঙ্গে হালান্ডের সঙ্গে এক সংঘর্ষে রয় কিনের হাঁটুর লিগামেন্টে চোট লাগে। পরে ২০০১ সালে ম্যানচেস্টার ডার্বিতে কিনের ভয়ংকর ট্যাকল আলফ-ইঙ্গে হালান্ডকে বড় আঘাত দেয়। নিজের আত্মজীবনীতে কিন স্বীকার করেছিলেন, সেটি ছিল আগের ঘটনার প্রতিশোধ। সেই ঘটনা ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত মুহূর্ত হয়ে আছে।
শুধু বাবার কাছ থেকেই নয়, মায়ের দিক থেকেও ক্রীড়ার উত্তরাধিকার পেয়েছেন আর্লিং হালান্ড। তার মা গ্রি মারিতা ব্রাউট ছিলেন নরওয়ের একজন এলিট হেপ্টাথলন অ্যাথলেট এবং জাতীয় পর্যায়ের চ্যাম্পিয়ন। তাই শক্তি, গতি ও শারীরিক সক্ষমতার পেছনে পারিবারিক ক্রীড়া ঐতিহ্যের বড় ভূমিকা রয়েছে।
আজ বিশ্বকাপের মঞ্চে নরওয়ের পতাকা হাতে দাঁড়িয়ে আছেন আর্লিং হালান্ড। বাবার প্রজন্ম যে স্বপ্ন পূরণ করতে পারেনি, ছেলে সেটাই লিখছেন নতুন করে—আরও বড় মঞ্চে, আরও বড় গল্প হয়ে। সামনে ব্রাজিল। আর সেই লড়াইয়ে হালান্ডের সামনে অপেক্ষা করছে আরও বড় ইতিহাস লেখার সুযোগ।
মতামত দিন