সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম দেশেই রাখার নির্দেশ ইরানের সর্বোচ্চ নেতার
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতাবা খামেনি বলেছেন, সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম কোনো অবস্থাতেই বিদেশে পাঠানো যাবে না। দুজন ঊর্ধ্বতন ইরানি সূত্র এ বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। এই নির্দেশ ইরান-যুক্তরাষ্ট্র শান্তি আলোচনায় ওয়াশিংটনের অন্যতম প্রধান দাবিকে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে এবং চলমান কূটনৈতিক সংকটকে আরও ঘনীভূত করেছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ইরানি সূত্র জানিয়েছে, ‘সর্বোচ্চ নেতার নির্দেশ এবং প্রতিষ্ঠানের ভেতরে সামগ্রিক ঐকমত্য হলো — সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুদ দেশের বাইরে যাবে না।’
ইরানের শীর্ষ কর্মকর্তারা মনে করছেন, এই উপাদান বিদেশে পাঠানো হলে ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সম্ভাব্য হামলার মুখে দেশটি আরও নিরাপত্তাহীন হয়ে পড়বে।
এদিকে বৃহস্পতিবার (২১ মে) হোয়াইট হাউসে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেন, ইরানকে উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুদ রাখতে দেওয়া হবে না। তিনি বলেন, সেই ইউরেনিয়াম হস্তগত করার পর সম্ভবত ধ্বংস করে দেওয়া হবে।
ইসরায়েলি কর্মকর্তারা রয়টার্সকে জানান, ট্রাম্প ইসরায়েলকে আশ্বাস দিয়েছেন যে, যেকোনো শান্তি চুক্তিতে ইরানের ইউরেনিয়াম মজুদ দেশের বাইরে পাঠানোর শর্ত অবশ্যই থাকবে। ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু স্পষ্ট করেছেন, সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম অপসারণ, প্রক্সি মিলিশিয়াদের প্রতি ইরানের সমর্থন বন্ধ এবং ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা নির্মূল না হলে যুদ্ধ শেষ হয়েছে বলে তিনি মনে করবেন না।
ইরানি সূত্রগুলো জানিয়েছে, যুদ্ধের আগে তেহরান তার ৬০ শতাংশ মাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম মজুদের অর্ধেক বিদেশে পাঠানোর ইচ্ছা প্রকাশ করেছিল। তবে ট্রাম্পের বারবার হামলার হুমকির পর সেই অবস্থান থেকে সরে এসেছে তেহরান।
উল্লেখ্য, ৬০ শতাংশ মাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম বেসামরিক ব্যবহারের প্রয়োজনের চেয়ে অনেক বেশি এবং অস্ত্র তৈরিতে প্রয়োজনীয় ৯০ শতাংশের কাছাকাছি। আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি সংস্থার (আইএইএ) হিসাব অনুযায়ী, গত জুনে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালানোর সময় ৬০ শতাংশ মাত্রায় সমৃদ্ধ ৪৪০.৯ কেজি ইউরেনিয়াম মজুদ ছিল। বর্তমানে কতটা অবশিষ্ট আছে তা স্পষ্ট নয়; তবে আইএইএ প্রধান রাফায়েল গ্রোসি জানিয়েছেন, বেশিরভাগ মজুদ ইস্ফাহান পারমাণবিক কেন্দ্রের একটি টানেল কমপ্লেক্সে এবং নাতাঞ্জ কেন্দ্রে সংরক্ষিত রয়েছে।
তবে ইরানের এক সূত্র জানিয়েছে, ‘আইএইএর তত্ত্বাবধানে মজুদ তরলীকরণের মতো সম্ভাব্য সমাধান রয়েছে।’ তেহরান আরও দাবি করছে, চিকিৎসা কাজে এবং রিসার্চ রিঅ্যাক্টরে (বা: গবেষণা চুল্লিতে) ব্যবহারের জন্য কিছু পরিমাণ উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম অপরিহার্য।
বুধবার ইরানের শীর্ষ শান্তি আলোচক মোহাম্মদ বাকের কালিবাফ সতর্ক করে বলেন, শত্রুর ‘স্পষ্ট ও গোপন তৎপরতা’ প্রমাণ করছে যে যুক্তরাষ্ট্র নতুন হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে। দুই ইরানি সূত্রও জানায়, তেহরান গভীরভাবে সন্দিহান যে নতুন বিমান হামলার আগে যুদ্ধবিরতি আসাটা একটি কৌশলগত প্রতারণা।
একই দিনে ট্রাম্প বলেন, ইরান শান্তিচুক্তিতে রাজি না হলে যুক্তরাষ্ট্র আরও হামলা চালাতে প্রস্তুত, তবে কয়েকদিন অপেক্ষা করা যেতে পারে।
পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় চলমান আলোচনায় কিছু বিষয়ে অগ্রগতি হলেও পারমাণবিক কর্মসূচি এবং সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর মতভেদ রয়ে গেছে। ইরানি কর্মকর্তারা বলছেন, যুদ্ধের স্থায়ী সমাপ্তির নিশ্চয়তা পাওয়ার আগে পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনায় যাবে না তেহরান। একই সঙ্গে তারা দাবি করছে, ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার অধিকারের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি তাদের দিতে হবে।
সূত্র: রয়টার্স

মতামত দিন
মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে