Views Bangladesh Logo

ব্যাংকের ভল্ট থেকে স্বর্ণ চুরি রোধে ব্যবস্থা নিন

ব্যাংকে স্বর্ণ গচ্ছিত রেখে ঋণ গ্রহণ সবচেয়ে সহজ উপায়। ব্যাংকে স্বর্ণ গচ্ছিত রেখে যারা ঋণ নেন, তারা সবাই যে অবস্থাসম্পন্ন মানুষ তা না। বেশির ভাগই মধ্যবিত্ত, নিম্ন আয়ের মানুষ। হয়তো ব্যবসার প্রয়োজনে, বিদেশে যাওয়ার জন্য বা চিকিৎসার প্রয়োজনে দ্রুত ঋণ নেয়ার জন্য ব্যাংকে স্বর্ণ বন্ধক দেন। এই স্বর্ণগুলো বেশির ভাগই মায়ের, স্ত্রীর, বোনের গয়না।

এগুলোর সঙ্গে শুধু সম্পদ নয়, অনেক স্মৃতি ও মায়া-মমতা জড়িত। সবারই লক্ষ্য থাকে একদিন ঋণ শোধ করে ব্যাংক থেকে গয়নাগুলো ছাড়িয়ে এনে আবার পরিবারের প্রিয় মানুষগুলোর হাতে তুলে দেবেন; কিন্তু এই স্বর্ণ যদি ব্যাংকের চেয়ারম্যানই বিক্রি করে দেন, তাহলে তা কেবল চুরি-ডাকাতি নয়, এটা একটা বিরাট অপরাধ। শুধু অর্থমূল্যেই এটা নির্ধারণ করা যাবে না, এর শাস্তি নির্ধারিত হতে হবে আমানত খেয়ানতের সবচেয়ে কঠোরতর শাস্তি হিসেবে।

গতকাল বুধবার (২ অক্টোবর) পত্রিকায় প্রকাশিত খবরে জানা যায়, সমবায় ব্যাংকে স্বর্ণ জমা বা বন্ধক রেখে ঋণ নিয়েছিলেন সাধারণ গ্রাহক। গ্রাহকদের সেই সম্পদ ভুয়া মালিক সাজিয়ে বিক্রি করে দিয়েছেন ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান। তার নাম মহিউদ্দিন আহমেদ, যিনি যুবলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। এখন ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের (দক্ষিণ) যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক। নথিপত্র বলছে, সমবায় ব্যাংকের চেয়ারম্যান থাকার সময় ২০২০ সালে মহিউদ্দিন আহমেদ মোট ৭ হাজার ৩৯৮ ভরি সোনা বিক্রি করে দেন, যার বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ১০০ কোটি টাকা। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন ব্যাংকটির ২ হাজার ৩১৬ জন গ্রাহক।

তথ্য বলছে, সোনা বিক্রি করে দেয়ার ঘটনা তদন্ত শুরু করেছিল পল্লি উন্নয়ন ও সমবায় বিভাগ, যাদের অধীনে সমবায় ব্যাংক পরিচালিত হয়। সমবায় ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, সেই তদন্ত প্রভাব খাটিয়ে থামিয়ে দেন মহিউদ্দিন আহমেদ। ২০২১ সালে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) সোনা বিক্রি করে দেয়ার ঘটনায় মামলা করে। মামলার এজাহারে ৯ আসামির মধ্যে মহিউদ্দিনের নাম ছিল ১ নম্বরে। তবে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে অভিযোগপত্র থেকে নিজের নামটিও বাদ দেয়ার ব্যবস্থা করেন তিনি। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে গত ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর মহিউদ্দিন আহমেদ আত্মগোপনে চলে যান।

প্রশ্ন হচ্ছে, এতবড় একটি পুকুর চুরি হয়ে গেল, সাবেক আওয়ামী লীগ সরকার তার কোনো ব্যবস্থাই করল না! রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে তিনি অভিযোগপত্র থেকে নিজের নামটিও বাদ দিয়েছেন! কত ক্ষমতা থাকলে একজন এত বড় প্রভাব খাটাতে পারেন? একজন ব্যাংকের চেয়ারম্যান যদি এত প্রভাব খাটাতে পারেন, তাহলে তিনি ও তার মতো অনেকে এমন আরও কত অপরাধ করেছে! এভাবে লাখ কোটি টাকা পাচার হয়েছে, দুর্নীতি হয়েছে গত সরকারের আমলে।

গত সরকার বিদায় হয়েছে। এসব দুর্নীতির বিরুদ্ধে বর্তমান সরকার সোচ্চার হয়েছে তাতে জনগণ খুশি; কিন্তু জনমনে এখনো ভয় ধরে আছে। এরকম ঘটতে থাকলে ব্যাংকের ওপর জনগণ আর আস্থা পোষণ করবে না। এর মধ্যেই অনেক ব্যাংকে তার প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। মানুষ তার গচ্ছিত স্বর্ণ দেখতে চাচ্ছে। যে পারছে তা ছাড়িয়ে আনছে। অনেকে অনেক ব্যাংক থেকে নগদ টাকাও তুলে ফেলছে। এসবই সামগ্রিক অর্থনীতিতে ও জননিরাপত্তায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

আমরা চাই, ব্যাংকের নিরাপত্তা-ব্যবস্থা আরও জোরদার হোক। কোনো ব্যক্তি বিশেষের প্রভাবে যেন কোনো ব্যাংক এমন ক্ষতিগ্রস্ত না হতে পারে। কোনো রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় যেন কোনো ব্যক্তিও এরকম দুর্নীতিপরায়ণ না হয়ে উঠতে পারে। বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে রাজনীতির এই কলুষতা দূর করার ব্যবস্থা করতে হবে। এমন রাষ্ট্র গঠন আমাদের করতে হবে, যেন কোনো প্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে কোনো ব্যক্তি দানব না হয়ে উঠতে পারে।

মতামত দিন

মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে

ট্রেন্ডিং ভিউজ